ড. মশিউর রহমান
ঢাকার কোনো এক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। দুপুরের রোদে পুড়ে যাওয়া কংক্রিটের রাস্তা। এক বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হেঁটে যাচ্ছে হাতে একটা মোটা বই নিয়ে, মাথায় একগুচ্ছ প্রশ্ন। সে জানে, তাকে আজ কোয়ান্টাম থিওরি পড়তে হবে, কাল ল্যাবে রিপোর্ট জমা দিতে হবে, কিন্তু তার ভেতরে খচখচ করে একটা আলাদা ভয়। পড়াশোনা শেষ করে সে কি আদৌ কোনো জায়গা পাবে, নাকি এই জ্ঞানটুকুই হবে তার একমাত্র সম্বল? একটা দেশের শত শত তরুণের মতো সেও বুঝতে পারছে, ডিগ্রি আর স্বপ্নের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে।
আমরা আজ এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন বিজ্ঞান কেবল ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ নেই। বিজ্ঞান এখন রাজনীতি বদলায়, শিল্পের গতি নির্ধারণ করে, সমাজের নৈতিক মানচিত্র নতুন করে আঁকে। অথচ আমাদের দেশে বিজ্ঞানী বলতে এখনো অনেকের চোখে একজন চশমা পরা, চুপচাপ চরিত্র, যে বইয়ের ভেতর ডুবে থাকে, বাস্তব দুনিয়ার সঙ্গে যার তেমন সম্পর্ক নেই। এই ধারণা যত পুরোনো, ততটাই ক্ষতিকর। কারণ আধুনিক বিজ্ঞানী মানে কেবল গবেষক না, তিনি একাধারে সমাজ বিশ্লেষক, প্রযুক্তির পথপ্রদর্শক আর ভবিষ্যতের নীতিনির্মাতা।
বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে আজ বিজ্ঞান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিক করে দিচ্ছে কোন চাকরি থাকবে, কোনটা থাকবে না। জিন সম্পাদনার মতো প্রযুক্তি প্রশ্ন তুলছে, মানুষের জীবন কতটা “ডিজাইন” করা যাবে। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু আবহাওয়ার ব্যাপার না, এটা অর্থনীতি, অভিবাসন আর রাজনীতির প্রশ্ন। এসব জায়গায় বিজ্ঞানীর ভূমিকা আর নিরব দর্শকের নয়। অথচ বাংলাদেশে এখনো বিজ্ঞানী মানে পরীক্ষাগারের ভিতরের মানুষ, নীতিনির্ধারণ টেবিলের বাইরের কেউ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, আগামী দশ বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে রূপান্তরিত হবে। অথচ আমরা সেই শিল্পের ডিজাইনার তৈরি করছি না, তৈরি করছি তার ব্যবহারকারী। UNESCO জানাচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে গবেষণায় বিনিয়োগ যত কম, শিল্পায়নে তত বেশি ঋণনির্ভরতা। অর্থাৎ যে দেশ আইডিয়া তৈরি করে, সে দেশ ঋণ দেয়। যে দেশ আইডিয়া কিনে, সে দেশ ঋণ নেয়। বাংলাদেশ এখনো দ্বিতীয় দলে।
শিল্প মানেই এখন আর কারখানার ধোঁয়া না। শিল্প মানে ডেটা, অ্যালগরিদম, বায়োটেকনোলজি, গ্রিন এনার্জি। জার্মানির অটো ইন্ডাস্ট্রি কেবল গাড়ি বানায় না, তারা সফটওয়্যার বিক্রি করে। আমেরিকার বড় বড় কোম্পানি নিজেদের প্রযুক্তিকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপ দিচ্ছে। আর আমরা? আমরা এখনো গবেষণাকে বিলাসিতা ভাবি। OECD দেশগুলো যেখানে গড়ে তাদের জিডিপির প্রায় ২.৫ থেকে ৩ শতাংশ গবেষণায় বিনিয়োগ করে, সেখানে বাংলাদেশের বরাদ্দ এখনো এক শতাংশের অনেক নিচে। এ যেন ভবিষ্যতের জন্য না খরচ করে আজকের দিনটুকু কোনোভাবে কাটিয়ে দেওয়া।
কিন্তু শুধু টাকার অভাব নয়, অভাব আমাদের কল্পনার। আমরা বিজ্ঞানীকে সমাজের চিন্তক হিসেবে কল্পনা করিনি। অথচ আধুনিক বিজ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারের সিদ্ধান্তে প্রমাণের আলো ফেলে, ব্যবসার নৈতিকতা মাপেন তথ্যের দাঁড়িপাল্লায়। করোনা মহামারির সময় যেসব দেশ বিজ্ঞানীদের কথা শুনেছে, তারা কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা বিজ্ঞানের জায়গায় রাজনীতি বসিয়েছে, তারা শিখেছে মৃত্যুর ভাষা।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ভুক্তভোগী দেশ। উপকূলের মানুষ ঘর হারাচ্ছে, কৃষক ফসল হারাচ্ছে, শহর ভিড়ছে। এই বাস্তবতায় বিজ্ঞানী মানে শুধু গবেষণাগারে বসে রিপোর্ট লেখা না, বিজ্ঞানী মানে মাঠে নামা মানুষ। নদীর লবণাক্ততা বোঝা, বন্যার প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করা, শহরের তাপদাহ মাপা, এগুলো শুধু একাডেমিক কাজ না, এগুলো বেঁচে থাকার বিজ্ঞান।
নীতিনির্ধারণে বিজ্ঞানীর অনুপস্থিতি যেন আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। বাজেট আলোচনা হয়, আইন পাস হয়, উন্নয়ন প্রকল্প হয়, কিন্তু সেখানে পরীক্ষিত তথ্যের ওজন কতটা? আমরা আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেই, প্রমাণ দিয়ে কম। অথচ উন্নত বিশ্বে নীতিনির্ধারণ মানেই ডেটা-ড্রিভেন ডিসিশন। যুক্তরাজ্যে পার্লামেন্টে বিজ্ঞানীরা নিয়মিত ডাক পান, আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান উপদেষ্টা আছেন। আর বাংলাদেশে বিজ্ঞানী বেশি পরিচিত হলে নোবেল পাওয়া একজন হিসেবেই।
তুমি যে এই লেখাটা পড়ছ, হয়তো ভেবে বসে আছ, “এসব তো বড় বড় কথা, আমার পক্ষে কী হবে?” কিন্তু মনে রেখো, আধুনিক বিজ্ঞানী হওয়া মানে শুধু পিএইচডি করা না, মানে চিন্তার দায়িত্ব নেওয়া। তুমি যেখানেই থাকো, যাই পড়ো, যদি তুমি তথ্যভিত্তিক ভাবতে শেখো, প্রশ্ন করতে শেখো, তুমি এই আন্দোলনের অংশ।
একজন বিজ্ঞানী সমাজে আলো জ্বালান, কিন্তু সেই আলো যদি দেয়ালের ভেতর বন্দি থাকে, তাহলে শহর অন্ধকারই থেকে যায়। আমাদের দরকার সেই বিজ্ঞানী, যিনি জানালার কাছে দাঁড়ান, দরজা খুলে দেন, রাস্তায় আলো ফেলেন। যিনি শিল্পের হাত ধরেন, নীতির কানে কথা বলেন আর সমাজের চোখে সত্যটা তুলে ধরেন।
এই দেশের ভবিষ্যৎ সিলেবাসে লেখা নেই। এই দেশের ভবিষ্যৎ লেখা হচ্ছে তোমার চিন্তায়। তুমি চাইলে শুধু চাকরি খুঁজতে পারো, চাইলে ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারো। আধুনিক যুগে বিজ্ঞানী হওয়া মানে সুবিধা পাওয়া না, মানে দায়িত্ব নেওয়া। আর এই দায়িত্বের ওজনই একদিন তোমাকে বড় করে তুলবে।
আমরা আর সেই সময় নেই, যখন বিজ্ঞানীরা চুপচাপ থাকবেন আর সমাজ জোরে কথা বলবে। আমাদের দরকার বিজ্ঞানীদের কণ্ঠ, যুক্তির সাহস, তথ্যের শক্তি। আর সেই কণ্ঠের একজন হতে পারো তুমি।
রাতের শেষে আবার সেই ল্যাপটপের আলো। কিন্তু এবার কপি-পেস্ট না, এবার পরিকল্পনা। নিজের দেশ, নিজের সময়, নিজের ভূমিকা ঠিক করার পরিকল্পনা। এটাই আধুনিক বিজ্ঞানীর প্রথম পরীক্ষা।

Leave a comment