অন্যান্য

স্বাধীনতা: বিজ্ঞানের বিকাশ আর শিল্পায়নের চাবিকাঠি

Share
Share

প্রায় ২৩০ বছর পূর্বে, ১৭৯২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রার প্রথম নীতিবাক্য ছিল “স্বাধীনতা : বিজ্ঞানের বিকাশ আর শিল্পায়নের চাবিকাঠি”। এটা নিয়ে একটা একটি ছোট অভিজ্ঞতা সবার সাথে শেয়ার করছি। সঙ্গত কারণে আমি স্থান, কাল, পাত্র সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য দিচ্ছি না।

প্রথম পর্ব:

সাম্প্রতিক অতীতে নর্দান ক্যালিফর্নিয়া ন্যানোটেকনোলজি সেন্টার আর CITRIS এর সাথে আমার সম্পর্ক হওয়ার সুবাদে বেশ কয়েকবার দক্ষিন আমেরিকা, পূর্ব ইউরোপ এবং এশিয়ার অনেকগুলো দেশের জাতীয় নীতি নির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। বিশ্বায়নের এ যুগে পৃথিবীর দ্রুত উন্নয়নশীল অনেক দেশই বহির্বিশ্বের বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোকে যাচাই করতে চায়। কখনো বিদেশী আর দেশীয় বিশেষজ্ঞরা একসাথে কাজ করে, আবার কখনো অতিথি বিশেষজ্ঞরা স্বাধীনভাবে কাজ করে আর তথ্য আদান প্রদানের জন্য স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সাথে মত বিনিময় করে। এটা সহজে অনুমেয় যে, সুশিক্ষিত, জ্ঞানে বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ আর মার্জিত রাজনৈতিক এবং সামাজিক সাংস্কৃতি সম্পন্ন স্থিতিশীল জাতিগুলো বিদেশি পরামর্শকদের সাথে এধরণের আদান প্রদান খুবই কম করে। কারন তাদের নিজ দেশে উচ্চশিক্ষিত জনবল ও বিশেষজ্ঞের অভাব নেই।

আমি গত এক দশকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গবেষণা নীতি, উচ্চ-প্রযুক্তিতে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা, সমাজের ক্রমবর্ধমান এবং উদীয়মান সামাজিক সমস্যা সমাধানের প্রস্তুতির উপর বেশ কয়েকটি দেশের উচ্চ পর্যায়ের কমিটিতে কাজ করেছি ।

একবার গুগল ট্রান্সলেট এর সহায়তা নিয়ে একটি দেশে যাওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি নিচ্ছিলাম দেশটি সম্পর্কে আন্তরজাতিক মিডিয়া এবং স্থানীয় প্রত্র পত্রিকা পড়ে। বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যম দেশটিকে দেখাচ্ছিল এক বন্ধুহীন, হবুচন্দ্রের রাজ্যের মতো করে – যেখানে বাস্তব অর্থে দেশপ্রধানের খেয়ালিপনা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আর আদেশই হলো কার্যত দেশের আইন। বিরোধী মতের যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষগুলো হয় কারাগারে অথবা বিদেশে দীর্ঘ নির্বাসনে আছে। বেঁচে থাকতে হলে নিজ ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিতে হবে, দেশনেতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, এবং যেকোনো ধরণের মতানৈক্য থেকে দূরে থাকতে হবে। যেমন ক্রুশ্চেভ বলেছিলো – “When Stalin says dance, a wise man dances”।

তবে স্থানীয় মিডিয়া দেখে মনে হবে সবই চলছে বেশ ভালোভাবে, তাদের মহান নেতার সুযোগ্য নেতৃত্বে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এটাও বলছেন যে কঠোর পরিশ্রমী জনশক্তি, উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তরুণ ও উদ্যমী শিক্ষিত সমাজ নিয়ে দেশটির সফলতার শিখরে যাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে যদি নীতিগত খামখেয়ালিপনা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারে। তাদের শাসক গোষ্ঠী যদি যোগ্য হতো আর একনায়কী মনোভাবের না হতো, দেশি-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তাদের দরজায় ভিড় জমাতো। আর এক দশকের মধ্যে জাতি হিসেবে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যেতে পারতো।

কিছুটা গবেষণার পর আমার চোখে Reporters Without Boarders এর র‍্যাঙ্কিংটা চোখে পড়লো। সেদেশের অবস্থান বেশ নীচের দিকে – অনেকটা তলানিতে। বোঝাই যাচ্ছে নাগরিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, আর সর্বোপরি মানবাধিকার চরমভাবে বিপর্যস্ত। উচ্চ পর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তারা অনেক অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের সাথে জড়িত। অপরাধগুলোর একটাই উদ্দেশ্য – বর্তমান নেতৃত্বকে আজীবন ক্ষমতায় রাখা। নিউ ইয়র্ক টাইমস এর মতে এক ভয়ের চাদরের নীচে ঢেকে আছে সেদেশ – একটি অতুলনীয় সামাজিক আর অর্থনৈতিক বিপর্যয় যেকোনো সময়ে হতে পারে। আর এতে এদেশটি ইউরোপ আর আমেরিকায় বিশাল উদ্বাস্তু সমস্যার কারণ হতে পারে।

আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই কঠিন একনায়কের দেশে সরকারপ্রদত্ত তথ্য উপাত্তগুলো অপ্রত্যাশিত রকমের সত্য এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের সাথে পুরোপুরি মেলে যায়। কিন্তু স্থানীয় মিডিয়া কখনোই এই তথ্য উপাত্তগুলো প্রকাশ করেনা, মানুষকে অবহিত করার চেষ্টাও করেনা। সম্ভবত সেরকম কিছু করার জন্য যে সাহসের প্রয়োজন, সমাজের যেই ব্যাপক সহযোগিতার প্রয়োজন, তা স্থানীয় মিডিয়ার নেই। উপাত্তগুলোতে প্রতি বছর দেশ ছেড়ে যাওয়া উচ্চ শিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম আর আশ্চর্য হয়েছি এই ব্যাপারে সেই দেশের নেতাদের উদাসীনতায়। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির কারণে এক দশকে তাদের নিজস্ব মুদ্রার চার গুণ অবমূল্যায়ন হয়েছে। অথচ তারা দেখছেন না যে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাহীন বিপুল সংখ্যক বিদেশে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর বৈধ আর অবৈধ পথে বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে।

ইতিপূর্বের আরো কয়েকটি এধরণের কার্যক্রমের মতো এটাও বৃথা সময় ক্ষেপন মনে করে আমি আর আমাদের দলের এক জার্মান অধ্যাপক সেদেশে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম। অধিকাংশ সময় যা হয় তার একটা সাধারণ চিত্র হলো – আমরা কঠোর পরিশ্রম করব, তাদের অনাবিষ্কৃত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করব, সতর্কতার সাথে প্রতিবেদন লিখব, এবং আমাদের সুপারিশগুলো ব্যাক্ত করবো। বিনিময়ে তারা আমাদের ধন্যবাদ জানাবে, আমাদের পরিষেবার জন্য পারিশ্রমিক অফার করবে এবং পরামর্শগুলিকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার অভিনয় করবে, কিন্তু তারা রিপোর্টগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোকে মূলত উপেক্ষা করবে৷ এই শতকের স্বৈরশাসকদের কাছে তাদের দেশ এবং তাদের নাগরিকরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায় না, সারা জীবন নিরঙ্কুশভাবে ক্ষমতায় থাকাটাই তাদের সমস্ত কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য।

আমাদের এই ইন্টারডিসিপ্লিনারি দলের সমন্বয়কারী এবং নেতা ছিলেন বোস্টন ভিত্তিক বিশ্বের এক শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিভিশন অফ সোশ্যাল সায়েন্সের এক কলিগ। তিনি দুবার ভিডিও কনফারেন্স করে উৎসাহ দিয়ে বললেন, এদেশটি পৃথিবীর মঞ্চে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতি হিসাবে, সারা বিশ্বে না হলেও তাদের অঞ্চলে খুব শক্তিশালী ভূমিকা রাখার উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছ। দেশের নাগরিকরা যা বলতে পারবেনা আমরা তা সহজে বলবো। আমরা স্মরণ করিয়ে দেব যে সম্রাটের গায়ে কোন কাপড় নেই (the Emperor has no cloths)। বুঝিয়ে দেব যে তাদের অন্তর্দৃষ্টি এবং দেশ নিয়ে পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় গভীরতা নেই। তাদের বলবো যে আজ জন্ম নেওয়া শিশুটি যদি তার ভোটাধিকার পাওয়ার বয়সে পৌঁছে দেশে একই মানুষগুলোকে নেতৃত্বে দেখতে হয়, তা হবে চরম দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের সাথে ভাব বিনিময় হলে তারা বুঝতে পারবে যে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি না করাটা এক বিশাল ব্যর্থতা, এক অমার্জনীয় অপরাধ। এটা নাগরিকদের প্রতি অত্যন্ত অসম্মানজনক আচরণ, তাদের সবাইকে সম্পূর্ণরূপে নির্বোধ বিবেচনা করার শামিল। আমরা জোর দিয়ে বলবো যে সকল কর্তৃত্বপ্রিয় শাসক শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা থেকে অথবা পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় গভীর লাঞ্ছনা আর অপমানের পথ ধরে, তাদের সন্তানদের, পরিবারের সদস্যদের চিরকালীন অপমান আর বঞ্চনায় নিক্ষেপ করে। আশা করি আমাদের কথা শুনে হয়তো তারা কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আর পরিবর্তন নিয়ে আসবে দেশে। এমনকি বৃদ্ধ পোপও সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন, অন্য একজনকে জায়গা তৈরি করে দিয়েছেন তার মৃত্যুর আগেই। ৬০০ বছরে প্রথমবার বারের মতো এরকম সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। এমনি ভাবেই শিক্ষিত, প্রাণবন্ত আর নতুন চিন্তায় বলীয়ান তরুণদের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া প্রয়োজন। তরুণরা তখন বয়োজ্যেষ্ঠদের বুদ্ধি এবং অন্তর্দৃষ্টি কাজে লাগিয়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারবে।

এতগুলো আশাবাদী কথা বলার পরেও আমার ইতস্তত মনোভাব শুনে একটু রসিকতা করে বললেন সেদেশের কুইসিন (cuisine) শুনেছি খুব নামকরা এবং খুব সম্ববত তাদের খাবারের রেসিপিতে এখনো কোনো দুর্নীতির আগুন লাগেনি।

কিছুটা সময় নিয়ে আরো কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সহকর্মীর সাথে পরামর্শ শেষে আমরা সবাই আমাদের অঙ্গীকার রাখতে রাজি হলাম এবং এক হেমন্তের রবিবারে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সবাই গিয়ে উপস্থিত হলাম সেদেশে।

ক্রমাগত তিনদিন পৃথিবীর নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত আমাদের দলটি অবিরাম কাজ করেছে। কয়েকটি অত্যাধুনিক ল্যাব, সাগর পাড়ে পরিকল্পিত নতুন গবেষণাধর্মী গ্রাজুয়েট স্কুল ক্যাম্পাস, আর নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের নানা প্রজেক্টের মূল্যায়ন করেছি আমরা। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্প বিষয়ক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দুর্নীতির অনেকগুলো দরজা শনাক্ত করেছি পুরো একদিন ক্রমাগত কাজ করে। সরকারের উপদেষ্টাদের অনেকেই জেনেশুনে সেই দুর্নীতির দরজা খোলা রাখতে চেয়েছে। সামুদ্রিক মাছের খামারগুলোকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার চলমান গবেষণার পরিকল্পনাটা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছি – ২০০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের সাথে আমার করা গবেষণা কর্মের কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে। এই প্রকল্পে আমার বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো দুটি আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় জড়িত আছে।

আমাদের দল আকস্মিকভাবে বেড়ে যাওয়া সিঙ্গেল প্যারেন্ট মায়েদের জন্য শহরায়ণের নতুন প্রকল্পের উপরও মতামত দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান এধরণের পরিবারগুলোতে মায়েদের কর্মক্ষেত্র, বাসস্থান এবং সন্তানদের স্কুল বিষয়ক ব্যাবস্থাপনাগুলো সহজতর করাটাই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল। আমরা বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর নতুন খাত উদ্ভাবন, এবং আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও প্যানেল ডিসকাশনে অংশগ্রহণ করেছি, আর সুপারিশ পেশ করেছি।

প্রতিদিন ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আমরা বেশ কিছু গবেষকের সাথে ভাব বিনিময় করেছি এবং দেখে অবাক হয়েছি যে গবেষণায় বেশ কিছু ভালো কাজ যারা করছে তারা সাবলীল ভাবে কথা বলছেন না, চোখ-কান-মুখ বন্ধ রেখে যেন কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক বিষয়ে প্রশ্ন করে আমরা সোজা উত্তর খুব কমই পেয়েছি।

তৃতীয় দিন একজন প্রবীণ বিজ্ঞানী আমাদের তার অফিসের ভেতরে নিয়ে দেশের বর্তমান অবস্থাকে এভাবে ব্যাখ্যা করলেন – দেশবাসীকে, আমার সহোযোগীদেরকে, আর আমার সন্তানদেরকে আমি বলি গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে কোথাও কোন কথা বলবেন না। কারণ সত্যি কথা বলার আগে আপনি স্থায়ীভাবে দেশ ছেড়ে অথবা এই পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আগে করে রাখতে হবে। আমি এর চেয়ে বেশি আর কিছু বলতে চাইনা।

আমরা সবাই বিমূঢ়ের মতো নিঃশব্দে বসে রইলাম কয়েক মিনিট। নেচার জেনেটিক্স জার্নালের তার সামুদ্রিক খামারের স্যামন মাছের রোগ নিয়ে লেখা সাম্প্রতিক পেপারটা নিয়ে যদিও আমার কিছু প্রশ্ন ছিল তবুও আমরা তাকে আর বিব্রত করবোনা ঠিক করলাম।

প্রবীণ বিজ্ঞানীর অফিস থেকে বেরিয়ে আমাদের গাইড আর ড্রাইভারকে বিদায় দিয়ে আমরা সেদিন সবাই হোটেলে হেটে যাবো ঠিক করলাম শহরের রাস্তা দিয়ে। আমাদের দলনেতা পুরো দলের সেলফি টুইটার-এ পোস্ট করলেন এই লিখে – ‘আমরা এদেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ মানুষের সঙ্গ উপভোগ করছি আর খাবারগুলো উপভোগ করছি পুরোদমে’। আর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন – সত্যিই, কুইসিন ছাড়া এদেশের কোনো কিছুই দুর্নীতির বাইরে নেই। আমাদের জাপানি সহকর্মী হাসতে হাসতে বললেন খাবারে দুর্নীতি ঢুকেছে কিনা যাচাই করার জন্য, আমাদের লক্ষ্যহীনভাবে (randomly ) কোনো একটি অখ্যাত রেস্টুরেন্টে যেতে হবে কারণ তাদের খাবারই সবচেয়ে অকৃত্রিম হয়, সুস্বাধু হয়। বলা বাহুল্য, আমাদের কারোরই পেটের অসুখের ওষুধ সাথে ছিল না, এবং আমরা এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।

বিদেশে সাধারণ মানুষের সাথে রাস্তায়, ক্যাফেতে, আর ট্যাক্সিতে কথা বলে দেশের মানুষের মানসিকতা আর চিন্তা চেতনা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায়। আমরা আটজন তৃতীয়দিন শহরের সবচেয়ে অভিজাত লাইভ ফিশ রেস্টুরেন্টে আর্লি ডিনার শেষে হোটেলে ফিরে আসার পর আমাদের হোস্টকে বিদায় দিয়ে লবিতে বসে ভাবছি কি করে সাধারণ মানুষের সাথে মন খুলে কথা বলা যায়। ট্যাক্সি ড্রাইভাররা প্রায়ই সবচেয়ে সঠিক তথ্যের উৎস হতে পারে। ঠিক হলো আমাদের মাঝে পাঁচজন ট্যাক্সিতে করে আলাদা ভাবে শহরের কেন্দ্রস্থলে ঘুরতে যাবে আর দুজন যাবে সরুগলির ভেতরে ছোট কফির দোকানে। সবার উদ্দেশ্য হলো ট্যুরিস্টবেশে সাধারণ মানুষের সাথে যথাসম্ভব কথা বলা। আমাদের অস্ট্রেলিয়ান কলিগ, দলের একমাত্র মহিলা সদস্য, সেই রাতে তার ফ্লাইট ধরবেন বলে এই এডভেঞ্চার থেকে বাদ পড়ে যান।

কাকতালীয়ভাবে আমার সহ তিন জনের uber ড্রাইভার ভালো ইংরেজি বলেছে। আমাদের একজন এক হাই স্কুল শিক্ষিকার সাথে কফি পান করেছে যার ইংরেজি ভালো মানের ছিল। অন্যজন কফির দোকানে শোরগোল আর হৈচৈ দেখে ভেতরে ঢোকাটা অনিরাপদ মনে করে হোটেলে ফিরে এসেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় সবাই ফিরে আসার পর আমরা হোটেলের কাছে লেকফ্রন্ট পার্কে এক ম্যাগনোলিয়া গাছের নিচে গোল হয়ে বসে অনেকক্ষণ আলোচনা করেছি। বলা বাহুল্য, আমাদের মূল্যায়ন ইতিবাচক ছিল না – বলা যেতে পারে কিছুটা ভয়ঙ্কর রকমের শঙ্কাময় ছিল। দেশের নেতৃস্থানীয় পদগুলোতে অল্পসংখকই সৎ মানুষ আছে, তবে তারা কিছু দেখেও না দেখার, এবং শুনেও না শোনার ভান করে। তারা ভীতসন্ত্রস্ত এবং সর্বক্ষণ নিশ্চুপ থাকাটাই শ্রেয় মনে করে। অনেকটা স্তালিনের যুগের রাশিয়ার মত। আর এর বাহিরে সিংহভাগ সরকারি, আধাসরকারি কর্মকর্তারা আত্মঘাতী নির্বোধ, লোভী আর অসৎ। দেশের সবকিছুই ওরা গিলছে ভয়ানক দৈত্যের মতো।

আমার uber চালক দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে আজ বেকার ট্যাক্সি চালক। কিছুক্ষন ইতস্তত করে যখন নিশ্চিত হলো যে আমি তার জন্য বিপদের কারণ হবো না তখন নিচু স্বরে বললো – আমার বাবাদের প্রজন্ম একজন মাঝারি মেধার নেতাকে ক্ষমতায় এনেছে বিপুলভাবে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে। তিনি প্রথমে দেশের এবং দলের বিজ্ঞ মানুষদের দ্বারা বেষ্টিত ছিলেন। তারপর তিনি নিজের চারপাশে নিয়ে এসেছেন মেধাহীন চাটুকারদের, নিজে হয়ে পড়েছেন একাকী – মূর্খদের দ্বারা ঘিরে থাকা একজন নিঃসঙ্গ, একজন হীনমন্যতায় ভোগা মানুষ। পরের পর্যায়ে তিনি জন্ম দিয়েছেন এক ভীতিকর আর স্বার্থলোলুপ গোষ্ঠী-শাসনের, সর্বগ্রাসী ক্রোনিজমের। তার ফল হলো সমস্ত আশা, স্বপ্ন আর নৈতিকতার বিনাশ। নিচুস্বরে সে দার্শনিকের মতো বলে চললো – প্রথমে এসেছে দুর্নীতি, তারপর মত প্রকাশে বাধা আর শেষে এসেছে নীতি নৈতিকতা আর সংস্কৃতি বিধ্বংসী কার্যক্রম। সমস্ত নাগরিক সমাজ ও সংগঠন অনেক আগেই হয় বন্ধ্যা হয়ে পড়েছে অথবা ধ্বংস হয়ে গেছে এদেশে। আমি মনে মনে বলি – এটাই বেশিরভাগ একনায়কদের দর্শন, প্রায় একই ক্রমে, প্রায় সব একনায়কদের দেশেই।

এক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের হাইওয়ে দিয়ে যাওয়ার সময় আমার চালক বললো, এ প্রজন্মের সবচেয়ে মেধাবী তরুণ-তরুণীরা আর সম্ভ্রান্ত মানুষেরা আজ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার বৈধ বা অবৈধ পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে। আপনি চাইলে এখানকার দুএকজন ছাত্র ছাত্রীর সাথে কথা বলতে পারেন। আমি নিশ্চিত, মেক্সিকো-আমেরিকা সীমান্তে আমাদের দেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে আমেরিকায় আপনি অনেক খবর শুনেন প্রতিনিয়ত। আমার বয়োবৃদ্ধ মা বেঁচে থাকাতে এখনো আমি সে চেষ্টা শুরু করিনি – নিচু গলায় বললো আমার গাড়ি চালক।

আমাদের দলের নেতাও আকর্ষণীয় কিছু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। তিনি একটি অভিজাত বারে একজন পুলিশ অফিসারের সাথে বসেছেন, অনেক কথা বলেছেন। শুরুতে বর্তমান দেশনায়কদের প্রশংসা করলেও কিছুটা মদ্যপানের পরে পুলিশ অফিসারের স্বর সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। তিনি তার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে দেশে একটি মাফিয়া চক্র তৈরি করার জন্য দায়ী করতে শুরু করেন। আবার হটাৎ একটা ফোন এলে তড়িঘড়ি করে বাইরে অপেক্ষমান ড্রাইভারকে ডেকে বিদায় নেন বার থেকে।

প্রতিরাতে আমরা সমষ্টিগত রিপোর্ট লিখেছি দীর্ঘ সময় ধরে। তৃতীয় রাতে আমি হোটেলে এসে শুয়ে শুয়ে ভাবছি – এখানে Emperor has no cloths বলাটা কি কাজ করবে? এটা পরিষ্কার যে এখানকার একমাত্র শাসক দলটি কোনো ধরণের নেতিবাচক কথা শুনতে রাজি নয়। তবে আশার বিষয় হলো দেশকে এক ভয়ানক অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয় থেকে তারা বাঁচাতে চায়, জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান চায়। দুটি প্রতিবেশী দেশের কর্তৃত্ববাদী দেশ-প্রধানরা সম্প্রতি দেশ থেকে পালিয়েছে মানুষের জীবনবাজি করা প্রতিবাদের মুখে। সেটাও তাদের জন্য দৃশ্যত এক গভীর দুশ্চিন্তার কারন।

কোনো কি ইতিবাচক পথ আছে যা দিয়ে তাদের শুভবুধ্ধিকে জাগিয়ে তোলা যাবে, যা তাদের একটু ভাবতে সাহায্য করবে, নিজেদের আর আগামী প্রজন্মকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে উদ্বুদ্ধ করবে ? এশিয়ার অর্ধেকের বেশি দেশ, দক্ষিন আমেরিকা, পূর্ব ইউরোপ আর আফ্রিকার বেশির ভাগ ভূখণ্ডের সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা এটি – জীর্ণ একনায়ক অথবা লোলুপ গোষ্ঠী-শাসনের যাঁতাকল নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার আর তরুণ-তরুণীদের জীবনের সব স্বপ্নকে পিঁষে ধূলিস্যাৎ করে দিচ্ছে। কোথাও কোথাও আকস্মিক ভাবে এরা বিদায় নিতে বাধ্য হলেও অনেক বছর লেগে যায় ক্ষতবিক্ষত সমাজের সব কিছু স্বাভাবিক করতে।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্পমন্ত্রী আর তার সহকর্মীদের সাথে আমরা পরের দিন প্রায় তিন ঘন্টা কাটাবো আর নৈশভোজে যোগ দেব। ঘুমোতে যাওয়ার আগে আমি আমাদের দলনেতা প্রফেসরকে ইমেইল পাঠালাম আমার মতামত জানিয়ে, Emperor has no cloths ধরণের কথা না বলাটা হয়তো কৌশল হিসেবে উত্তম হতে পারে। আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি সাথে সাথে ইমেইল লিখলেন, একই বার্তা তিনি আমাকে পাঠাবেন বলে ভাবছিলেন তখন। সকালের নাস্তায় এব্যাপারে কথা বলবো বলে ঘুমোতে গেলাম।

সকাল তিনটায় জেটল্যাগের কারণে ঘুম থেকে উঠে পড়েছি। আমার হোটেলের এগারো তালার জানালা দিয়ে ঘুমন্ত শহরটি দেখছি। ঠিক তখনই, আমি একটি টেক্সট বার্তা পাই আমাদের দলনেতার কাছ থেকে। মহাপ্রতাপশালী দেশপ্রধান সেদিন রাতের খাবারের পর আমাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্তভাবে দেখা করতে চান। মন্ত্রী চাচ্ছেন আমরা যেন আমেরিকা কেন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বিশ্বের সবচেয়ে সফল দেশ- এটা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করি। আমরা উত্তর দিতে দুই মিনিট, আর ভাগ্য ভালো হলে ত্রিশ মিনিটও সময় পেতে পারি। আমার দলনেতা সহকর্মী চান যে আমি আলোচনায় নেতৃত্ব দিই কারণ আমি ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে এসেছি যেটা বাৎসরিক প্যাটেন্টের সংখ্যায় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি উদ্ভাবনী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত। আর তার মতে, আমি আলোচনায় সংযম দেখতে পারি, আলাপচারিতায় ডিপ্লোমেটিক সুর বজায় রাখতে পারি এবং আচরণে শ্রদ্ধাশীল থাকতে পারি। আমরা আরও কিছু টেক্সট বার্তা বিনিময় করি। স্পষ্টতই আমাদের দলনেতা আমাকে দেশটির নেতার সাথে সরাসরি আলোচনায় নেতৃত্ব দিতে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন।

প্রথমত এ দেশের নেতৃত্বের জন্য আমার শ্রদ্ধা একেবারেই কম, তার উপর তিন দিনের কঠোর পরিশ্রমের ধকলে আমি কিছুটা ক্লান্ত আর জেটল্যাগে আক্রান্ত। বিশ্বের অসংখ্য একনায়কের জীবনী পড়ে আমি অনুধাবন করেছি যে তারা নিজেদেরই সবচেয়ে বুদ্ধিমান মনে করে, প্রায় সব ব্যাপারেই। আমাদের কোনো কথায় কি এই একনায়ক কর্ণপাত করবেন? কিছুটা বিরতি দিয়ে আমি পাল্টা টেক্সট পাঠাই, আমাদের দলনেতাকে বলি – আমেরিকা কেন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বিশ্বের সবচেয়ে সফল দেশ – এটা সমাজ বিজ্ঞানের প্রশ্ন, সেই এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, তারই কথা বলা উচিত এবিষয়ে। সাথে সাথে উত্তর আসে – তুমি জেগে আছো? তোমার কক্ষে আসবো এখন ? আমি রাজী বলার দু মিনিট পরে সে চলে আসে আমার কক্ষে।

তুমি দেখছি সবগুলো কফি শেষ করে ফেলেছো, শুধু চা দেখছি এখানে। কফি মেকারে পানি গরম করতে করতে বললো সে।

রাতে রিপোর্টের ড্রাফটা নিয়ে কাজ করার সময় বোধ হয় অনেকবার কফি বানিয়ে সব শেষ করে ফেলেছি। নীচে রিসেপশনে জিজ্ঞাসা করে দেখবো কফি আর আছে কিনা?

এতরাতে ওদের ঝামেলা করা ঠিক হবে না হয়তো। শোনো, তোমাকে বলছি, আমিই কথা বলতাম, প্রশ্নের উত্তর দিতাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত মালয়শিয়ার মাহাথির সহ গুটিকয় রাষ্ট্রনায়ক ছাড়া আর কেউই আমার সাথে দ্বিতীয়বার কথা বলেনি, যদিও আমি শুনেছি অনেকে আমার লেখা পড়েছে। স্বৈরশাসকদের নির্বুদ্ধিতায় অতীতে আমার প্রতিক্রিয়া তাদের ক্ষমতার ক্ষুধার মতোই তীব্র ছিল। যেহেতু তারা আমাকে, অর্থাৎ বার্তাবাহককে পছন্দ করেনি, বার্তাটিও তাদের পছন্দ হয়নি বেশিরভাগ সময়। কিন্তু আমার বিশ্বাস তোমার ক্ষেত্রে এ সমস্যাটা হবে না।

আরো কিছু যুক্তি এবং পাল্টা যুক্তি পরে আমি সম্মত হয়েছিলাম এবং ঠিক করেছি প্রাতঃরাশের সময় সবাই একসাথে আলোচনা করবো, কৌশল নির্ধারণ করবো। ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পরে আমি হোটেলের নোটপ্যাড হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়ে একজন নৃশংস স্বৈরশাসকের সামনে আমার আলোচনার পরিকল্পনা করতে লাগলাম। আমার জীবনে এই প্রথম এই ধরনের অভিজ্ঞতা। যে একনায়ক তার নিজের ক্ষমতা হারানোর ভয়ে নিমজ্জিত, যার প্যারানয়া তাকে সমস্ত সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্মূল করতে ব্যাস্ত রাখছে, যার প্রতিবন্ধীসম মানসিকতা আর আবেগ দেশকে ক্রমাগত ধ্বংস করে যাচ্ছে, যিনি কয়েক দশক ধরে তার মেধাবী সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করে তার ক্ষমতাকে পরিপক্ক করেছেন, তার কি আগ্রহ আছে কোনো ভিনদেশির মুখে সত্য কথা শোনার?

রূপকথার রাজা হবুচন্দ্রের সভাসদরা যখন সারা পৃথিবীর ধুলোকে চামড়া দিয়ে ঢাকতে চেয়েছিলো তখন একজন সাহসী মুচি তাকে সর্বোত্তম সমাধান বাতলে দিয়েছে, নিজের পায়ে জুতা পরতে বলেছে। একবিংশ শতাব্দীর হবুচন্দ্ররা চায় ক্ষমতা মোহে সত্যকে আদিগন্ত ঢেকে রাখতে, মানুষকে অজ্ঞতায় ডুবিয়ে রাখতে, বোকা বানিয়ে রাখতে। আমার কাছে মনে হলো আলোচ্য দেশটিতে ‘জুতা আবিষ্কারের’ মুচির মতো উদ্ভাবনী সমাধান কারো মাথায় থাকলেও সেটাকে প্রকাশ করার মতো কোনো সাহসী মুচি সেদেশে বেঁচে নেই যে ভয়ের চাদরের নীচে ঢেকে থাকা দেশটাকে বাঁচাবে।

দ্বিতীয় পর্বে চলবে..

সাইফ ইসলাম

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফর্নিয়া – ডেভিস

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org