কৃষিজেনেটিকসবায়োটেকনলজি

নোনা পানির সেলুলার হ্যাকিং

Share
Share

কীভাবে উদ্ভিদ আণবিক স্তরে লবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে?

সমুদ্রের ধারে একই মাটিতে দুটি গাছ। একটি মরে গেল, অন্যটি সবুজ রইল। কেন?

উত্তরটি লুকিয়ে আছে তাদের শিকড়ে নয়, বরং প্রতিটি কোষের ভেতরে চলা এক অদৃশ্য আণবিক প্রতিরক্ষা যুদ্ধে। লবণের আক্রমণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ভিদের কোষে সক্রিয় হয়ে ওঠে এমন এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা অনেকটাই আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের মতো।

সীমান্তে শত্রুপক্ষ অনুপ্রবেশ করার সাথে সাথেই কন্ট্রোল রুমের রাডার স্ক্রিন লাল হয়ে ওঠে। সাইরেন বেজে ওঠার পর সুশৃঙ্খল সৈন্যরা বাঙ্কারে পজিশন নেয়, অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেম সক্রিয় হয় এবং শুরু হয় এক মনস্তাত্ত্বিক ও যান্ত্রিক যুদ্ধ। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের এটি একটি চিরচেনা দৃশ্য। দৃশ্যটি যদি আমরা আণবিক স্কেলে নামিয়ে আনি, তবে হুবহু একই রকম এক হাই-টেক যুদ্ধ দেখতে পাব আমাদের পায়ের নিচের মাটিতে।

এই আনবিক যুদ্ধে শত্রু চিরচেনা কোনো মানব বা আধুনিক কোনো রোবট সৈন্য নয়। সেটি হলো বিষাক্ত সোডিয়াম আয়ন (Na+) । আর ডিফেন্স ফোর্স হলো উদ্ভিদের কোষীয় নেটওয়ার্ক। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে আমাদের উপকূলবর্তী বা লবণাক্ত এলাকার ফসলের মাঠগুলো এখন একেকটি আণবিক যুদ্ধক্ষেত্র। এই লোনা আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে কীভাবে আণবিক কোড হ্যাক করে উদ্ভিদ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে, তা কোনো রোমাঞ্চকর সাই-ফাই থ্রিলারের চেয়ে কম নয়।

১. বর্ডার রাডার এবং সাইরেন: ‘GIPC’‘MOCA1’ প্রোটোকল

বাস্তব যুদ্ধে শত্রু সীমানা পার হলেই যেমন রাডারে ধরা পড়ে, উদ্ভিদের কোষেও ঠিক তেমনই একটি আণবিক প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা বসানো থাকে। বছরের পর বছর বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্য ছিল, গাছ কীভাবে বোঝে যে মাটিতে লবণ বেড়ে গেছে? ২০১৯ সালের পর এই রহস্যের জট খোলে।

  • মেমব্রেনের রাডার: উদ্ভিদের কোষের সীমান্তে (Plasma Membrane) এক ধরনের বিশেষ ফ্যাট বা স্ফিংগোলিপিড থাকে, যার নাম GIPC (Glycosyl Inositol Phosphorylated Ceramide)। এটি মূলত কোষের বর্ডার গার্ড।
  • MOCA1-এর সাইরেন: যখনই মাটিতে সোডিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায়, তারা এসে সরাসরি এই GIPC-এর নেগেটিভ চার্জের সাথে যুক্ত হয় (চিত্র-১)। শত্রুর এই স্পর্শ পাওয়ামাত্রই অ্যাক্টিভেট হয়ে যায় MOCA1 নামের একটি বিশেষ আণবিক এনজাইম।
  • ক্যালসিয়ামের সুনামি: MOCA1 সংকেত পাওয়া মাত্রই কোষের ভেতর সেকেন্ডের মধ্যে একটি ক্যালসিয়াম তরঙ্গের (Ca2+ wave) সৃষ্টি করে। এটি যেন কোষের সেন্ট্রাল কমান্ডে বেজে ওঠা সাইরেন-“বর্ডার আক্রান্ত হয়েছে, প্রতিরক্ষাবাহিনী তৈরি হও!”

২. যুদ্ধক্ষেত্রের তিন দল: কার রণকৌশল কেমন?

সাইরেন বাজার পর বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রজাতি এই শত্রুর সাথে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে লড়াই করে। সামরিক পরিভাষায় তাদের রণকৌশলকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:

 চিত্র ১: নোনা পানির আক্রমণে উদ্ভিদের কোষের প্রতিরক্ষা যুদ্ধ

ক) গ্লাইকোফাইট (প্যানিক অ্যাটাক ও আত্মসমর্পণ)

আমাদের ধান বা গমের মতো সাধারণ ফসলরা হলো এই দলের। সাইরেন বাজামাত্রই এরা ভয়ে পাতার সমস্ত ‘স্টোমাটা’ (পত্ররন্ধ্র) বন্ধ করে দেয়-যেন শত্রুর ভয়ে ঘরের জানালা লক করে দেওয়া। ফলস্বরূপ, পানি আর বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এদের সালোকসংশ্লেষণ বা খাদ্য তৈরি থমকে দাঁড়ায়। এরা তখন মরিয়া হয়ে কোষে থাকা SOS (Salt Overly Sensitive) প্রোটিনদের জাগিয়ে তোলে, যেন কোষ থেকে সোডিয়ামকে ধাক্কা দিয়ে বের করা যায়। কিন্তু অতিরিক্ত শক্তির অপচয় আর অক্সিজেনের বিষাক্ত রূপ Reactive Oxygen Species (ROS)-এর তাণ্ডবে শেষ পর্যন্ত এরা মাঠেই আত্মসমর্পণ করে।

খ) হ্যালোফাইট (শত্রুর অস্ত্রেই শত্রুকে ঘায়েল)

উপকূলের লবণাক্ত ঘাস বা কলমিজাতীয় উদ্ভিদরা সোডিয়ামকে ভয় পায় না, বরং একে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করে। তারা এই শত্রুকে কোষের ঠিক মাঝখানে থাকা ‘ভ্যাকিওল’ বা কোষগহ্বরে বন্দি করে ফেলে, যাকে বলে Vacuolar Sequestration। লবণের এই সস্তা খনি ব্যবহার করে তারা কোষের ভেতরের জলীয় চাপ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ (Osmotic Adjustment) করে, যাতে নোনা মাটি থেকেও পানি অনায়াসে গাছের ভেতর চলে আসে।

অনেক হ্যালোফাইটের পাতায় থাকে বিশেষ ‘লবণথলি’ (Epidermal Bladder Cells)। কোষে লবণ বেশি হয়ে গেলেই এরা অতিরিক্ত লবণ সেই থলিতে চালান করে দেয়। থলিটা যখন লবণের বোঝায় উপচে পড়ে, তখন বেলুনের মতো টপ করে পাতা থেকে খসে পড়ে যায়। আক্ষরিক অর্থেই শত্রুকে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া!

গ) ম্যানগ্রোভ (দ্য এলিট ইঞ্জিনিয়ার্স)

সুন্দরবনের বাইন বা গরান গাছের শিকড়ে থাকে ‘সুবেরিন’-এর এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। এরা প্রাকৃতিক রিভার্স অসমোসিস (Reverse Osmosis) প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯০% থেকে ৯৯% লবণ শিকড়েই ফিল্টার করে দেয়। আর বাকি যেটুকু লবণ পাতায় পৌঁছায়, তা পাতার বিশেষ ‘সল্ট গ্ল্যান্ড’ বা লবণ-গ্রন্থি দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই ঘাম আকারে বাইরে বের করে দেয়।

৩. আধুনিক বায়ো-হ্যাকিং: ক্রিসপার কাঁচি ও ন্যানো-প্রযুক্তি

আমাদের সাধারণ ধান গাছ তো ম্যানগ্রোভের মতো শক্তিশালী নয়। তাহলে কি নোনা জলের কাছে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা হেরে যাবে? এখানেই বিজ্ঞানের আর্শীবাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন আধুনিক ল্যাবরেটরির জিন-প্রযুক্তি। তারা উদ্ভিদের এই আণবিক কোডকে ‘হ্যাক’ করছেন দুটি অভিনব উপায়ে:

  • আণবিক কাঁচি দিয়ে ডিএনএ হ্যাকিং (CRISPR-Cas9)

বিজ্ঞানীরা এখন এই ক্রিসপার প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ ধানের ডিএনএ-র ভেতরে থাকা ঘুমন্ত বা দুর্বল জিনগুলোকে (যেমন: OsHKT1;5, OsSOS1, OsNHX1) রি-কোড বা এডিট করে দিচ্ছেন। এর ফলে, সাধারণ ধান গাছের কোষের ভেতর MOCA1-এর সিগন্যালিং ক্ষমতা এবং SOS1 পাম্পের কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। ক্রিসপারের ছোঁয়ায় সাধারণ ফসলের কোষগুলো এখন হ্যালোফাইটের মতো দক্ষতার সাথে লবণ সামলাতে শিখছে।

  • ন্যানো-প্রাইমিং (যুদ্ধের আগের মক-ড্রিল)

বীজ বোনার আগেই যদি তাকে জিঙ্ক অক্সাইড (ZnO) বা সিলেনিয়াম (Se) ন্যানোকণার হালকা দ্রবণে ভিজিয়ে নেওয়া হয়, তবে বীজের ভেতরের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ডিফেন্স সিস্টেম আগে থেকেই ‘প্রাইমড’ বা জাগ্রত হয়ে থাকে। এগুলো Reactive Oxygen Species (ROS) নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এনজাইম যেমন SOD, CAT ও APX-এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে পারে। এটি যেন আসল যুদ্ধ শুরুর আগে সৈন্যদের একটি সফল মহড়া! ফলে নোনা মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই গাছটি প্যানিক না করে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফ্রি-র‍্যাডিক্যাল ও আয়ন টক্সিসিটি মোকাবেলা করতে পারে।

শেষ কথা

আগামী কয়েক দশকে পৃথিবীর কোটি কোটি হেক্টর জমি আরও লবণাক্ত হয়ে উঠতে পারে। সেই ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করবে শুধু কৃষকের মাঠে নয়, বরং আজকের গবেষণাগারের ক্ষুদ্রতম কোষে লেখা জিনগত সিদ্ধান্তগুলোর ওপর। লবণের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ তাই কেবল উদ্ভিদের নয়, এটি মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ রক্ষারও এক নীরব সংগ্রাম।

লেখক: রিপন সিকদার
পিএইচডি, ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (বীজ),
পার্টনার প্রকল্প, বিএডিসি, ঢাকা।
Email: [email protected]

Share
Written by
ড. রিপন সিকদার

কৃষি উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ | উদ্ভিদ স্ট্রেস ফিজিওলজিস্ট | বিজ্ঞান যোগাযোগকর্মী | উপদেষ্টা, বিজ্ঞানী.অর্গ ড. রিপন সিকদার একজন বাংলাদেশি কৃষি উন্নয়ন পেশাজীবী, উদ্ভিদ স্ট্রেস ফিজিওলজিস্ট এবং বিজ্ঞান যোগাযোগকর্মী। তিনি চীনের Chinese Academy of Agricultural Sciences থেকে Crop Cultivation and Farming System বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন, যেখানে তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল লবণাক্ততা ও পরিবেশগত চাপের মধ্যে নাইট্রোজেন-নিয়ন্ত্রিত ফসল সহনশীলতা বৃদ্ধি। পাশাপাশি তিনি Human Resource Management (HRM)-এ এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেছেন, যা তাঁর নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা দক্ষতাকে সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমানে তিনি Bangladesh Agricultural Development Corporation (বিএডিসি)-এ কর্মরত এবং World Bank এর PARTNER Program-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, টেকসই বীজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, বীজের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং কৃষিভিত্তিক সক্ষমতা উন্নয়নে কাজ করছেন। ড. সিকদার বিশ্বাস করেন, টেকসই কৃষি উন্নয়ন কেবল প্রযুক্তি বা গবেষণার মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্ব, জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং মানবসম্পদের কার্যকর বিকাশ। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞানী.অর্গ-এর উপদেষ্টা হিসেবে বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার কাজ করছেন। তাঁর লেখালেখির বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষি জীবপ্রযুক্তি, প্ল্যান্ট ন্যানোবায়োনিক্স, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব (4IR) প্রযুক্তি। তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ ও রিভিউ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত এবং গবেষণা, নেতৃত্ব ও বিজ্ঞান যোগাযোগের মাধ্যমে টেকসই কৃষি ও বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন।

2 Comments

  • সম্পূর্ণ লেখাটা মনযোগ দিয়ে পড়লাম। অনেক কিছু নতুনভাবে জানতে পারলাম। এতো গভীরে গিয়ে ভাবার সুযোগ কখনো হয়নি আগে। অসাধারণ লিখেছেন স্যার। বিশেষ করে সল্ট টলারেন্ট জাতগুলো কিভাবে কাজ করে সেটা ক্লিয়ার হয়েছে আপনার সুন্দর লেখাটি পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ