পদার্থবিদ্যাপরিবেশ ও পৃথিবীবিজ্ঞান বিষয়ক খবর

“বাংলাদেশে পানি আছে, সূর্যের আলো আছে; এখন দরকার সেই সম্পদকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে জ্বালানিতে রূপান্তর করার চিন্তা” – ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানা

Share
Share

পানি, সূর্য আর বিজ্ঞান: বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন সম্ভাবনা

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার এই কথাটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি ভাবনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের দেশে জ্বালানি নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত তেল, গ্যাস, কয়লা, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা আমদানির প্রসঙ্গ সামনে আসে। কিন্তু প্রকৃতির দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের চারপাশেই এমন কিছু সম্পদ আছে, যেগুলোকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে ভবিষ্যতের শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশে নদী আছে, বর্ষা আছে, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর আছে, আবার বছরের বড় সময়জুড়ে পর্যাপ্ত সূর্যালোকও পাওয়া যায়। কিন্তু শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই হয় না; সেই সম্পদকে কীভাবে ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর করা যাবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। ড. রানার গবেষণা এই প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য উত্তর দেখায়—পানি থেকে হাইড্রোজেন তৈরি করে তা ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা।

হাইড্রোজেন এনার্জির ধারণাটি সহজ। পানির অণুতে থাকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন। বিদ্যুতের সাহায্যে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন আলাদা করা যায়। যদি এই বিদ্যুৎ আসে সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে, তাহলে সেই হাইড্রোজেনকে বলা যায় গ্রিন হাইড্রোজেন। পরে এই হাইড্রোজেন ব্যবহার করে ফুয়েল সেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, যেখানে প্রধান উপজাত হিসেবে তৈরি হয় পানি—ধোঁয়া বা কার্বন নয়।

বাংলাদেশের জন্য এই ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থা এখনো বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে, গ্যাস সরবরাহে সংকট হলে বা জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে গেলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের জীবনে। তাই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে তাকানো জরুরি।

এখানে সূর্যালোক একটি বড় সম্ভাবনা। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। কিন্তু সৌরবিদ্যুতের একটি সমস্যা হলো—রাতে সূর্য থাকে না, আবার মেঘলা দিনে উৎপাদন কমে যায়। এই সমস্যার সমাধানে হাইড্রোজেন শক্তি সংরক্ষণের মাধ্যম হতে পারে। দিনের অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি করে সংরক্ষণ করা যায়, পরে সেই হাইড্রোজেন দিয়ে প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।

এটি শুধু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিন্তা নয়; ভবিষ্যতে গ্রামীণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, কৃষি, ছোট শিল্প, এমনকি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলের শক্তি ব্যবস্থাতেও এমন প্রযুক্তির সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে এ জন্য গবেষণা, নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং খরচ কমানোর কাজ জরুরি।

ড. রানা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তিনি কাজ করছেন এমন ক্যাটালিস্ট ও ফুয়েল সেল প্রযুক্তি নিয়ে, যা হাইড্রোজেন জ্বালানির খরচ কমাতে পারে। কারণ প্রযুক্তি যতই ভালো হোক, যদি তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়, তাহলে বাংলাদেশের মতো দেশে তার প্রয়োগ কঠিন হয়ে যায়। তাই সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উন্নয়নই হবে ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি।

বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে আমাদের শুধু সংকটের কথা বললেই চলবে না; সম্ভাবনার কথাও ভাবতে হবে। পানি ও সূর্যালোক আমাদের আছে, এখন দরকার গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং তরুণ বিজ্ঞানীদের অংশগ্রহণ। ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার কাজ সেই সম্ভাবনার দরজায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কড়া নাড়া।

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ