অন্তর্দৃষ্টি আলাপনউচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ

“একজনের দেখাদেখি বিজ্ঞানী বা ডাক্তার হতে হবে—এমন নয়; আমি কী হতে চাই, আমার ভেতরে কী আছে, সেটাই আগে দেখা উচিত” – ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানা

Share
Share

সন্তান কী হতে চায়: বিজ্ঞানচর্চার শুরু কি পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা থেকে?

“একজনের দেখাদেখি বিজ্ঞানী বা ডাক্তার হতে হবে—এমন নয়; আমি কী হতে চাই, আমার ভেতরে কী আছে, সেটাই আগে দেখা উচিত।”

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার এই কথাটি শুধু একজন গবেষকের ব্যক্তিগত মতামত নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ও পরিবার-সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে আনে। আমাদের সমাজে এখনো অনেক শিশুর ভবিষ্যৎ তার নিজের আগ্রহ, কৌতূহল বা স্বাভাবিক দক্ষতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। বরং অনেক সময় পরিবার, আত্মীয়স্বজন বা সামাজিক মর্যাদার ধারণা থেকেই ঠিক করে দেওয়া হয়—সে ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, সরকারি কর্মকর্তা হবে, অথবা সমাজে প্রচলিত কোনো “নিরাপদ” পেশায় যাবে।

সমস্যা পেশাগুলোর মধ্যে নয়। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, গবেষক—সব পেশাই গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন শিশুর নিজের আগ্রহকে উপেক্ষা করে তাকে একটি নির্দিষ্ট পথে ঠেলে দেওয়া হয়। ড. রানার ভাষায়, অনেক সময় বাবা-মা বোঝেন না, সন্তান আসলে কী চায়। কেউ হয়তো প্রকৌশলে আগ্রহী, কিন্তু তাকে জোর করে চিকিৎসাবিদ্যায় পাঠানো হচ্ছে। কেউ হয়তো জীববিজ্ঞান, রসায়ন বা মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে, কিন্তু তাকে বলা হচ্ছে—এসব করে কী হবে, বিসিএস দাও।

এই ধরনের চাপ শুধু ব্যক্তিগত অসন্তুষ্টি তৈরি করে না; জাতির মেধারও অপচয় ঘটায়। কারণ একজন মানুষ যে কাজে সত্যিকারের আগ্রহ পায়, সেই ক্ষেত্রেই তার গভীরতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিদেশে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে কৃষিকাজ করে সে কৃষিতেই বিশেষজ্ঞ হওয়ার চেষ্টা করে, যে শিক্ষক সে শিক্ষাদান ও গবেষণায় নিজেকে উন্নত করে, যে প্রকৌশলী সে প্রকৌশল সমস্যার সমাধানে দক্ষতা বাড়ায়। অর্থাৎ পেশাকে শুধু জীবিকার মাধ্যম হিসেবে নয়, দক্ষতা ও অবদানের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়।

বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই “ভালো ছাত্র” পরিচয়ের সঙ্গে বড় হয়। কিন্তু ভালো ছাত্র মানেই যে তাকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা ক্যাডার হতে হবে—এ ধারণা সীমাবদ্ধ। একজন ভালো ছাত্র হতে পারে পদার্থবিজ্ঞানী, পরিবেশ গবেষক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জীবপ্রযুক্তিবিদ, ডেটা বিজ্ঞানী, কৃষি উদ্ভাবক, বিজ্ঞান লেখক কিংবা উদ্যোক্তা। আজকের পৃথিবীতে জ্ঞানের ক্ষেত্র এত বিস্তৃত যে একমাত্র কয়েকটি প্রচলিত পেশার ভেতর ভবিষ্যৎকে আটকে রাখা যায় না।

ড. রানার নিজের গবেষণার ক্ষেত্র—হাইড্রোজেন এনার্জি—এর একটি ভালো উদাহরণ। হয়তো একসময় অনেকেই বুঝতেন না, পানি থেকে হাইড্রোজেন তৈরি করে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিয়ে গবেষণা কেন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট এবং পরিচ্ছন্ন শক্তির প্রয়োজনীয়তা আজ এই গবেষণাকে বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। অর্থাৎ আজ যে বিষয়টি অপরিচিত মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই হতে পারে সভ্যতার জন্য অপরিহার্য।

তাই শিক্ষার্থীদের পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষকদের ভূমিকা হওয়া উচিত নির্দেশক, নিয়ন্ত্রক নয়। সন্তানকে প্রশ্ন করতে শেখানো দরকার—সে কী নিয়ে কৌতূহলী? কোন বিষয় পড়লে তার চোখ জ্বলে ওঠে? সে কি ল্যাবে কাজ করতে পছন্দ করে, নাকি মাঠে? সে কি মানুষের চিকিৎসায় আগ্রহী, নাকি যন্ত্র বানাতে? সে কি গল্প লিখতে চায়, নাকি ডেটা বিশ্লেষণ করতে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থেকেই তৈরি হতে পারে ভবিষ্যতের সঠিক পথ।

অবশ্যই বাস্তবতা, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন আছে। কিন্তু আগ্রহকে পুরোপুরি অস্বীকার করে শুধু সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে পেশা নির্বাচন করলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি ও সমাজ—দুজনেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ অনাগ্রহী মানুষ হয়তো চাকরি পায়, কিন্তু নতুন জ্ঞান, উদ্ভাবন বা উৎকর্ষ তৈরি করতে পারে না।

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার কথাটি তাই তরুণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—দুই পক্ষের জন্যই ভাবনার বিষয়। সন্তানকে সফল করতে চাইলে তাকে শুধু নিরাপদ পথে ঠেলে দিলেই হবে না; তার ভেতরের আগ্রহ, ক্ষমতা ও স্বপ্নকে চিনতে সাহায্য করতে হবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের শিশু-কিশোরদের নিজেদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দিতে হবে। কারণ বড় বিজ্ঞানী, বড় গবেষক বা বড় উদ্ভাবক তৈরি হয় তখনই, যখন একজন তরুণ নিজের কৌতূহলকে ভয় না পেয়ে অনুসরণ করতে পারে।

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles