শিক্ষাজীবনে অনেক সময়ই সামনে দুটি পথ খোলা থাকে—একটি তুলনামূলক সহজ ও নিরাপদ, আরেকটি কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময়। বেশিরভাগ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সহজ পথটিই বেছে নিতে চায়। কারণ এতে ঝুঁকি কম, ব্যর্থতার ভয় কম, এবং সাফল্য তুলনামূলক নিশ্চিত। কিন্তু গবেষণার ক্ষেত্রে এই মানসিকতা নতুন জ্ঞান তৈরির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের গবেষণাজীবনের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। তাঁর কথার ভাবার্থ হলো—সহজ পথে গেলে হয়তো ডিগ্রি পাওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃত গবেষণার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
পিএইচডি পর্যায়ে তিনি এমন একটি এনজাইম নিয়ে কাজ করছিলেন, যা অত্যন্ত অস্থির প্রকৃতির হওয়ায় বারবার পরীক্ষায় ব্যর্থতা আসছিল। তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপকও তাঁকে বিষয় বদলানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। সহজ পথ ছিল—অন্য কোনো প্রতিষ্ঠিত ও পরীক্ষিত বিষয়ে কাজ শুরু করা, যাতে সময়মতো ডিগ্রি শেষ করা যায়। কিন্তু তিনি সেই পথ নেননি। কারণ তাঁর কাছে গবেষণার অর্থ ছিল নতুন কিছু জানা, অজানা জায়গায় আলো ফেলা। সহজ পথে হাঁটলে হয়তো তাঁর একাডেমিক ক্যারিয়ার নিরাপদ থাকত, কিন্তু নিজের ভেতরের গবেষককে তিনি সন্তুষ্ট করতে পারতেন না।
এই অভিজ্ঞতা তরুণ গবেষকদের একটি বড় দ্বিধার কথা মনে করিয়ে দেয়। অনেক সময় গবেষণার বিষয় বাছাইয়ে ‘নিরাপদ’ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়—যেগুলোতে দ্রুত ফল পাওয়া যায়, প্রকাশনা সহজ হয়। কিন্তু এই ধরনের গবেষণায় নতুনত্বের জায়গা কম থাকে। ড. আশরাফউদ্দিনের অভিজ্ঞতায়, গবেষণার প্রকৃত আনন্দ ও মূল্য লুকিয়ে থাকে ঝুঁকি নেওয়ার মধ্যে। ঝুঁকি মানেই যে ব্যর্থতা আসবে—তা নয়; ঝুঁকি মানেই নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়া।
এখানে শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। যদি শিক্ষার্থীদের কেবল নম্বর বা ডিগ্রির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তারা স্বাভাবিকভাবেই সহজ পথ বেছে নেবে। কিন্তু যদি শিক্ষার্থীদের গবেষণায় প্রশ্ন তোলা, চ্যালেঞ্জ নেওয়া ও ব্যর্থতা থেকে শেখার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করা যায়, তবে তারা কঠিন পথেও এগোতে সাহস পাবে। ড. আশরাফউদ্দিন মনে করেন, ব্যর্থতা গবেষণার অংশ—ব্যর্থতা মানেই সময় নষ্ট নয়; ব্যর্থতা মানে কী কাজ করছে না, সেই তথ্য জানা।
সবশেষে বলা যায়, এই বক্তব্য আমাদের জীবনের অন্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সহজ পথ অনেক সময় আমাদের স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সক্ষমতার সীমা বাড়ায় না। কঠিন পথ আমাদের চিন্তাকে প্রসারিত করে, নতুন দক্ষতা তৈরি করে এবং সত্যিকারের শেখার সুযোগ এনে দেয়। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের গবেষণাজীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—শুধু ডিগ্রির জন্য নয়, নতুন জ্ঞান তৈরির জন্য গবেষণায় নামাই বিজ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment