উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগতথ্যপ্রযুক্তি

প্রযুক্তিখাতে বিদেশী বিনিয়োগ, শিক্ষিত প্রজন্মের কর্মসংস্হান এবং কিছু প্রতিবন্ধকতা

Share
Share

কোভিড পরবর্তী রূপান্তরিত বিশ্বে বিদেশী বিনিয়োগের অনেক সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে গার্মেন্টসের শ্রমিক, নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী শ্রমিক, আর কৃষকরা ছাড়াও জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে বলীয়ান তরুণ প্রজন্মকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে, মেধাবীদের ব্যাপকহারে দেশত্যাগের প্রবণতা কমাতে হলে, উচ্চ-প্রযুক্তিতে সক্রিয় বিদেশী কোম্পানিগুলোর দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। কর্মসংস্হান, শিক্ষার উন্নতি, প্রযুক্তির উন্নয়ন, অর্থনীতি ও সামাজিক প্রবৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা রক্ষা, আর সর্বোপরি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধ দেশ – সবকিছুতেই উচ্চ প্রযুক্তির বিনিয়োগ গভীর ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

কল্পনা করা যাক বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান আইবিএম বাংলাদেশে একটি বড়োসড়ো উৎপাদনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। আমাদের  প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, ব্যবস্থাপক, মার্কেটিং আর জনসংযোগে প্রশিক্ষিত তরুনদের  জন্য হাজার হাজার উচ্চ-বেতনের চাকরির সুযোগ তৈরি করেছে। এর সাথে আমাদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ এবং শিক্ষকদের জন্য গবেষণা এবং সহযোগিতার সুযোগ উন্মুক্ত করেছে । এছাড়া বাংলাদেশে এ জাতীয় উচ্চ প্রযুক্তির উদ্যোগের নেওয়ার জন্য পরোক্ষভাবে আমাদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, একই ধরণের উচ্চ-প্রযুক্তির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে শাখা স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করছে। অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে এদেশে বড়ো বড়ো পরিকল্পনা নিয়ে আসার প্রেরণা দিচ্ছে। আইবিএম মতো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে থাকার কারণে আমাদের উচ্চশিক্ষিত কর্মীরা চাকরির বিষয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছে না আর । আমাদের যুবসমাজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে – ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে, বৈরী ইউরোপীয় সীমান্তে অবৈধভাবে অভিবাসনের ঝুঁকি নিচ্ছে না বা দেশে বিদেশে তাদের শ্রম কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে না।

কর্মসংস্থান ছাড়াও নতুন প্রযুক্তির হস্তান্তর, আধুনিক ব্যবস্থাপনার কৌশল আর অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর মতো অত্যাবশ্যক অনেক কিছুতে এধরণের আন্তর্জাতিক কোম্পানির উপস্থিতি আমাদের দেশকে গভীরভাবে উপকৃত করছে। আইবিএম মত কয়েকটি সংস্থার উপস্থিতি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আর আমাদের গবেষণার সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। দেশ-বিদেশের অগণিত ছাত্র-ছাত্রীদের পিএইচডি ডিগ্রী দেয়া হচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় এখন বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।

এই কল্পনার সাথে বাস্তবের পার্থক্য বিশাল আমাদের দেশে। কিন্তু সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম এবং আরো অনেক দেশে আজ এটাই বাস্তবতা। কেন আমরা তাদের মতো হতে পারিনি ? কেন আমাদের সবচেয়ে মেধাবীরা সবসময় দেশ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ খোঁজে? আমার এক বিদেশী বন্ধুর বাংলাদেশকে নিয়ে একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কিছু কারণ বোঝার চেষ্টা করবো এখানে।

ভদ্রলোক আইবিএম-এর একজন বড়ো বিজ্ঞানী। কলকাতায় বড়ো হয়েছেন এবং আমেরিকায় পিএইচডি করেছেন ন্যানোটেকনোলোজিতে। বেশ ভালো বাংলা বলতে জানেন।  চীনের সৌর কোষ বা সোলার সেল বিশ্বের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করার ঠিক পূর্বের সময় এটি । আইবিএম তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৌর কোষ তৈরির পরিকল্পনা করেছিল আর উৎপাদনকেন্দ্রটির জন্য একটি উপযুক্ত দেশ খুঁজছিল। বাংলাদেশ তাদের কাছে আদর্শ বলে মনে হয়েছিল এখানে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রশিক্ষিত কর্মী পাওয়ার সম্ভাবনা দেখে। বাংলাদেশকে তারা সোলার সেলের জন্য একটি শক্তিশালী বাজার হিসেবেও শনাক্ত করেছিল।

অভ্যন্তরীণ আলোচনা শেষে, আইবিএম তাকে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার জন্য পাঠিয়েছিল এবং স্থানীয় সরকারী কর্মকর্তারা তাকে বেশ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশী খাবার আর আতিথেয়তার গভীর প্রশংসা করেছে আমার বন্ধু। অনেকগুলো আলোচনা হয়েছে কর্মকর্তাদের প্রাসাদসম সুন্দর বাড়িতে। কলকাতার ছেলে হিসেবে তার জন্য বারবার ভালো মানের ইলিশ মাছের ব্যবস্থা করেছেন বাংলাদেশী কর্মকর্তারা।

আমরা দুজন তখন আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগের আমন্ত্রণে একটি কর্মশালায় অংশগ্রহণ করছিলাম। একই হোটেলে একসাথে দুদিন ছিলাম যখন আমার বন্ধু  তার বাংলাদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলো। ঢাকায় তার এই প্রথম সফর – সবগুলো অভিজ্ঞতাই তার মনে দাগ কেটেছে গভীরভাবে।

কিন্তু যেই উদ্দেশ্যে তার বাংলাদেশে আসা, সেটা শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। কারণ বাংলাদেশী কর্মকর্তা সোলার সেলের উৎপাদনকেন্দ্রটির একটা অংশের মালিকানা দাবী করে বসলেন। তার মালিকানাধীন একটি  প্রতিষ্ঠানকে আইবিএম-এর  অংশীদার বানাতে হবে। বাংলাদেশী কর্মকর্তার অনৈতিক প্রস্তাব দেশের স্বার্থে নয়, দেশবাসীর স্বার্থে নয় – শুধুই নিজেরই স্বার্থে।

অন্য আরো অনেক কোম্পানির মতোই আইবিএম-এর অভ্যন্তরীণ নীতিমালা এধরণের উৎকোচ দেওয়ার সুযোক রাখেনি।। আইবিএম আর দ্বিতীয়বার আলোচনার চেষ্টা করেনি বাংলাদেশের সাথে।

কোভিড পরবর্তী রূপান্তরিত বিশ্বে বিদেশী বিনিয়োগের এধরণের অনেক সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির এখনই সময়। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে গার্মেন্টসের শ্রমিক, নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী শ্রমিক, আর কৃষকরা ছাড়াও জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে বলীয়ান তরুণ প্রজন্মকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে উচ্চ-প্রযুক্তিতে সক্রিয় কোম্পানিগুলোর দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। কর্মসংস্হান, শিক্ষার উন্নতি, প্রযুক্তির উন্নয়ন, অর্থনীতি ও সামাজিক প্রবৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা রক্ষা, আর সর্বোপরি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধ দেশ – সবকিছুতেই উচ্চ প্রযুক্তির বিনিয়োগ গভীর ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

এখন আসুন দেখা যাক আমরা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেমন সফলতা অর্জন করেছি। ২০১৭ সালে ভিয়েতনাম (১৪.১ বিলিয়ন), মায়ানমার (৪.৩ বিলিয়ন), কম্বোডিয়া (২.৮ বিলিয়ন), ইন্দোনেশিয়াসহ (২৩.১ বিলিয়ন) অনেক দেশে বাংলাদেশের (২.২ বিলিয়ন) চেয়ে বেশী বিনিয়োগ এসেছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের বিনিয়োগ বেড়ে ৩.৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে – প্রায় ৬৮% বৃদ্ধি। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ৫৬% বিদেশী বিনিয়োগ হারায়, যেখানে ভারতে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ২০%, কম্বোডিয়ায় বেড়েছে ১৫%, ভিয়েতনামে বেড়েছে ১০% এবং ইন্দোনেশিয়াতে বেড়েছে ২৯%.
https://www.visualcapitalist.com/; https://unctad.org/

একসময় আমি হিউলেট-প্যাকার্ড (এইচ-পি) ল্যাবরেটরিতে কাজ করতাম। আমি সেখানে ব্রাজিল আর মেক্সিকোর রাষ্ট্রপতি, এবং তুর্কী বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি মন্ত্রীকে আলোচনার জন্য বারবার আসতে দেখেছি। তাদের উদ্দেশ্য একটাই ছিল – নিজেদের দেশে এইচ-পি’র কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা, উৎপাদনকেন্দ্র এবং গবেষণাগার প্রতিষ্টা করা। সিলিকন ভ্যালিতে বিশ্ব নেতারা প্রায়ই আসেন পৃথিবীর বড়ো কোম্পানীগুলোকে বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করতে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা পৃথিবীর ২.১%। আমাদের জনশক্তি অত্যন্ত পরিশ্রমী, বিশ্বজুড়ে আমাদের কর্মীদের যথেষ্ট সুখ্যাতি রয়েছে। প্রায় চার হাজার (৪০০০) বিলিয়ন ডলারের পৃথিবীজোড়া বিদেশী বিনিয়োগের আমাদের অংশটা বর্তমানের তুলনায় আরো বিশ, বা পঁচিশ গুন্ বেশী হতে পারে – ৫০ বিলিয়ন এমনকি ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর জন্য আমাদের দরকার একটি সক্ষম এবং শক্তিশালী জনসংযোগ দল যারা বর্তমানে চীন থেকে বের হয়ে আসা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদশে নিয়ে আসতে পারবে।

বিদেশী বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশিক্ষিত কর্মী, মজুরি এবং করের হার, স্থানীয় বাজারের আকার, পরিবহন অবকাঠামো, মুক্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রবেশের সুবিধার মতো বিষয়গুলি বিবেচনা করে। উৎকোচ বা কোম্পানীর একটা অংশ দাবী করাটা নিতান্তই আত্মঘাতী এবং নিকর্শী আচরণ। আমার বন্ধুর মতে আইবিএম কখনো এরকম প্রস্তাব অন্য কোনো দেশ থেকে পায়নি। এধরণের তিক্ত অভিজ্ঞতা একারণে আরো ক্ষতিকর যে বিদেশী সংস্থাগুলো একটি দেশ সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা অন্য সংস্থাগুলোর সাথে সবসমই ভাগাভাগি করে।

মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তার অপরিণামদর্শী আচরণ দেশব্যাপী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অভিশাপ বয়ে আনে, তাদের উদ্দেশ্যহীনতা আর হতাশাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। অমর্যাদাপূর্ণ আচরণ স্বদেশবাসীদেরও দেশ থেকে দূরে ঠেলে দেয়, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে এধরণের আচরণ আরো বেশি অবাঞ্ছিত, আরো বেশি ক্ষতিকর।

এখানে দুটো ছবির মধ্যে আমাদের সম্ভাব্য কর্মসংস্হানের সম্ভাবনাগুলো প্রতীকায়িত করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি পথ আমাদের তরুণদের উদ্দীপক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাবে। এমনি বহু ছবির জন্ম দেবার প্রেরণা দিবে। অন্য ছবিটি এখন দেশে দৃশ্যমান আর সেটা পারছেনা মেধাবীদের মনকে ছুঁতে। পারছেনা তাদের দেশে ধরে রাখতে।

সাইফ ইসলাম,
অধ্যাপক, ক্যালিফর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়-ডেভিস

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org