লেখা: ড. মশিউর রহমান
মানুষের অগ্রযাত্রার ইতিহাসে বিজ্ঞান শুধু নতুন জ্ঞান আবিষ্কারের মাধ্যম নয়; বিজ্ঞান আমাদের জীবনকে আরও সুস্থ, নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও টেকসই করার অন্যতম প্রধান শক্তি। জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, বিশুদ্ধ পানি, পরিবেশ সংরক্ষণ কিংবা নতুন প্রযুক্তি—বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় চ্যালেঞ্জের সমাধানের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে বিজ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবন জড়িত।
এই বিশ্বাস থেকেই বিজ্ঞানী অর্গ বিজ্ঞানী ও গবেষকদের কাজ, তাঁদের জীবনের গল্প, গবেষণার পেছনের চিন্তা এবং সমাজের জন্য তাঁদের অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে। আমাদের কাছে একজন বিজ্ঞানীর গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের কোনো সমস্যার সমাধান, নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি এবং একটি উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণের সম্ভাবনা। এই জায়গাতেই বিজ্ঞানী অর্গ-এর উদ্দেশ্যের সঙ্গে জাতিসংঘের Sustainable Development Goals বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) একটি স্বাভাবিক ও গভীর সংযোগ তৈরি হয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা—একটি সম্মিলিত বৈশ্বিক অঙ্গীকার
২০১৫ সালে জাতিসংঘের সব সদস্যরাষ্ট্র 2030 Agenda for Sustainable Development গ্রহণ করে। এর কেন্দ্রে রয়েছে ১৭টি Sustainable Development Goal এবং ১৬৯টি Target। এই লক্ষ্যগুলোর উদ্দেশ্য হলো এমন একটি পৃথিবী গড়ে তোলা, যেখানে উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতির কল্যাণ একসঙ্গে বিবেচিত হবে।
দারিদ্র্য ও ক্ষুধার অবসান, সুস্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষা, নারী-পুরুষের সমতা, বিশুদ্ধ পানি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও টেকসই শিল্পায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—সবকিছুই এই ১৭টি লক্ষ্যের অংশ। SDG-এর মূল দর্শনকে তাই খুব সহজভাবে বলা যায়—আমাদের বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন মেটাতে হবে এমনভাবে, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
কিন্তু এই লক্ষ্যগুলো শুধু সরকার কিংবা জাতিসংঘের একার পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। আর এখানেই বিজ্ঞানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিজ্ঞান
একজন গবেষক যখন ক্যানসার শনাক্তকরণের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, তাঁর গবেষণা SDG 3—Good Health and Well-being–এর পথে অবদান রাখে। একজন বিজ্ঞানী যখন সৌরশক্তি, হাইড্রোজেন, উন্নত ব্যাটারি কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করেন, তাঁর গবেষণা SDG 7—Affordable and Clean Energy–এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
নতুন সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, উন্নত উপকরণ বা উৎপাদনপ্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা SDG 9—Industry, Innovation and Infrastructure–এর অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নিঃসরণ বা দুর্যোগ মোকাবিলার গবেষণা SDG 13—Climate Action–এর সঙ্গে যুক্ত। কৃষি, খাদ্য উৎপাদন কিংবা কৃষিপ্রযুক্তির গবেষণা SDG 2—Zero Hunger–কে এগিয়ে নিতে পারে। পানি ও পরিবেশ নিয়ে গবেষণা SDG 6—Clean Water and Sanitation, SDG 14—Life Below Water এবং SDG 15—Life on Land–এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অর্থাৎ গবেষণাগারের একটি আবিষ্কার এবং জাতিসংঘের একটি বৈশ্বিক লক্ষ্য অনেক সময় একই সমস্যার সমাধানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—শুধু তাদের ভাষা ও কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন।
বিজ্ঞানী অর্গ: বিজ্ঞানী, নতুন প্রজন্ম ও SDG-এর মধ্যে একটি সেতু
বিজ্ঞানী অর্গ-এর কাজের মূল কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ—বিশেষ করে সেই বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা, যাঁরা জ্ঞান সৃষ্টি করছেন, এবং সেই তরুণেরা, যারা আগামী দিনের বিজ্ঞানী হতে পারে। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত বিজ্ঞানী, গবেষক ও উদ্ভাবকদের খুঁজে বের করি। তাঁদের গবেষণা, শিক্ষাজীবন, সংগ্রাম, ব্যর্থতা, সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ ভাবনা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরি।
এখন থেকে আমরা এই গল্পগুলোর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দৃশ্যমান করতে চাই—একজন বিজ্ঞানীর গবেষণা জাতিসংঘের কোন Sustainable Development Goal বা Goals-এর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তাঁর গবেষণা কীভাবে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখছে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো বিজ্ঞানীর সাক্ষাৎকার বা প্রোফাইলে তাঁর গবেষণার বিষয় ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি আমরা সংশ্লিষ্ট SDG চিহ্নিত করতে পারি। তাঁর গবেষণা যদি নতুন ব্যাটারি প্রযুক্তি নিয়ে হয়, তাহলে SDG 7 ও SDG 9-এর সঙ্গে এর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। জনস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা হলে SDG 3, পরিবেশ নিয়ে কাজ হলে SDG 13 বা SDG 15, আর কৃষিপ্রযুক্তি হলে SDG 2 ও SDG 9-এর সঙ্গে এর সংযোগ তুলে ধরা যেতে পারে।
তবে আমাদের উদ্দেশ্য শুধু SDG-এর একটি লোগো যুক্ত করা নয়। আমরা দেখাতে চাই গবেষণা থেকে বাস্তব জীবনের প্রভাব তৈরির পথটি।
বৈজ্ঞানিক সমস্যা → গবেষণা ও উদ্ভাবন → সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব → সংশ্লিষ্ট SDG
এই সংযোগটি পাঠকের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরাই হবে আমাদের প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আমাদের নিজস্ব কাজও SDG-এর অংশ
বিজ্ঞানী অর্গ শুধু অন্য বিজ্ঞানীদের SDG-সংশ্লিষ্ট গবেষণা তুলে ধরছে না; আমাদের নিজস্ব কার্যক্রমও কয়েকটি SDG-এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো SDG 4: Quality Education। SDG 4-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের এমন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা, যা টেকসই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীদের বাস্তব জীবনের গল্প, গবেষণার বিষয়, উচ্চশিক্ষার পথ এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা তরুণদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে বিজ্ঞানী অর্গ বিজ্ঞানশিক্ষা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে চায়।
একজন স্কুলশিক্ষার্থী যখন প্রথমবার বাংলাদেশের কোনো বিজ্ঞানীর মহাকাশ গবেষণার গল্প পড়ে এবং নিজেও বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিংবা একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যখন বিদেশে কর্মরত একজন গবেষকের সাক্ষাৎকার থেকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথ সম্পর্কে জানতে পারে—সেখানেই আমাদের কাজের প্রকৃত প্রভাব তৈরি হয়।
একইভাবে আমাদের কাজ SDG 17: Partnerships for the Goals–এর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজ্ঞানভিত্তিক সংগঠনের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করা এবং জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করা আমাদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিজ্ঞান কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞানও সীমান্ত মানে না। তাই বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থীকে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, সিঙ্গাপুর কিংবা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের একজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে জ্ঞানের মাধ্যমে যুক্ত করাও একধরনের বৈশ্বিক অংশীদারত্ব।
বিজ্ঞানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া
গবেষণাপত্রের ভাষা সাধারণত বিশেষজ্ঞদের জন্য। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার গবেষণাগার বা বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হলেও সাধারণ মানুষ কিংবা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীর কাছে তার তাৎপর্য সব সময় সহজে পৌঁছায় না। বিজ্ঞানী অর্গ এই দূরত্ব কমাতে চায়।
আমরা জানতে চাই—বিজ্ঞানী কী আবিষ্কার করেছেন, কেন করেছেন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, এই গবেষণা মানুষের জীবন বা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কীভাবে পরিবর্তন করতে পারে? এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলেই বিজ্ঞান ও Sustainable Development Goals-এর সম্পর্ক আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
UNESCO-ও বর্তমানে বিজ্ঞানের এই ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতিসংঘ ২০২৪–২০৩৩ সময়কালকে International Decade of Sciences for Sustainable Development হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং UNESCO এর বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিজ্ঞানকে সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা এবং বৈজ্ঞানিক সমাজ, নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা।
বিজ্ঞানী অর্গ-এর কাজের দর্শনও এই বৃহত্তর বৈশ্বিক চিন্তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ—বিজ্ঞানকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং আগামী প্রজন্মকে বিজ্ঞানের মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্যাগুলোর সমাধানে অংশ নিতে উৎসাহিত করা।
প্রতিটি বিজ্ঞানীর গল্প—একটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা
আমরা বিশ্বাস করি, পৃথিবীর বড় পরিবর্তনগুলো অনেক সময় একটি ছোট প্রশ্ন থেকে শুরু হয়। কোনো শিক্ষার্থী হয়তো বিজ্ঞানী অর্গ-এ একজন বিজ্ঞানীর গল্প পড়ল। সেই গল্প থেকে তার মনে বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ তৈরি হলো। সে উচ্চশিক্ষায় গেল, গবেষণা শুরু করল এবং একদিন হয়তো এমন একটি প্রযুক্তি আবিষ্কার করল, যা মানুষের জীবন বদলে দিল। তখন একটি গল্প আর শুধু গল্প থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে পরিবর্তনের সূচনা।
এই কারণেই বিজ্ঞানী অর্গ-এর কাছে Sustainable Development Goals কেবল ১৭টি আন্তর্জাতিক লক্ষ্য কিংবা কিছু রঙিন প্রতীক নয়। এগুলো পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোকে বোঝার একটি অভিন্ন ভাষা। আর বিজ্ঞান সেই সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। আমাদের কাজ সেই দুই জগতকে যুক্ত করা।
বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ও জীবনের গল্প তুলে ধরা।সেই গবেষণার সামাজিক ও বৈশ্বিক প্রভাব ব্যাখ্যা করা।SDG-এর সঙ্গে তার সম্পর্ক দৃশ্যমান করা।এবং নতুন প্রজন্মকে বোঝানো—আগামী পৃথিবীর সমাধান তৈরিতে তারও ভূমিকা থাকতে পারে।
বিজ্ঞানী অর্গ তাই শুধু বিজ্ঞানীদের গল্প সংরক্ষণ করতে চায় না। আমরা চাই এই গল্পগুলো নতুন প্রশ্ন তৈরি করুক, নতুন স্বপ্নের জন্ম দিক এবং নতুন প্রজন্মকে গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবকল্যাণের পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করুক। কারণ আজকের একজন বিজ্ঞানীর গল্প থেকেই হয়তো জন্ম নেবে আগামী দিনের আরেকজন বিজ্ঞানী। আর তাঁর হাত ধরেই হয়তো পৃথিবী আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে একটি সুস্থ, সমতাপূর্ণ, উদ্ভাবনী এবং টেকসই ভবিষ্যতের দিকে।

Leave a comment