সস্তা ধাতুতে সবুজ জ্বালানি: হাইড্রোজেন প্রযুক্তির খরচ কমানোর লড়াই
“নোবেল মেটালকে নন-নোবেল মেটাল দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারলে হাইড্রোজেন প্রযুক্তির খরচ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব।”
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার এই কথাটি হাইড্রোজেন জ্বালানি প্রযুক্তির একটি বড় বাস্তব সমস্যার দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরায়—প্রযুক্তি শুধু কার্যকর হলেই হয় না, সেটি সাশ্রয়ীও হতে হয়। কোনো প্রযুক্তি যদি গবেষণাগারে অসাধারণ ফল দেখায়, কিন্তু তার খরচ এত বেশি হয় যে সাধারণ মানুষ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা উন্নয়নশীল দেশগুলো তা ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে সেই প্রযুক্তির সামাজিক প্রভাব সীমিত থেকে যায়।
হাইড্রোজেন এনার্জি আজ বিশ্বজুড়ে ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে আলোচিত। পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি করা যায়, আবার সেই হাইড্রোজেন ব্যবহার করে ফুয়েল সেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এই প্রক্রিয়ায় কয়লা, তেল বা গ্যাসের মতো ক্ষতিকর কার্বন নির্গমন হয় না। কিন্তু সমস্যা হলো, এই প্রযুক্তিকে কার্যকর করতে যে উপাদানগুলো দরকার, তার মধ্যে কিছু অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্যাটালিস্ট। ক্যাটালিস্ট হলো এমন একটি পদার্থ, যা রাসায়নিক বিক্রিয়াকে দ্রুত বা সহজ করে, কিন্তু নিজে শেষ হয়ে যায় না। সহজ উদাহরণ দিলে বলা যায়, রান্নার সময় আগুন যেমন খাবার তৈরির প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়, তেমনি ফুয়েল সেল বা ওয়াটার ইলেকট্রোলাইজারের ভেতরে ক্যাটালিস্ট রাসায়নিক বিক্রিয়াকে কার্যকর করে। ক্যাটালিস্ট ছাড়া অনেক বিক্রিয়া ধীর, অকার্যকর বা ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে যায়।
বর্তমানে হাইড্রোজেন প্রযুক্তিতে প্লাটিনাম ও ইরিডিয়ামের মতো নোবেল মেটাল বা মূল্যবান ধাতু ব্যবহার করা হয়। এগুলো অত্যন্ত কার্যকর, কিন্তু পৃথিবীতে সীমিত পরিমাণে পাওয়া যায় এবং দামও অনেক বেশি। ফলে ফুয়েল সেল বা ইলেকট্রোলাইজারের মতো যন্ত্রের মূলধনী খরচ বেড়ে যায়। এই খরচই হাইড্রোজেন প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রাখার অন্যতম কারণ।
ড. রানার গবেষণার লক্ষ্য এই জায়গাটিতেই। তিনি এমন নন-নোবেল মেটাল ক্যাটালিস্ট নিয়ে কাজ করছেন, যেগুলো তুলনামূলকভাবে সস্তা, সহজলভ্য এবং ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। যেমন নিকেল, আয়রন, কোবাল্ট, মলিবডেনাম বা টাংস্টেন—এসব ধাতু প্লাটিনাম বা ইরিডিয়ামের মতো ব্যয়বহুল নয়। কিন্তু গবেষণার চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে এগুলোকে এমনভাবে প্রস্তুত করা যায়, যাতে তারা মূল্যবান ধাতুর কাছাকাছি কার্যকারিতা দেখাতে পারে।
এটি অনেকটা দামি ওষুধের সাশ্রয়ী বিকল্প তৈরির মতো। যদি একই রোগের চিকিৎসায় কার্যকর কিন্তু কম খরচের ওষুধ তৈরি করা যায়, তাহলে সেটি অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়। একইভাবে, যদি হাইড্রোজেন প্রযুক্তিতে সস্তা ধাতু কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে সবুজ জ্বালানি প্রযুক্তি শুধু উন্নত দেশের গবেষণাগার বা বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবহারযোগ্য হবে।
ড. রানা বিশেষভাবে কাজ করছেন অ্যানায়ন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেনভিত্তিক রিজেনারেটিভ ফুয়েল সেল প্রযুক্তি নিয়ে। এই ব্যবস্থায় রাসায়নিক পরিবেশ তুলনামূলকভাবে অ্যালকালাইন হওয়ায় নন-নোবেল মেটাল ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। প্রচলিত কিছু ফুয়েল সেল ব্যবস্থায় পরিবেশ অ্যাসিডিক হওয়ায় মূল্যবান ধাতু ব্যবহার অনেক সময় প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। তাই নতুন ধরনের মেমব্রেন ও ক্যাটালিস্ট উন্নয়ন ভবিষ্যতের খরচ কমানোর বড় পথ হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই গবেষণা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর, আর নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে খরচ একটি বড় বাধা। যদি ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী ক্যাটালিস্ট ব্যবহার করে হাইড্রোজেন প্রযুক্তির দাম কমানো যায়, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নবায়নযোগ্য শক্তি সংরক্ষণ, পরিবহন কিংবা গ্রামীণ শক্তি ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সবুজ জ্বালানির ভবিষ্যৎ তাই শুধু “পরিচ্ছন্ন” হওয়ার প্রশ্ন নয়; এটি “সবার নাগালের মধ্যে” আনার প্রশ্নও। ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার গবেষণা সেই সেতুবন্ধনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি প্রয়াস—যেখানে বিজ্ঞান শুধু উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করে না, বরং সেটিকে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী ও সাশ্রয়ী করার পথও খোঁজে।
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment