এক যন্ত্রে দুই কাজ: রিজেনারেটিভ ফুয়েল সেল কেন ভবিষ্যতের শক্তি প্রযুক্তি
“রিজেনারেটিভ ফুয়েল সেল এমন একটি ব্যবস্থা, যা একই সঙ্গে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি করতে পারে এবং সেই হাইড্রোজেন থেকে বিদ্যুৎও উৎপাদন করতে পারে।”
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার এই কথাটি ভবিষ্যতের জ্বালানি প্রযুক্তির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকে সহজ করে দেয়। আমরা সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদন আর জ্বালানি সংরক্ষণকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখি। কিন্তু ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন শক্তি ব্যবস্থায় এই দুই কাজকে একসঙ্গে ভাবা জরুরি হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন হলো—যখন সূর্য থাকবে না বা বাতাস বইবে না, তখন বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে?
এই প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য উত্তর হলো হাইড্রোজেন। দিনের বেলায় যদি সৌরবিদ্যুৎ বেশি উৎপাদিত হয়, সেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দিয়ে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি করা যায়। পরে রাতের বেলায় বা বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে সেই হাইড্রোজেন ব্যবহার করে আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। অর্থাৎ হাইড্রোজেন এখানে শুধু জ্বালানি নয়, এটি শক্তি সংরক্ষণের একটি মাধ্যমও।
সাধারণ ব্যবস্থায় এই কাজের জন্য দুটি আলাদা যন্ত্র প্রয়োজন হয়। একটি হলো ওয়াটার ইলেকট্রোলাইজার, যার কাজ পানি ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করা। অন্যটি হলো ফুয়েল সেল, যার কাজ সেই হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। কিন্তু দুটি আলাদা যন্ত্র মানে বেশি খরচ, বেশি জায়গা, বেশি উপকরণ এবং বেশি প্রযুক্তিগত জটিলতা।
এখানেই আসে রিজেনারেটিভ ফুয়েল সেল। এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যা একই যন্ত্রে দুই দিকের কাজ করতে পারে। যখন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, তখন এটি ইলেকট্রোলাইজারের মতো পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি করবে। আবার যখন বিদ্যুৎ দরকার হবে, তখন এটি ফুয়েল সেলের মতো সেই হাইড্রোজেন ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।
সহজ উদাহরণ দিলে বলা যায়, এটি অনেকটা এমন একটি যন্ত্রের মতো, যা দিনের বেলায় বিদ্যুৎকে “জ্বালানি” হিসেবে জমা রাখে, আর রাতে সেই জমা জ্বালানি থেকে আবার বিদ্যুৎ ফিরিয়ে দেয়। যেমন আমরা মোবাইল ফোন চার্জ দিয়ে পরে ব্যবহার করি, তেমনি রিজেনারেটিভ ফুয়েল সেল নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকে হাইড্রোজেন আকারে সংরক্ষণ করে পরে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে পারে। তবে এখানে সাধারণ ব্যাটারির বদলে রাসায়নিক শক্তি হিসেবে হাইড্রোজেন ব্যবহৃত হয়।
ড. রানার গবেষণার গুরুত্ব এখানেই। তিনি এমন রিজেনারেটিভ ফুয়েল সেল প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যা শুধু কার্যকর নয়, তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ীও হতে পারে। বর্তমানে অনেক ফুয়েল সেল প্রযুক্তিতে প্লাটিনাম ও ইরিডিয়ামের মতো মূল্যবান ধাতু ব্যবহৃত হয়। এগুলো খুব কার্যকর হলেও ব্যয়বহুল। ফলে প্রযুক্তির খরচ বেড়ে যায় এবং তা সাধারণ ব্যবহারের পর্যায়ে আনতে সমস্যা হয়।
এই সীমাবদ্ধতা কাটানোর জন্য তিনি কাজ করছেন অ্যানায়ন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেনভিত্তিক রিজেনারেটিভ ফুয়েল সেল নিয়ে। এই ব্যবস্থায় রাসায়নিক পরিবেশ অ্যালকালাইন হওয়ায় নিকেল, আয়রন, কোবাল্ট বা মলিবডেনামের মতো তুলনামূলক সস্তা নন-নোবেল মেটাল ক্যাটালিস্ট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে প্রযুক্তির খরচ কমানো সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে সূর্যালোক আছে, পানি আছে, কিন্তু জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। যদি ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী রিজেনারেটিভ ফুয়েল সেল প্রযুক্তি উন্নত করা যায়, তাহলে সৌরশক্তি থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ হাইড্রোজেন হিসেবে সংরক্ষণ করে পরে ঘর, শিল্প বা গ্রামীণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে এই প্রযুক্তি এখনো গবেষণা ও উন্নয়নের পথে। নিরাপদ হাইড্রোজেন সংরক্ষণ, যন্ত্রের দীর্ঘস্থায়িত্ব, খরচ কমানো এবং বড় পরিসরে ব্যবহারযোগ্যতা—এসব বিষয় নিয়ে আরও কাজ করতে হবে। কিন্তু ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের প্রযুক্তিই নতুন পথ দেখাতে পারে।
রিজেনারেটিভ ফুয়েল সেল আমাদের শেখায়, শক্তির ভবিষ্যৎ শুধু উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার সমন্বয়ই হবে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ। ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার গবেষণা সেই চ্যালেঞ্জেরই একটি বৈজ্ঞানিক উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টা।
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment