ড. মশিউর রহমান
একটা সময় মানুষ জ্ঞান অর্জনের জন্য বই পড়ত। একটি প্রবন্ধ পড়তে কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করত, একটি বক্তৃতা মনোযোগ দিয়ে শুনত, কিংবা কোনো বিষয়ে নিজের অবস্থান তৈরির আগে বিভিন্ন মতামত যাচাই করত। চিন্তা করা ছিল এক ধরনের অনুশীলন। ধৈর্য ছিল জ্ঞানের পূর্বশর্ত।
আজও তথ্যের অভাব নেই। বরং মানবসভ্যতার ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম আমরা এত বিপুল পরিমাণ তথ্যের নাগাল পেয়েছি। একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র পর্যন্ত কয়েক সেকেন্ডেই পাওয়া যায়। তবু একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে—তাহলে কি আমরা সত্যিই আগের চেয়ে বেশি জ্ঞানী হয়ে উঠছি? নাকি তথ্যের প্রাচুর্যের মধ্যেও আমাদের চিন্তার গভীরতা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নটি নিছক আবেগের নয়; বরং এটি আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক প্রশ্ন।
সোশ্যাল মিডিয়ার শুরুর দিনগুলো ছিল ভিন্ন। ২০০৫ সালে YouTube যাত্রা শুরু করেছিল এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে, যেখানে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি কনটেন্ট তৈরি করত। কেউ বিজ্ঞান শেখাত, কেউ ইতিহাস ব্যাখ্যা করত, কেউ বাদ্যযন্ত্র শেখাত, কেউ প্রযুক্তির জটিল বিষয় সহজ করে তুলে ধরত। ২০০৬ সালে Facebook সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর মানুষ দূরের মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার নতুন সুযোগ পেল। ২০১০ সালে Instagram সৃজনশীলতা ও নান্দনিক উপস্থাপনার একটি নতুন মাত্রা যোগ করল।
তখনও “ভাইরাল” হওয়া ছিল ব্যতিক্রম; মূলধারায় ছিল “মূল্য তৈরি করা”।
কিন্তু গত এক দশকে দৃশ্যপট দ্রুত বদলে গেছে।
২০১৬ সালে চীনের প্রতিষ্ঠান ByteDance Douyin চালু করে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে TikTok নামে পরিচিতি পায়। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামাজিক মাধ্যমগুলোর একটিতে পরিণত হয়। TikTok-এর সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন ছিল এর অ্যালগরিদম। আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মূলত নির্ভর করত আপনি কাকে অনুসরণ করছেন তার ওপর। TikTok সেই ধারণা পাল্টে দিল। আপনি কোনো ভিডিওতে কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় থামলেন কি না, কোথায় লাইক দিলেন, কোথায় স্ক্রল করলেন—এই ক্ষুদ্র আচরণগুলো বিশ্লেষণ করে অ্যালগরিদম সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করল, পরবর্তী মুহূর্তে আপনাকে কী দেখানো হবে।
আমরা সম্পর্কভিত্তিক সামাজিক মাধ্যম থেকে প্রবেশ করলাম মনোযোগভিত্তিক অর্থনীতিতে।
এরপর যা ঘটল, তা প্রযুক্তির ইতিহাসে বিরল। TikTok-এর সাফল্য দেখে Instagram নিয়ে এল Reels, YouTube নিয়ে এল Shorts, Facebook-ও একই পথে হাঁটল। পুরো ইন্টারনেট যেন ধীরে ধীরে একটি বিশাল “For You Page”-এ পরিণত হলো।
এখানেই সমস্যার সূচনা।
আজ আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো ব্যক্তি হয়তো তুচ্ছ একটি কাজ করছে—পানি গরম করছে, অদ্ভুত মুখভঙ্গি করছে, কিংবা কোনো নাটকীয় প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে—আর সেটিই লক্ষ লক্ষ মানুষের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে, একটি গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণ, একটি শিক্ষামূলক ভিডিও বা গভীর আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম মানুষের কাছে পৌঁছায়।
ফলে একটি বিপজ্জনক সামাজিক বার্তা তৈরি হয়—গভীরতা নয়, মনোযোগই আসল; দক্ষতা নয়, দৃশ্যমানতাই সাফল্যের মানদণ্ড।
এই পরিবর্তনকে অনেকে ব্যক্তিগত রুচির অবক্ষয় হিসেবে দেখেন। কিন্তু বিষয়টি আরও জটিল। কারণ এখানে কেবল মানুষের পছন্দ কাজ করছে না; কাজ করছে অ্যালগরিদমের নকশা।
অ্যালগরিদমের প্রধান উদ্দেশ্য আমাদের শিক্ষিত করা নয়; বরং আমাদের যত বেশি সময় সম্ভব প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখা। কারণ আমাদের মনোযোগই তাদের ব্যবসার মূল সম্পদ। আমরা যত বেশি সময় স্ক্রিনে থাকব, তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখব, তত বেশি ডেটা তৈরি করব, তত বেশি আয় হবে।
অর্থাৎ, যে কনটেন্ট আমাদের মনোযোগ সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারে, সেটিই অগ্রাধিকার পায়।
এখানে একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। মানুষ হিসেবে আমরা বিস্ময়, নাটকীয়তা, ক্ষোভ, হাস্যরস এবং কৌতূহলের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হই। অ্যালগরিদম সেই মানবিক প্রবণতাগুলোকেই ব্যবহার করে। ফলে “চমক” প্রায়ই “চিন্তা”-কে পরাজিত করে।
১৯৮৫ সালে, স্মার্টফোনের বহু আগে, মিডিয়া বিশ্লেষক Neil Postman তাঁর বিখ্যাত বই Amusing Ourselves to Death-এ লিখেছিলেন—
“মানুষ আর একে অপরের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করে না; তারা একে অপরকে বিনোদন দেয়। তারা ধারণা বিনিময় করে না; তারা চিত্র বিনিময় করে।”
তখন তিনি টেলিভিশনের কথা বলছিলেন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় তাঁর কথাগুলো যেন ভবিষ্যদ্বাণীর মতো শোনায়।
আরও গভীর এক পর্যবেক্ষণে তিনি লিখেছিলেন, জর্জ অরওয়েল আশঙ্কা করেছিলেন যে একদিন বই নিষিদ্ধ করা হবে; কিন্তু অ্যালডাস হাক্সলি আশঙ্কা করেছিলেন, মানুষ এত বেশি বিনোদন ও বিভ্রান্তিতে ডুবে থাকবে যে বই নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনই হবে না—কারণ মানুষ নিজেই পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
সম্ভবত আমরা সেই বাস্তবতার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছি।
তবে কি সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের মূর্খ বানিয়ে দিচ্ছে?
সম্ভবত প্রশ্নটি এভাবে করা উচিত নয়। বরং বলা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম আমাদের চিন্তার দুর্বল দিকগুলোকে শক্তিশালী করছে। এটি আমাদের তাৎক্ষণিক তৃপ্তির প্রতি আকৃষ্ট করছে, দীর্ঘ মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং গভীর চিন্তার পরিবর্তে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলছে।
কিন্তু দায় কেবল প্রযুক্তির নয়।
আমরাও এই ব্যবস্থার অংশীদার। আমরা যা দেখি, লাইক দিই, শেয়ার করি এবং প্রতিক্রিয়া জানাই, অ্যালগরিদম সেটিকেই আরও ছড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, আমরা যেমন অ্যালগরিদমকে প্রশিক্ষণ দিই, অ্যালগরিদমও তেমনি আমাদের অভ্যাসকে প্রশিক্ষণ দেয়। এটি এক ধরনের প্রতিক্রিয়া-চক্র।
তাই হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর একটি হবে “মনোযোগের সাক্ষরতা”—কী দেখব, কতক্ষণ দেখব, কেন দেখব এবং কোন বিষয়কে আমাদের মানসিক শক্তি ব্যয় করার যোগ্য মনে করব, সেই সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা।
ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদেরা হয়তো লিখবেন, একবিংশ শতাব্দীর মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট তথ্যের অভাব ছিল না। তাদের হাতে ছিল সীমাহীন তথ্য। কিন্তু তারা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছিল মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা, গভীরভাবে চিন্তা করার ধৈর্য এবং অর্থপূর্ণ বিষয়কে তুচ্ছ বিষয় থেকে আলাদা করার প্রজ্ঞা।
প্রযুক্তি আমাদের মুক্তও করতে পারে, আবার বন্দিও করতে পারে। পার্থক্যটি নির্ভর করবে একটি প্রশ্নের উত্তরের ওপর—
আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তি আমাদের ব্যবহার করছে?

Leave a comment