আমরা যখন কোনো নতুন প্রোডাক্ট তৈরি করার কথা ভাবি, তখন সাধারণত আমাদের চিন্তার শুরুটা হয়—“কাস্টমার কী চাইতে পারে?”। এই চিন্তাটা খারাপ নয়, বরং প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা এই চাহিদাটাকে গভীরভাবে যাচাই না করে, অনেকটা অনুমান বা কল্পনার ভিত্তিতে প্রোডাক্ট বানাতে শুরু করি। ফলে আমরা যে জিনিসটা তৈরি করি—তা হয়তো দেখতে সুন্দর, ফিচারসমৃদ্ধ, কিন্তু ব্যবহারকারীর জীবনে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না।
এই জায়গাটাতেই সবচেয়ে বড় ভুলটা হয়—আমরা “আউটপুট” এবং “আউটকাম” এই দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকে গুলিয়ে ফেলি।
প্রথমে আসা যাক আউটপুট কী। খুব সহজভাবে বললে, আমরা যে জিনিসটা তৈরি করি—সেটাই আউটপুট। সেটা হতে পারে একটি সফটওয়্যার, একটি মোবাইল অ্যাপ, একটি প্রবন্ধ, কিংবা একটি ভিডিও। অর্থাৎ, আমাদের তৈরি করা দৃশ্যমান প্রোডাক্টটাই আউটপুট।
অন্যদিকে, আউটকাম হলো সেই প্রোডাক্টটি ব্যবহার করার পর একজন ব্যবহারকারীর জীবনে যে পরিবর্তন আসে। তার কোনো সমস্যা সমাধান হলো কিনা, তার কাজ সহজ হলো কিনা, তার আচরণ বা সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন এলো কিনা—এই সবকিছুই আউটকামের অন্তর্ভুক্ত।
এখানেই মূল পার্থক্য। আউটপুট হচ্ছে “আমরা কী তৈরি করলাম”, আর আউটকাম হচ্ছে “ব্যবহারকারী কী পেল”।
বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ টিম আউটপুটে বেশি ফোকাস করে। তারা ভাবে—আরও বেশি ফিচার যোগ করা যায় কিনা, ওয়েবসাইটে আরও কত ধরনের অ্যানিমেশন রাখা যায়, কতগুলো ক্যাটেগরি বা কনটেন্ট বাড়ানো যায়। এই ফোকাসটা মূলত সংখ্যায়, ডিজাইনে এবং বৈচিত্র্যে। কারণ, প্রোডাক্ট তৈরির প্রতি আমাদের একটা আবেগ কাজ করে। আমরা আমাদের তৈরি জিনিসটাকে ভালোবাসি।
কিন্তু ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভালোবাসা অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা (CB Insights, 2021) বলছে, প্রায় ৩৫% স্টার্টআপ ব্যর্থ হয় কারণ তারা এমন প্রোডাক্ট তৈরি করে যার জন্য বাজারে প্রকৃত কোনো চাহিদা নেই। অর্থাৎ, তারা আউটপুট তৈরি করেছে, কিন্তু আউটকাম তৈরি করতে পারেনি। একইভাবে, McKinsey-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ৭০% ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না, প্রধান কারণ—ব্যবহারকারীর আচরণগত পরিবর্তন (outcome) ঠিকভাবে বোঝা হয় না।
তাহলে সমাধান কী?
সমাধান শুরু হয় একটি খুব মৌলিক প্রশ্ন দিয়ে: “আমার টার্গেট কাস্টমার কে?”
সব কাস্টমার এক নয়। তাই তাদেরকে সাধারণত তিনটি ভাগে ভাগ করা উচিত:
- কোর (Core) কাস্টমার: যাদের জন্য আপনি ৮০% এফোর্ট দেবেন। এরা আপনার প্রধান ব্যবহারকারী।
- সেকেন্ডারি (Secondary) কাস্টমার: যাদের জন্য ২০% এফোর্ট যথেষ্ট।
- পপুলেশন (Population) কাস্টমার: যাদের জন্য আলাদা করে কোনো এফোর্ট দেওয়া হবে না, কিন্তু তারা ব্যবহার করলে উপকৃত হতে পারে।
এই বিভাজনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আপনাকে আপনার ফোকাস ঠিক করতে সাহায্য করে।
এরপর আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—আউটকাম নির্ধারণ।
আপনার কোর কাস্টমার আসলে কী চায়? তারা আপনার প্রোডাক্ট ব্যবহার করে কী পরিবর্তন আশা করছে? তাদের কোন সমস্যার সমাধান দরকার? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আপনাকে তাদের সাথে কথা বলতে হবে। তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ এবং প্রয়োজনগুলো বুঝতে হবে।
এই তথ্যগুলোকে যদি আপনি স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করতে পারেন—তাহলেই আপনার প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের দিকনির্দেশনা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
অর্থাৎ, আগে আউটকাম, তারপর আউটপুট।
যখন আপনি জানবেন যে ব্যবহারকারীর জীবনে কী পরিবর্তন আনতে চান, তখন আপনি খুব সহজেই নির্ধারণ করতে পারবেন—কোন ফিচারগুলো দরকার, কোনগুলো অপ্রয়োজনীয়। এতে করে আপনি অপ্রয়োজনীয় কাজ কমিয়ে আনতে পারবেন।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষতা বা efficiency।
একজন ভালো প্রোডাক্ট নির্মাতার লক্ষ্য হওয়া উচিত—সবচেয়ে কম এফোর্ট দিয়ে সবচেয়ে বেশি আউটকাম তৈরি করা। অর্থাৎ, কম রিসোর্স, কম খরচ এবং কম সময় ব্যবহার করে যদি আপনি বড় ধরনের ব্যবহারকারীর পরিবর্তন আনতে পারেন—তাহলেই সেটি একটি সফল প্রোডাক্ট।
Lean Startup মডেলও একই কথা বলে—“Build less, learn faster।” অর্থাৎ, বড় কিছু বানানোর আগে ছোট করে তৈরি করুন, পরীক্ষা করুন, শিখুন, তারপর উন্নত করুন।
শেষ কথা হলো, প্রোডাক্ট তৈরি করা সহজ—কিন্তু প্রভাব (impact) তৈরি করা কঠিন।
আমরা যদি শুধু প্রোডাক্টের প্রেমে পড়ে থাকি, তাহলে হয়তো আমরা অনেক কিছু তৈরি করব, কিন্তু তার কোনো বাস্তব মূল্য থাকবে না। কিন্তু যদি আমরা ব্যবহারকারীর জীবনে পরিবর্তন আনার দিকে ফোকাস করি—তাহলে ছোট প্রোডাক্ট দিয়েও বড় প্রভাব তৈরি করা সম্ভব।
তাই পরেরবার যখন আপনি কোনো নতুন প্রোডাক্ট তৈরি করার কথা ভাববেন, নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন:
“আমি কী তৈরি করবো?”—এই প্রশ্নের আগে, “আমার ব্যবহারকারীর জীবনে কী পরিবর্তন আনতে চাই?”
কারণ, শেষ পর্যন্ত ব্যবসায় জয়ী হয় তারা—যারা আউটপুট নয়, আউটকামকে প্রাধান্য দেয়।
আপনি কি নতুন কোনো প্রোডাক্ট তৈরির কথা ভাবছেন? সেটি কোন পণ্য, মোবাইল অ্যাপ, সফটওয়্যার, ওয়েব সলিউশন—যাই হোক না কেন, আপনি কি আপনার কাস্টমারদের জন্য কিছু তৈরি করতে চান কিন্তু বুঝতে পারছেন না কীভাবে শুরু করবেন?
তাহলে ড. মশিউর রহমানের সাথে যোগাযোগ করে কনসাল্ট করে নিন। যোগযোগ করতে নিচের ফর্মটি পূরণ করুন।
এছাড়াও, ড . মশিউর এর এই কনসেপ্টের উপর ভিত্তি করে একটি কার্যকর টেমপ্লেট রয়েছে, যা ব্যবহার করে আপনি খুব সহজেই আপনার প্রোডাক্টকে বাস্তবমুখী রূপ দিতে পারবেন। টেমপ্লেটটি পেতে নিচের ফর্মটি পূরণ করুন—এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হবে।

Leave a comment