একটু ভাবুন!
দুপুরের তপ্ত সূর্য চৈত্র-বৈশাখের খড়গহস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বরেন্দ্রভূমির কোনো এক বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের ওপর।
তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে কচি ধানের শীষগুলোর।
কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য তাকে তো ‘নিঃশ্বাস’ নিতে হবে, বাতাস থেকে টেনে নিতে হবে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2) নামক পদার্থ। আর যেই না সে পাতার গায়ে থাকা তার ছোট ছোট জানালাগুলো, বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন ‘স্টোমাটা’ বা পত্ররন্ধ্র- খুলল, অমনি ভেতরের মহামূল্যবান পানিটুকু জলীয় বাষ্প হয়ে উড়ে চলে গেল বাতাসে!
এ যেন এক চিরন্তন ট্র্যাজেডি! কার্বন বাঁচাতে গেলে পানি হারায়, আর পানি বাঁচাতে গেলে কার্বন জোটে না। উদ্ভিদের এই হাজার বছরের পুষ্টি আর পানির আত্মত্যাগের লড়াইয়ে সম্প্রতি বিশ্বমঞ্চের বিজ্ঞানীরা এমন দুটি অস্ত্র আবিষ্কার করেছেন, যা আগামী দিনের বৈশ্বিক কৃষিকে তো বটেই, জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ফ্রন্টলাইনে থাকা বাংলাদেশের কৃষিকেও চিরতরে বদলে দিতে পারে। ল্যাবরেটরির চার দেয়াল ভেঙে এই আণুবীক্ষণিক আবিষ্কার এখন আমাদের মাঠের লাঙলকে এক নতুন শক্তির যোগান দিতে প্রস্তুত!
এক প্রাচীন শ্যাওলার গোপন ‘ভেলক্রো’ কৌশল
আমাদের চেনা ধান, গম, তুলা কিংবা সরিষা গাছের ভেতরে কার্বন ধরে রাখার মূল সেনাপতি হলো রুবিস্কো (Rubisco) নামক একটি এনজাইম। কিন্তু এই সেনাপতিটি বড্ড অলস আর বিভ্রান্ত! সে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ধরার কথা ভুলে মাঝেমধ্যেই অক্সিজেনকে বুকে টেনে নেয়। ফলাফল? ‘ফটোরেস্পিরেশন’ নামের এক চরম অপচয়, যেখানে তীব্র তাপদাহের সময় গাছের নিজের তৈরি করা খাদ্যের একটা বড় অংশই অপচয় হয়ে যায়, দানাগুলো পরিণত হয় চিটায়। ফলাফল, ফসলের সম্ভাব্য ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
ঠিক এই জায়গাটাতেই সম্ভাবনাময় সমাধান হয়ে এলো Hornwort (Anthoceros agrestis) নামের এক আদিম স্থলজ উদ্ভিদ বা ব্রায়োফাইট। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে ভাবতেন, জলজ শৈবালরা তাদের ক্লোরোপ্লাস্টের ভিতর পাইরেনয়েড (Pyrenoid) নামক ক্লোরোপ্লাস্টের ভেতরের বিশেষ প্রোটিন-ঘনীভূত কাঠামো যা রুবিস্কো নামক এনজাইমগুলোকে এক জায়গায় ঘন অবস্থায় জমা করে রাখে, ঠিক একইভাবে হর্নওয়ার্টও হয়তো তেমনি কোনো জটিল পথ অবলম্বন করে। কিন্তু এবার Boyce Thompson Institute, Cornell University, এবং University of Edinburgh জিনোম বিশ্লেষণে বেরিয়ে এলো এক অবিশ্বাস্য সত্য!
হর্নওয়ার্ট কোনো বাইরের প্রোটিনের সাহায্য নেয়নি। সে তার নিজের রুবিস্কো এনজাইমের লেজে একটা ছোট্ট বিবর্তনীয় পরিবর্তন এনেছে, যার নাম STAR ডোমেন। এটি ঠিক যেন একটি প্রাকৃতিক ‘ভেলক্রো’ (Velcro) বা আঠা! এই আঠার কারণে হর্নওয়ার্টের রুবিস্কোগুলো জটলা পাকিয়ে ক্লোরোপ্লাস্টের ভেতর ঘন মেঘের মতো ছড়াতে থাকে এবং চারপাশে কার্বনের একটি শক্তিশালী দুর্গ তৈরি করে। ফলে অলস রুবিস্কো আর অক্সিজেন ছোঁয়ার সুযোগ পায় না, শুধু কার্বনই খেতে থাকে।
বিপ্লবটা যেখানে
বিজ্ঞানীরা এই হর্নওয়ার্টের ‘ভেলক্রো’ জিনটি ল্যাবরেটরিতে কেটে এনে পরীক্ষামূলকভাবে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন আধুনিক উদ্ভিদ বিজ্ঞানের মডেল প্ল্যান্ট Arabidopsis thaliana-র কোষে। ফলাফল ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আধুনিক উদ্ভিদের রুবিস্কোও মুহূর্তের মধ্যে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে কার্বন জমানোর কারখানা তৈরি করে ফেলেছে। গত কয়েক দশক ধরে জলজ শৈবালের জিন আধুনিক ফসলে জোড়া লাগানোর সব চেষ্টা যেখানে ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে হর্নওয়ার্ট এর এই কোডটি আমাদের আধুনিক ফসলের কোষে নিখুঁতভাবে খাপ খেয়ে গেছে!
উদ্ভিদের ফুসফুসে লাইভ ক্যামেরা!
এতক্ষণ যা চলত কোষের ভেতরের পর্দার আড়ালে, এবার তা সরাসরি চোখের সামনে দেখার পালা। উদ্ভিদ কীভাবে শ্বাস নেয়, কীভাবে কার্বন ও পানির সমীকরণ মেলায়, তা দেখার জন্য বিজ্ঞানীরা এতদিন অন্ধের মতো হাতড়াতেন। পাতার ছিদ্র গোনার জন্য পাতা কেটে শুকিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে নিতে হতো। ততক্ষণে তো সেই পাতার প্রাণই শেষ!
কিন্তু ইলিনয় ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী এবার তৈরি করে ফেলেছেন এক আশ্চর্য দূরবীন “Stomata In-Sight”। এটি কোনো সাধারণ ক্যামেরা নয়; এটি হাই-স্পিড লেজার স্ক্যানিং কনফোকাল মাইক্রোস্কোপি এবং ইনফ্রারেড গ্যাস অ্যানালাইজারের এক দুর্দান্ত কোলাজ, যার ব্যাকবোন হিসেবে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI।
| প্রযুক্তি উপাদান | সিস্টেমে এর মূল ভূমিকা |
|---|---|
| কনফোকাল মাইক্রোস্কোপি | লেজার রশ্মি ব্যবহার করে জীবন্ত পাতার ভেতরের কোষের নিখুঁত 3D লাইভ দৃশ্য দেখায়। |
| ইনফ্রারেড গ্যাস অ্যানালাইজার | পাতাটি ঠিক কতটুকু কার্বন নিল এবং কতটুকু পানি ছাড়ল তা রিয়েল-টাইমে মাপে। |
| এআই কম্পিউটার ভিশন | একসাথে স্ক্রিনে থাকা শত শত পত্ররন্ধ্রের সূক্ষ্ম নড়াচড়া ও খোলা-বন্ধ হওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্র্যাক করে। |
ল্যাবরেটরির কাচের চেম্বারে যখন কৃত্রিম মেঘ তৈরি করা হয় বা তাপমাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন পাতার ভেতরের সেলগুলো কীভাবে সংকুচিত হচ্ছে, গার্ড সেলগুলো কীভাবে জানালা বন্ধ করছে- তা থ্রিডি অ্যানিমেশনের মতো লাইভ স্ক্রিনে ভেসে ওঠে। একদিকে চোখের সামনে পাতার মুখ খোলা-বন্ধ হওয়া দেখা যাচ্ছে, ঠিক একই সেকেন্ডে পাশের গ্রাফে দেখা যাচ্ছে ঠিক কতটা পানি বের হয়ে গেল আর কতটা কার্বন গাছটি হজম করল!
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: খরা, লবণাক্ততা আর ফোর্থ আইআর (4IR)-এর যুগলবন্দি
এবার আসা যাক আমাদের নিজস্ব বাস্তবতায়। বাংলাদেশ আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক নির্মম ফ্রন্টলাইন। একদিকে আমাদের আবাদি জমি কমছে, অন্যদিকে বরেন্দ্র অঞ্চলের তীব্র খরা, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা আর ঘন ঘন ধেয়ে আসা হিটওয়েভ, বন্যা ও সাইক্লোন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই দুটি প্রযুক্তি আমাদের জন্য বিলাসবহুল কোনো বিজ্ঞান নয়, বরং টিকে থাকার হাতিয়ার।
· বরেন্দ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলে ফলনের বিপ্লব
আমাদের আমন বা আউশ মৌসুমে যখন তীব্র তাপদাহ চলে, তখন ধানের রুবিস্কো এনজাইমটি খেই হারিয়ে ফেলে খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে দেয়। যদি হর্নওয়ার্ট শ্যাওলার এই ‘ভেলক্রো’ জিনটি আমাদের স্থানীয় খরা-সহনশীল ধানের জাত কিংবা লবণাক্ততা-সহনশীল জাতের ভেতর সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা যায়, তবে তা হবে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি! তীব্র প্রতিকূলতার মধ্যেও ধানের ভেতরের রুবিস্কো এনজাইমটি তার কার্যক্ষমতা হারাবে না, সালোকসংশ্লেষণের গতি সচল রেখে চিটার পরিমাণ কমিয়ে ভবিষ্যতে ফলন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব মাঠ পর্যায়ের গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।
· টেকসই কৃষি এবং দ্রুত জাত উদ্ভাবন
বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে কৃষিকে আধুনিকীকরণ এবং টেকসই করার জন্য চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (4IR) প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। আমাদের দেশের ব্রি (BRRI) বা বিনা (BINA)-র বিজ্ঞানীরা প্রতি বছর শত শত নতুন জেনোটাইপ তৈরি করছেন। কিন্তু কোন জাতটি মাঠের তীব্র খরা বা তাপদাহে সবচেয়ে কম পানি খরচ করে সবচেয়ে বেশি ফলন দেবে, তা পরীক্ষা করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়।
“Stomata In-Sight” প্রযুক্তির সাহায্যে আমাদের বিজ্ঞানীরা ল্যাবের ভেতরেই কয়েক মিনিটের মধ্যে স্ক্রিন আউট করতে পারবেন কোন জাতটি ‘টেকসই’। বোরো মৌসুমে যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, সেখানে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন পানি-সাশ্রয়ী ধানের জাত বেছে নেওয়া সম্ভব, যা কম সেচেই চমৎকার ফলন দেবে।
মহাকাব্যের শেষ অঙ্ক: ল্যাব থেকে লাঙল
এতদিন বিজ্ঞানের এই সূক্ষ্ম শারীরবৃত্তীয় (Physiological) পরিবর্তনগুলো ছিল কেবলই আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রের তাত্ত্বিক কচকচানি। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে, যেখানে এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদী রাখার সুযোগ নেই, সেখানে এই প্রযুক্তিগুলোকে দ্রুত দেশের মাটিতে কাজে লাগাতে হবে।
আমাদের দেশের শীর্ষস্থানীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক এই গবেষণার সাথে যুক্ত হয়ে দ্রুত এই প্রযুক্তিগুলোর দেশীয় ফসলের ওপর ট্রায়াল শুরু করতে পারে। হর্নওয়ার্টের জিনগত জাদু আর এআই-চালিত লাইভ মাইক্রোস্কোপির এই যুগলবন্ধন যখন ল্যাবরেটরির টেস্টটিউব থেকে আমাদের কৃষকের মাঠের লাঙলে এসে পৌঁছাবে, তখনই নিশ্চিত হবে জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে বাংলাদেশের প্রকৃত খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও টেকসই পুষ্টি নিরাপত্তা। তপ্ত মাটিও তখন আবার ফসলের হাসিতে সবুজ হয়ে উঠবে!

Leave a comment