কৃষিপরিবেশ ও পৃথিবী

বর্জ্য থেকে জ্বালানি, জ্বালানি থেকে নিরাপত্তা

Share
Share

জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়ার বিষয় নয়এটি একটি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, কৃষি মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

প্রতিদিন আমাদের গ্রাম ও শহরে বিপুল পরিমাণ গোবর, রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য, কৃষিজ অবশিষ্টাংশ ও অন্যান্য জৈব পদার্থ তৈরি হচ্ছে। আমরা অনেক সময় এগুলোকে শুধু বর্জ্য হিসেবে দেখি। অথচ সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এই বর্জ্যই হতে পারে পরিষ্কার জ্বালানির উৎস

এই ধারণা থেকেই BioShikha Biogas-এর মতো উদ্যোগের গুরুত্ব তৈরি হয়।

গোবর কি শুধু বর্জ্য?

একজন কৃষক প্রতিদিন যে গোবর সংগ্রহ করেন, তা শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো যেতে পারে। কিন্তু এতে ধোঁয়া সৃষ্টি হয় এবং গোবরের একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈব-সম্পদ নষ্ট হয়ে যায়।

অন্যদিকে, সেই গোবরকে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে ব্যবহার করলে তৈরি হতে পারে পরিষ্কার রান্নার গ্যাস। একই প্রক্রিয়ার পর অবশিষ্ট বায়োস্লারি কৃষিজমিতে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

অর্থাৎ—গোবরবায়োগ্যাসরান্নার জ্বালানিবায়োস্লারিজৈব সারকৃষি উৎপাদন

এটি শুধু একটি জ্বালানি উৎপাদন ব্যবস্থা নয়; এটি একটি সম্পদ পুনরুদ্ধার বৃত্তাকার ব্যবস্থাপনার মডেল

BioShikha: গ্রামের জ্বালানি ব্যবস্থায় একটি সম্ভাবনা

BioShikha-এর ভাসমান-পিলো বায়োগ্যাস ব্যবস্থা এমন একটি প্রযুক্তি, যা গ্রামীণ পরিবারের জন্য জৈব বর্জ্যকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করে।

বিশেষ করে যেসব পরিবারে পর্যাপ্ত গবাদিপশুর গোবর বা নিয়মিত জৈব বর্জ্য পাওয়া যায়, তাদের জন্য বায়োগ্যাস হতে পারে রান্নার জ্বালানির একটি স্থানীয় ও নবায়নযোগ্য উৎস।

এর ফলে পরিবারকে রান্নার জ্বালানির জন্য সম্পূর্ণভাবে কাঠ, শুকনো গোবর বা বাণিজ্যিক জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয় না।

জ্বালানি নিরাপত্তায় গ্রামীণ পরিবার কেন গুরুত্বপূর্ণ?

জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলে আমরা সাধারণত বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস, তেল বা আমদানিনির্ভর জ্বালানির কথা ভাবি। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি উৎপাদন

একটি পরিবার যদি নিজের খামারের বর্জ্য থেকে নিজের রান্নার জ্বালানি উৎপাদন করতে পারে, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের খরচ কমায় না; একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করে।

যে বর্জ্য আজ সমস্যা, সেটিই আগামী দিনের জ্বালানি সম্পদ হতে পারে।

নারীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ

গ্রামীণ পরিবারের রান্নার জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নারীদের জীবন সরাসরি যুক্ত। কাঠ বা অন্যান্য কঠিন জ্বালানি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের কারণে তাদের সময় ও শ্রম ব্যয় হয়।পরিষ্কার বায়োগ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে রান্নাঘরের ধোঁয়া কমানো এবং রান্নার পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব। ফলে বায়োগ্যাস শুধু একটি জ্বালানি প্রযুক্তি নয়; এটি পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের একটি মাধ্যম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।

বায়োগ্যাসের পরেও থাকে মূল্যবান সম্পদ

বায়োগ্যাস উৎপাদনের পর যে বায়োস্লারি অবশিষ্ট থাকে, সেটিকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।এটি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার করলে কৃষিজমিতে জৈব উপাদান ও পুষ্টি ফেরত দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে।

এখানেই BioShikha-এর ধারণাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—

বর্জ্যকে জ্বালানিতে, জ্বালানিকে সাশ্রয়ে এবং অবশিষ্ট জৈব পদার্থকে কৃষির সম্পদে রূপান্তর।

জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।

প্রতিটি গ্রাম, খামার ও পরিবার যদি তার নিজস্ব জৈব সম্পদকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে হাজার হাজার ছোট ছোট উৎপাদন কেন্দ্র একত্রে একটি বড় জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।

তাই জ্বালানি নিরাপত্তা দিবসে আমাদের ভাবতে হবে—

আমরা যে বর্জ্য ফেলে দিচ্ছি, সেটি কি আসলে আমাদের ভবিষ্যৎ জ্বালানি?

BioShikha-এর মতো স্থানীয় উদ্ভাবন দেখিয়ে দেয়, জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু বড় প্রকল্পের বিষয় নয়; এটি শুরু হতে পারে একটি কৃষকের খামার, একটি পরিবারের রান্নাঘর এবং কয়েকটি গবাদিপশুর গোবর থেকেও।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ