“স্বপ্ন বদলাতে পারে, পথ বদলাতে পারে; কিন্তু শেখার আগ্রহ, পরিশ্রম এবং নিজের দেশের জন্য কাজ করার মনোভাব থাকলে সেই পথ কখনো হারিয়ে যায় না।”
শৈশবে আমরা অনেকেই এক ধরনের স্বপ্ন দেখি। কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ প্রকৌশলী, কেউ পাইলট, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ আবার এমন কিছু হতে চায় যার সঙ্গে ভবিষ্যতের বাস্তব পথের খুব বেশি মিল থাকে না। বড় হতে হতে সেই স্বপ্ন বদলায়। কখনো পরিস্থিতির কারণে, কখনো নতুন অভিজ্ঞতার কারণে, কখনো ভালো শিক্ষক বা মেন্টরের প্রভাবে, কখনো নিজের ভেতরের আগ্রহ বদলে যাওয়ার কারণে।
কিন্তু স্বপ্ন বদলানো মানেই ব্যর্থতা নয়। বরং অনেক সময় স্বপ্ন বদলানোই মানুষের সত্যিকারের পথ খুঁজে পাওয়ার শুরু।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের জীবন এই সত্যের একটি সুন্দর উদাহরণ। তিনি ছোটবেলায় জিডি পাইলট হতে চেয়েছিলেন। যুদ্ধবিমান চালানোর স্বপ্ন ছিল তাঁর। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিও তাঁর বিশেষ টান ছিল। রসায়ন তাঁর প্রথম পছন্দ ছিল না; বরং ইন্টারমিডিয়েটে রসায়ন তাঁর কাছে কঠিন মনে হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়ে, রসায়নের ভিত্তি বুঝে এবং গবেষণার জগতে প্রবেশ করে তাঁর পথ বদলে যায়। যে রসায়ন একসময় কঠিন মনে হয়েছিল, সেই রসায়নই পরে তাঁর জীবন, গবেষণা ও পেশাগত পরিচয়ের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
এই গল্প শিক্ষার্থীদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ অনেক শিক্ষার্থী নিজের প্রথম স্বপ্নকে চূড়ান্ত ধরে নেয়। কেউ ভাবে, “আমি ডাক্তার হতে না পারলে আমার জীবন শেষ।” কেউ ভাবে, “আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে না পারলে আর কিছু হবে না।” কেউ আবার কোনো একটি বিষয়ে দুর্বলতা দেখেই ধরে নেয়, তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কিন্তু বাস্তব জীবন এত সরল নয়। মানুষের আগ্রহ বদলায়, দক্ষতা বদলায়, সুযোগ বদলায়, লক্ষ্য বদলায়। গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই পরিবর্তনের মধ্যেও শেখার আগ্রহ ধরে রাখা।
ড. হাফিজুর রহমান যদি ছোটবেলার পাইলট হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হওয়াকে ব্যর্থতা ভাবতেন, তাহলে হয়তো তিনি আজকের গবেষক হতেন না। তিনি যদি রসায়নকে কঠিন ভেবে দূরে সরিয়ে রাখতেন, তাহলে পলিমার রসায়ন, বায়োডিগ্রেডেবল উপকরণ এবং পানি শোধন প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় তাঁর অবদান তৈরি হতো না।
জীবনের পথে এই নমনীয়তা অত্যন্ত প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী আজ যে বিষয় ভালোবাসে, পাঁচ বছর পর তার আগ্রহ অন্য দিকে যেতে পারে। আজ যে পেশা আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে হয়তো অন্য ক্ষেত্র তাকে বেশি অর্থবহ মনে হবে। আজ যে বিষয় কঠিন মনে হচ্ছে, সঠিকভাবে বুঝলে সেটিই হয়তো তার জীবনের প্রধান কাজ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—স্বপ্ন বদলাতে পারে, কিন্তু দায়িত্বহীনতা নয়। লক্ষ্য বদলাতে পারে, কিন্তু পরিশ্রমের অভ্যাস বদলানো যাবে না। পথ বদলাতে পারে, কিন্তু শেখার আগ্রহ হারানো যাবে না।
ড. হাফিজুর রহমানের জীবনজুড়ে এই শেখার মনোভাব দেখা যায়। গ্রাম থেকে উঠে আসা, শহরে পড়তে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জগৎ চিনতে শেখা, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য চিঠি লিখে যোগাযোগ করা, জাপানে গিয়ে ভাষা ও সংস্কৃতির বাধা অতিক্রম করা, ল্যাবে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও কাজ শেখা—প্রতিটি ধাপে তিনি নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করেছেন।
গবেষণাজীবনেও তাঁর পথ সরল ছিল না। জাপানে উন্নত গবেষণা-সুবিধা পেয়েছেন, কিন্তু দেশে ফিরে দেখেছেন সীমিত ল্যাব, সীমিত ফান্ড, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব। তবু তিনি থেমে যাননি। বরং তিনি ভাবলেন, বাংলাদেশের জন্য কোন গবেষণা বেশি প্রয়োজন। পলি-ল্যাকটিক অ্যাসিড নিয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা থাকলেও তিনি বুঝলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় শুধু ব্যয়বহুল বায়োডিগ্রেডেবল পলিমার নিয়ে কাজ করলেই হবে না। এখানে দরকার পানি দূষণ, শিল্পবর্জ্য, ভারী ধাতু এবং পরিবেশ নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তবভিত্তিক গবেষণা।
এই জায়গায় তাঁর পথ আবার বদলেছে। কিন্তু লক্ষ্য হারায়নি। বরং আরও স্পষ্ট হয়েছে—বিজ্ঞানকে মানুষের কাজে লাগাতে হবে, দেশের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
তরুণদের জন্য এটি বড় শিক্ষা। জীবনে পথ বদলানো অস্বাভাবিক নয়। বরং যে মানুষ শেখে, সে বদলায়। যে নতুন অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে, সে নিজের পথকে আরও পরিণত করে। যে পৃথিবীর পরিবর্তন দেখে, সে নিজের লক্ষ্যও নতুনভাবে সাজায়।
কিন্তু যে শেখা বন্ধ করে দেয়, সে পথ হারায়।
তাই একজন শিক্ষার্থীর উচিত নিজের স্বপ্নকে বড় রাখা, কিন্তু সেই স্বপ্নকে পাথরের মতো অনড় না করা। আজ আপনি বিজ্ঞানী হতে চাইতে পারেন, কাল হয়তো প্রকৌশলী হতে চাইবেন, পরশু হয়তো পরিবেশনীতি, ডাটা সায়েন্স, জনস্বাস্থ্য বা উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে আগ্রহ জন্মাবে। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। প্রশ্ন হলো—আপনি কি শিখছেন? আপনি কি নিজেকে তৈরি করছেন? আপনি কি আপনার দক্ষতাকে সমাজের কাজে লাগাতে চাইছেন?
ড. হাফিজুর রহমান শিক্ষার্থীদের বলেছেন, নিজের ইচ্ছা, নিজের সক্ষমতা এবং বিশ্বের চাহিদা—এই তিনটি মিলিয়ে পথ নির্বাচন করা দরকার। শুধু যা ভালো লাগে তা নয়, শুধু যা বাজারে জনপ্রিয় তা নয়, শুধু অন্যরা যা বলছে তা নয়—নিজের আগ্রহ, নিজের শক্তি এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনকে একসঙ্গে বুঝতে হবে।
এই কথাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক শিক্ষার্থী অন্যের স্বপ্ন ধার করে। পরিবার যা চায়, সমাজ যা সম্মান করে, বন্ধুরা যে পথে যাচ্ছে—সেই পথে হাঁটতে গিয়ে নিজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আবার কেউ শুধু নিজের পছন্দ দেখে, বাস্তব চাহিদা বোঝে না। ভালো সিদ্ধান্ত নিতে হলে দুটোই দরকার—নিজেকে জানা এবং পৃথিবীকে জানা।
স্বপ্ন বদলালে অনেকে ভয় পায়। মনে হয়, “আমি কি দেরি করে ফেললাম?” কিন্তু শেখার আগ্রহ থাকলে দেরি কখনো শেষ কথা নয়। ড. হাফিজুর রহমানের রসায়নের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তুলনামূলকভাবে দেরিতে। কিন্তু সেই আগ্রহই তাঁকে গবেষক করেছে। তাই কোনো শিক্ষার্থী যদি আজ নিজের পথ নিয়ে অনিশ্চিত থাকে, তাহলে তার হতাশ হওয়ার দরকার নেই। বরং তাকে জানতে হবে, পড়তে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, ভালো মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে, ধীরে ধীরে নিজের আগ্রহ খুঁজে নিতে হবে।
জীবনে পথ পরিবর্তন ব্যর্থতা নয়;
অলসতা ব্যর্থতা।
স্বপ্ন বদলানো সমস্যা নয়;
শেখা বন্ধ করে দেওয়া সমস্যা।
বিষয় বদলানো অপরাধ নয়;
নিজেকে তৈরি না করা বড় ক্ষতি।
তাই তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—
স্বপ্ন দেখো, কিন্তু শেখা বন্ধ করো না।
পথ বদলালে ভয় পেয়ো না, কিন্তু পরিশ্রম ছাড়ো না।
নিজের আগ্রহ খুঁজে নাও, কিন্তু দেশের প্রয়োজনও বোঝো।
বিশ্বকে জানো, কিন্তু নিজের মাটির সমস্যাকে ভুলে যেও না।
কারণ সত্যিকারের পথ একদিনে তৈরি হয় না। সেটি তৈরি হয় অভিজ্ঞতা, ভুল, সংশোধন, শিক্ষক, মেন্টর, পরিশ্রম এবং মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা দিয়ে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের জীবন তাই আমাদের শেখায়—ছোটবেলার স্বপ্ন বদলাতে পারে, পছন্দের বিষয় বদলাতে পারে, গবেষণার ক্ষেত্র বদলাতে পারে; কিন্তু শেখার আগ্রহ, সততা এবং নিজের দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে মানুষ পথ হারায় না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে নিজের আরও গভীর, আরও অর্থবহ পথ খুঁজে পায়।
তাঁর জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকার :

Leave a comment