“ভালো ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু নম্বর দিয়ে গবেষক হওয়া যায় না; কৌতূহল, ধৈর্য, পড়ার অভ্যাস ও বাস্তব সমস্যা বোঝার ক্ষমতাই একজন গবেষককে আলাদা করে।”
শিক্ষাজীবনে ভালো ফলাফলের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভালো রেজাল্ট একজন শিক্ষার্থীর জন্য দরজা খুলে দেয়—ভর্তি, বৃত্তি, উচ্চশিক্ষা, চাকরি—সব জায়গায় এর ভূমিকা আছে। কিন্তু একজন ভালো ছাত্র আর একজন ভালো গবেষক সব সময় একই জিনিস নয়। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া একজন শিক্ষার্থী গবেষণায় সফল হবেনই—এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার মাঝারি ফলাফলের একজন শিক্ষার্থীও যদি কৌতূহলী হন, নিয়মিত পড়েন, প্রশ্ন করেন এবং বাস্তব সমস্যা বোঝার চেষ্টা করেন, তবে তিনি ধীরে ধীরে ভালো গবেষক হয়ে উঠতে পারেন।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের সাক্ষাৎকারে এই বিষয়টি বারবার ফিরে এসেছে। তিনি নিজের শিক্ষাজীবনের কথা বলতে গিয়ে জানান, ইন্টারমিডিয়েটে তাঁর সবচেয়ে ভালো নম্বর ছিল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে, আর রসায়নে তুলনামূলক কম। অথচ পরবর্তীতে সেই রসায়নই তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। একজন সিনিয়রের দিকনির্দেশনায় তিনি রসায়নের ভিত্তি বুঝতে শুরু করেন, পরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে গবেষণার জগৎকে চিনতে শেখেন। অর্থাৎ শুধু নম্বর নয়, শেখার আগ্রহ ও সঠিক দিকনির্দেশনাই তাঁর পথ বদলে দেয়।
এই অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় শিক্ষা। পরীক্ষার নম্বর আমাদের বর্তমান প্রস্তুতির একটি ছবি দিতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের সম্ভাবনার পূর্ণ মাপ নয়। কোনো বিষয়ে কম নম্বর পাওয়া মানেই সেই বিষয়ে আপনার সম্ভাবনা নেই—এমন ভাবা ভুল। আবার ভালো নম্বর পেলেই যে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্য, কৌতূহল ও হাতে-কলমে কাজের দক্ষতা তৈরি হয়ে গেছে—তাও নয়।
গবেষণার সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হলো প্রশ্ন করার ক্ষমতা। কেন পানি দূষিত হচ্ছে? শিল্পকারখানার বর্জ্যে কী ধরনের ভারী ধাতু আছে? প্লাস্টিক কেন সহজে পচে না? বায়োডিগ্রেডেবল পলিমার কীভাবে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হতে পারে? এসব প্রশ্ন থেকেই গবেষণা শুরু হয়। যে শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার উত্তর মুখস্থ করে, কিন্তু “কেন” প্রশ্ন করে না, সে গবেষণার পথে এগোতে কষ্ট পায়।
ড. হাফিজুর রহমানের গবেষণার ক্ষেত্রও এই প্রশ্ন থেকে জন্ম নিয়েছে। জাপানে তিনি পলিমার রসায়ন নিয়ে কাজ করলেও দেশে ফিরে বুঝতে পারেন, বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে শিল্পায়ন বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে দূষণ। ট্যানারির আশপাশে ক্রোমিয়াম, ব্যাটারি শিল্পের আশপাশে সীসা, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ভারী ধাতু ও দূষক—এসব সমস্যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য গুরুতর। তাই তিনি বায়োডিগ্রেডেবল পলিমারকে পানি শোধন ও ভারী ধাতু অপসারণের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করেন। এটি শুধু ল্যাবের গবেষণা নয়; এটি বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা।
এখানেই একজন গবেষক পরীক্ষার্থী থেকে আলাদা হয়ে ওঠেন। পরীক্ষার্থী বইয়ের প্রশ্নের উত্তর খোঁজে; গবেষক বাস্তব জীবনের প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। পরীক্ষার্থী জানে কোন অধ্যায় থেকে প্রশ্ন আসবে; গবেষক অনেক সময় জানেন না তাঁর প্রশ্নের উত্তর কোথায় আছে। তাই তাঁকে পড়তে হয়, পরীক্ষা করতে হয়, ভুল করতে হয়, আবার চেষ্টা করতে হয়।
ভালো গবেষক হতে হলে পড়ার অভ্যাস অপরিহার্য। গবেষণাপত্র পড়তে হয়, অন্য বিজ্ঞানীরা কী করছেন তা জানতে হয়, নিজের ক্ষেত্রের নতুন অগ্রগতি বুঝতে হয়। ড. হাফিজুর রহমানের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তাঁর শিক্ষকরা তাঁকে গবেষণাপত্র পড়া ও সেখান থেকে গবেষণা-পদ্ধতি বের করার শিক্ষা দেন। এই অভ্যাসই পরে তাঁকে পলিমার সায়েন্স, বায়োডিগ্রেডেবল উপকরণ এবং পরিবেশ রসায়নের মধ্যে সংযোগ খুঁজে নিতে সাহায্য করে।
শুধু পড়া নয়, ধৈর্যও গবেষণার বড় শর্ত। তিনি বলেছেন, জাপানে যে কাজ তিন মাসে করা যেত, বাংলাদেশে সেটি কখনো এক বছর লেগেছে। কারণ ল্যাব সুবিধা সীমিত, যন্ত্রপাতি কম, ফান্ড কম। তবু তিনি কাজ চালিয়ে গেছেন। ভালো জার্নাল থেকে গবেষণাপত্র প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, আবার লিখেছেন, সংশোধন করেছেন, শিখেছেন। ধৈর্য ছাড়া এই পথ চলা সম্ভব নয়।
আজকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই দ্রুত ফল চান। দ্রুত গবেষণাপত্র, দ্রুত স্কলারশিপ, দ্রুত সাফল্য। কিন্তু গবেষণা দ্রুত ফলের খেলা নয়। এটি দীর্ঘ প্রস্তুতির পথ। একটি ভালো গবেষণা তৈরি হতে সময় লাগে; একটি ভালো প্রশ্ন তৈরি হতেও সময় লাগে। কখনো মাসের পর মাস শুধু পড়তে হয়, কখনো একই পরীক্ষা বারবার করতে হয়, কখনো একটি গ্রাফ বা ডাটার ব্যাখ্যা নিয়েই দীর্ঘ আলোচনা করতে হয়।
আরেকটি বড় বিষয় হলো বাস্তব সমস্যা বোঝা। শুধু বিদেশি গবেষণাপত্র পড়ে গবেষণা করলে হবে না; নিজের দেশের প্রয়োজনও বুঝতে হবে। বাংলাদেশের পানি, মাটি, শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য—এসবের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক খুঁজে বের করতে হবে। ড. হাফিজুর রহমানের গবেষণার বিশেষত্ব এখানেই—তিনি পলিমার রসায়নের আন্তর্জাতিক জ্ঞানকে বাংলাদেশের পরিবেশ দূষণের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তরুণদের জন্য তাঁর পরামর্শও একই ধারার। হাই স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের তিনি বলেছেন, শুধু ভালো ফল নয়, বেসিক বুঝে পড়তে হবে। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, জীববিজ্ঞান—সব বিষয়ের ভিত্তি শক্ত করতে হবে। অনেক শিক্ষার্থী ভালো রেজাল্ট করলেও মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। এই সমস্যা কাটাতে হলে মুখস্থ নয়, বোঝার ওপর জোর দিতে হবে।
গবেষক হতে চাইলে শিক্ষার্থীদের কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে—
নিয়মিত প্রশ্ন করা,
বেসিক বুঝে পড়া,
গবেষণাপত্র পড়ার চেষ্টা করা,
ডাটা ও গ্রাফ বোঝা,
সফটওয়্যার শেখা,
ভুল থেকে শেখা,
এবং নিজের দেশের বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া।
ভালো ফলাফল দরকার, কিন্তু সেটি গবেষক হওয়ার একমাত্র পরিচয় নয়। গবেষক হওয়ার জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগ। দরকার এমন কৌতূহল, যা শুধু পরীক্ষার সিলেবাসে আটকে থাকে না। দরকার এমন ধৈর্য, যা প্রত্যাখ্যানের পরও ভেঙে পড়ে না। দরকার এমন পড়ার অভ্যাস, যা অন্যের গবেষণা বুঝে নিজের প্রশ্ন তৈরি করতে সাহায্য করে। আর দরকার এমন সামাজিক বোধ, যা বিজ্ঞানকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের জীবন তাই শিক্ষার্থীদের বলে—নম্বরের জন্য পড়ো, কিন্তু শুধু নম্বরের জন্য নয়। পরীক্ষায় ভালো করো, কিন্তু পরীক্ষার বাইরেও প্রশ্ন করো। বই পড়ো, কিন্তু বাস্তব জীবনের সমস্যাও দেখো। কারণ বিজ্ঞানী হওয়া মানে শুধু ভালো ছাত্র হওয়া নয়; বিজ্ঞানী হওয়া মানে কৌতূহলী মানুষ হওয়া।
তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর পথচলা একটি বড় অনুপ্রেরণা। যে শিক্ষার্থী আজ কোনো বিষয়ে দুর্বল, সে কাল সেই বিষয়েই গবেষক হতে পারে। যে শিক্ষার্থী আজ শুধু পরীক্ষার জন্য পড়ে, সে যদি প্রশ্ন করা শুরু করে, তবে একদিন গবেষণার পথে হাঁটতে পারে। আর যে শিক্ষার্থী নিজের কৌতূহলকে ধরে রাখে, ধৈর্য নিয়ে শেখে এবং বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব দেয়—সেই একদিন জ্ঞানের মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখতে পারে।
তাঁর জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকার :

Leave a comment