কৃষিজেনেটিকস

গবেষণাগারে সফল ফসল মাঠেও কি টিকবে?

Share
Share

“নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ভালো ফল করা ফসলের জাত কৃষকের খোলা মাঠে অনিশ্চিত পরিবেশের মধ্যে ব্যর্থও হতে পারে।”

ড. শিরিন আক্তারের এই কথায় কৃষি গবেষণার একটি কঠিন বাস্তবতা ধরা পড়ে। গবেষণাগার বা গ্রিনহাউসে আলো, পানি ও তাপমাত্রার অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু কৃষকের জমিতে আজ রোদ, কাল অতিবৃষ্টি; কোথাও মাটিতে লবণ, কোথাও দীর্ঘ জলাবদ্ধতা। একটি গাছ গবেষণার পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল দেখালেই তাই বলা যায় না, সেটি মাঠে কৃষকের প্রয়োজন মেটাবে।

চীনের লানচৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এই বাংলাদেশি গবেষক বিজ্ঞানী ডট অর্গের সাক্ষাৎকারে জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কথাটি বলেন। প্রশ্ন এসেছিল বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জলাবদ্ধ ও লবণাক্ত জমি নিয়ে। সেখানে এক মৌসুমের পরিকল্পনা অন্য মৌসুমে কাজে নাও লাগতে পারে। অনিয়মিত বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, তাপপ্রবাহ ও উপকূলে লবণাক্ততার চাপ ফসলের বেড়ে ওঠাকে জটিল করে তোলে। কৃষকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তাই খুব সরল: নতুন জাতটি তাঁর নিজের জমিতে ফলন দেবে কি?

বিজ্ঞানীরা উত্তর খোঁজেন উদ্ভিদের ভেতরে। কিছু গাছের শিকড় গভীরে ছড়ায়; তারা মাটির নিচের পানি ও পুষ্টি পাওয়ার বেশি সুযোগ পেতে পারে। কিছু গাছের কোষ লবণাক্ত মাটিতে অতিরিক্ত সোডিয়ামের চাপ তুলনামূলক ভালো সামলায়। আবার প্রতিকূল অবস্থায় কোষের ক্ষতি কমাতে উদ্ভিদের নিজস্ব সুরক্ষাব্যবস্থা কাজ করে। কোন জিন এসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে জড়িত, তা বোঝার চেষ্টা গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সহজ কথায়, জিন হলো উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার নির্দেশনার অংশ; পরিবেশের সঙ্গে মিলে সেই নির্দেশনা কীভাবে প্রকাশ পাবে, তা নির্ধারিত হয়।

কিন্তু শিরিন আক্তার একটিমাত্র জিনে সব সমস্যার সমাধান দেখেন না। ধরুন, একটি জাত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, কিন্তু টানা কয়েক সপ্তাহ পানির নিচে থাকলে টিকতে পারে না। আবার পর্যাপ্ত পানি পেলেও অত্যধিক তাপে তার ফুল বা শস্যের ক্ষতি হতে পারে। বাস্তব জমিতে বিভিন্ন চাপ একসঙ্গে বা পরপর আসে। তাই সম্ভাবনাময় জাতকে নানা স্থানে এবং নানা পরিস্থিতিতে পরীক্ষা করা দরকার। পরীক্ষার ফল দেখে বুঝতে হবে, সেটি কোথায় কাজে আসবে, কোথায় আরও উন্নতি প্রয়োজন।

একটি পরীক্ষার ভালো ফলকে সিদ্ধান্তের শেষ ধাপ না ভাবার কারণও এখানে। একই জাত ভিন্ন এলাকার মাটিতে বা ভিন্ন বছরের আবহাওয়ায় আলাদা আচরণ করতে পারে। গবেষকেরা তাই শুধু গাছ বেঁচে আছে কি না দেখলে চলবে না; শস্যের পরিমাণ, ফসল পাকার সময় এবং কৃষকের পরিচিত চাষপদ্ধতির সঙ্গে জাতটির মিলও দেখতে হবে। শিরিনের কথায়, নিয়ন্ত্রিত জায়গায় জাত উদ্ভাবন হলো প্রথম ধাপ। মাঠপর্যায়ের ফল জানায়, সেই উদ্ভাবন মানুষের কাজে আসার মতো প্রস্তুত হয়েছে কি না।

ফসলের সঙ্গে জমির ব্যবস্থাপনাকেও তিনি গুরুত্ব দেন। উন্নত বীজের পাশাপাশি প্রয়োজন উপযুক্ত সেচ, মাটির পরিচর্যা ও নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার তথ্য। দূর থেকে ছবি বা পরিমাপের মাধ্যমে জমির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে কোথায় ফসল চাপে আছে, তার ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। তবে এসব তথ্য সিদ্ধান্তে সহায়তা করে; স্থানীয় অভিজ্ঞতার জায়গা নিতে পারে না।

এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের একটি কথা তাঁর মনে আছে। নিউজিল্যান্ডের এক অধ্যাপক বলেছিলেন, বহু বছর ধরে একই ফসল দেখা একজন কৃষক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সদ্য পাশ করা বিজ্ঞানীর চেয়েও দ্রুত ধরতে পারেন। গবেষণার নকশা করার সময় এই জ্ঞান উপেক্ষা করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হারিয়ে যায়। কৃষক বলতে পারেন, জমিতে পানি কত দিন দাঁড়িয়ে থাকে, কোন সময়ে লবণ বাড়ে, পুরোনো কোন জাত একবার ভালো ফল দিয়েছিল কিন্তু পরের বছর দেয়নি। বিজ্ঞানী সেই পর্যবেক্ষণের কারণ পরীক্ষা করতে পারেন। দুই পক্ষের জ্ঞান মিললে প্রশ্নটি আরও নির্ভুল হয়।

এই কারণেই জলবায়ুসহিষ্ণু ফসলের সাফল্য শুধু গবেষণাগারের প্রতিবেদনে খুঁজলে চলবে না। দেখতে হবে, কৃষকের মাঠে গাছটি টিকছে কি না, ফলন দিচ্ছে কি না এবং চাষের পদ্ধতিটি কৃষকের পক্ষে বাস্তবে অনুসরণ করা সম্ভব কি না। শিরিন আক্তারের বক্তব্য মনে করিয়ে দেয়, মাঠে যাচাই করাই আবিষ্কারকে বাস্তব সমাধানের পথে নিয়ে যায়।

জিনতত্ত্ব, মাটির ব্যবস্থাপনা ও কৃষকের অভিজ্ঞতাকে কীভাবে একসঙ্গে কাজে লাগানো যায়—এবং নতুন জাতের বীজ কৃষকের হাতে পৌঁছাতে আর কী কী ধাপ পেরোতে হয়—সেসব নিয়ে ড. শিরিন আক্তারের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে বিজ্ঞানী ডট অর্গের পূর্ণ সাক্ষাৎকারে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ