অন্যান্য

“আমি চাই ৫০০ ডলারের মধ্যেই এই যন্ত্র গ্রামের ক্লিনিকে পৌঁছাক” – ড. আবু খালেদ

Share
Share

বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো আধুনিক পরীক্ষার যন্ত্রপাতির অভাব। শহরের বড় হাসপাতালে যেখানে উন্নত প্রযুক্তি সহজলভ্য, সেখানে গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অনেক সময় প্রাথমিক পরীক্ষার বাইরে কিছু করার সুযোগ থাকে না। এই বৈষম্যের কথাই মাথায় রেখে ড. আবু খালেদ বলেন, “আমি চাই ৫০০ ডলারের মধ্যেই এই যন্ত্র গ্রামের ক্লিনিকে পৌঁছাক।” তাঁর এই বক্তব্যের মধ্যেই ফুটে ওঠে বিজ্ঞানকে প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার।

ড. খালেদের উন্নত করা Bioelectrical Impedance Analysis (BIA) পদ্ধতি ডিহাইড্রেশন, অপুষ্টি এবং শরীরের ভেতরের পানি-চর্বির ভারসাম্য নির্ণয়ে অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু বর্তমানে এই ধরনের যন্ত্রের দাম ৭–৮ হাজার ডলারের কাছাকাছি হওয়ায় বাংলাদেশের মতো দেশে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব। ফলে যন্ত্রটি থেকে যে উপকার পাওয়া সম্ভব, তা শহরের অল্প কয়েকটি হাসপাতাল বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ড. খালেদের লক্ষ্য হলো এই প্রযুক্তিকে ‘ডেমোক্রেটাইজ’ করা—অর্থাৎ সবার নাগালে আনা।

গ্রামের বাস্তবতা বিবেচনা করলে কম দামের পাশাপাশি পোর্টেবল ও সোলার-পাওয়ার্ড যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন নয়। সেখানে যদি একটি ব্যাটারি বা সৌরশক্তিচালিত ছোট যন্ত্র দিয়ে শিশুর ডিহাইড্রেশন, গর্ভবতী মায়ের পুষ্টিগত অবস্থা বা প্রিম্যাচিউর নবজাতকের ঝুঁকি দ্রুত নির্ণয় করা যায়, তাহলে চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। এতে সময় বাঁচে, ভুল কমে এবং রোগীর জীবনরক্ষা সহজ হয়।

ড. আবু খালেদের এই ভাবনার পেছনে রয়েছে তাঁর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা। আইসিডিডিআরবি-তে কাজ করার সময় তিনি দেখেছেন, অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্যের অভাবে চিকিৎসা সিদ্ধান্তে বিলম্ব হয়। গ্রামে যদি প্রাথমিক পর্যায়েই রোগীর পানিশূন্যতার মাত্রা বা পুষ্টিগত অবস্থা নির্ণয় করা যেত, তাহলে অনেক রোগীকে শহরে রেফার করার প্রয়োজনই পড়ত না। এতে রোগীর আর্থিক চাপ যেমন কমে, তেমনি শহরের হাসপাতালের ওপর চাপও হ্রাস পায়।

এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষমতায়ন। সহজে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্র থাকলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কাররাও রোগীর অবস্থা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে পারেন। ফলে চিকিৎসক না থাকলেও জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। ড. খালেদের মতে, প্রযুক্তির আসল শক্তি এখানেই—এটি শুধু বিশেষজ্ঞদের হাতিয়ার না হয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাজকে শক্তিশালী করে।

ড. আবু খালেদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে। কম খরচে আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে গেলে ডিহাইড্রেশন, অপুষ্টি বা ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চিকিৎসা হবে আরও তথ্যভিত্তিক। দীর্ঘমেয়াদে এতে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব, যা জাতির সামগ্রিক স্বাস্থ্য সূচক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।

এই প্রেক্ষাপটে ড. খালেদের বক্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করাই শেষ কথা নয়, সেই প্রযুক্তিকে সবার জন্য সহজলভ্য করাই আসল চ্যালেঞ্জ। বিজ্ঞান তখনই সামাজিক ন্যায়ের অংশ হয়ে ওঠে, যখন তার সুফল প্রান্তিক মানুষের জীবনেও পৌঁছায়। গ্রামের ক্লিনিকে ৫০০ ডলারের যন্ত্র পৌঁছানোর স্বপ্ন আসলে একটি প্রযুক্তিগত লক্ষ্য নয়—এটি একটি মানবিক অঙ্গীকার।

ড. খালেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:


Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ