বিসিএসের বাইরে গবেষণার স্বপ্ন: তরুণদের মেধা কোন পথে যাবে?
“বিসিএসের জন্য যে পরিশ্রম করা হয়, সেই পরিশ্রম যদি গবেষণায় দেওয়া হতো, অনেক উন্নতি করা সম্ভব ছিল।”
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার এই কথাটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার সংস্কৃতির একটি গভীর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থী প্রথমে নিজের বিষয় নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখলেও ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক চাপের মুখে পড়ে—বিসিএস। সরকারি চাকরি অবশ্যই সম্মানজনক ও গুরুত্বপূর্ণ পেশা। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন প্রায় সব মেধাবী শিক্ষার্থীর সামনে এটিকেই একমাত্র সফলতার পথ হিসেবে দাঁড় করানো হয়।
বাংলাদেশে বহু শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা, কৃষি, জীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান বা প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পড়াশোনা করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের মাঝপথে এসে অনেকেই নিজের মূল বিষয়ের গভীরে যাওয়ার বদলে বিসিএস প্রস্তুতিকে প্রধান লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে। এর ফলে যে বিষয়টি নিয়ে সে চার-পাঁচ বছর পড়ল, সেই বিষয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন বা পেশাগত দক্ষতা তৈরির সুযোগ অনেক সময় পিছিয়ে যায়।
ড. রানা এই প্রবণতাকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন না; তিনি এটিকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যার অংশ হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, আমাদের দেশে এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়েছে যেখানে বিসিএস না হলে জীবন ব্যর্থ—এমন ধারণা অনেক তরুণের মনে ঢুকে গেছে। অথচ একজন প্রকৌশলীর কাজ প্রকৌশলে দক্ষ হওয়া, একজন চিকিৎসকের কাজ চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষ হওয়া, একজন রসায়নবিদের কাজ রসায়নে নতুন জ্ঞান বা প্রযুক্তি তৈরি করা, একজন গবেষকের কাজ গবেষণার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজা।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—একটি দেশ তার মেধাবীদের কীভাবে ব্যবহার করবে? যদি সবাই প্রশাসনিক চাকরির দিকে ছুটে যায়, তাহলে গবেষণাগার, শিল্পপ্রযুক্তি, উদ্ভাবন, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা, স্টার্টআপ, উন্নত উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা বায়োটেকনোলজির মতো ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে কে?
ড. রানার নিজের পথটি ছিল ভিন্ন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে আবেদন শুরু করেন। অনেক অধ্যাপককে ইমেইল করেছেন, প্রত্যাখ্যান পেয়েছেন, আবার চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন এবং বর্তমানে KENTECH-এ হাইড্রোজেন এনার্জি নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর পথ দেখায়, গবেষণার জগৎ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।
তবে তিনি তরুণদের শুধু বিদেশে যাওয়ার কথা বলছেন না; বরং বলছেন লক্ষ্য স্থির করার কথা। একজন শিক্ষার্থী যদি প্রশাসনে যেতে চায়, সেটিও সম্মানের পথ। কিন্তু যদি সে বিজ্ঞানী হতে চায়, তাহলে তাকে গবেষণাপত্র পড়তে হবে, ছোট ছোট গবেষণা প্রকল্পে কাজ করতে হবে, নিজের বিষয়ের গভীরে যেতে হবে। আবার কেউ যদি প্রকৌশলী হতে চায়, তাকে বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ লক্ষ্য যাই হোক, সেটি যেন নিজের আগ্রহ, সক্ষমতা ও প্রস্তুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
বাংলাদেশের পরিবারগুলোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক বাবা-মা সন্তানের আগ্রহ না বুঝেই তাকে নির্দিষ্ট পেশার দিকে ঠেলে দেন—ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সরকারি কর্মকর্তা। ফলে সন্তান নিজের পছন্দের ক্ষেত্র খুঁজে নেওয়ার আগেই সামাজিক প্রত্যাশার ভারে চাপা পড়ে যায়। ড. রানার মতে, ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের নিজেদের আগ্রহ বুঝতে সাহায্য করা দরকার। সবাইকে একই ছাঁচে ফেলে তৈরি করতে গেলে বৈচিত্র্যময় মেধা নষ্ট হয়ে যায়।
আজকের বিশ্বে দেশ এগিয়ে যায় জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর দাঁড়িয়ে। যে দেশ বিজ্ঞানী তৈরি করে, গবেষণায় বিনিয়োগ করে, প্রযুক্তিকে শিল্পে রূপ দেয়, সে দেশ দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশও যদি ভবিষ্যতে জ্বালানি, স্বাস্থ্য, কৃষি, জলবায়ু, প্রযুক্তি ও শিল্পক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে চায়, তাহলে তরুণদের মেধাকে বহুমুখী পথে বিকশিত হতে দিতে হবে।
বিসিএস একটি পথ, কিন্তু একমাত্র পথ নয়। গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, শিক্ষকতা, শিল্প, উদ্যোক্তা হওয়া—এসবও জাতি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার কথাটি তাই তরুণদের জন্য শুধু সতর্কবার্তা নয়; এটি একটি আহ্বান—নিজের লক্ষ্য চিনে নাও, নিজের ক্ষেত্রকে ভালোবাসো, এবং মেধাকে এমন কাজে লাগাও যা তোমার জীবন ও দেশের ভবিষ্যৎ দুটোকেই এগিয়ে নিতে পারে।
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment