মশিউর রহমান
আমাদের কম্পিউটার, পিডিএ ও মোবাইলে এখন প্রচুর টাচ স্ক্রিন ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া ব্যাংকের এটিএম বুথের সিস্টেম, কাস্টোমার সেন্টারে টাচ স্ক্রিনের ব্যবহার আপনারা দেখবেন। বেশ অনেক বছর আগ থেকেই ইলেকট্রনিক্স এর সামগ্রীতে টাচ স্ক্রিনের ব্যবহার হলেও সবথেকে বেশি সফলভাবে গ্রাহকদের মন কেড়েছে এপল এর আইফোন। আইফোন খুব সফলভাবে বেশ কিছু কারিগরি সমস্যার সমাধান করেছে এবং বাজারে টাচ স্ক্রিনের আসল উপলব্ধি ক্রেতাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমানে টাচ স্ক্রিন জনপ্রিয় হলেও এর ইতিহাস একটু পুরনো। ১৯৬৫ সনে ইংল্যান্ডের জনসন (E.A. Johnson) তার একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে এটি ব্যাখ্যা করেন। তবে বাস্তবে এটিকে প্রয়োগ করা সেই সময়ে একটু বেশিই কঠিন ছিল। প্রথম আমরা টাচ স্ক্রিনের বর্তমান রূপ দেখতে পাই ১৯৭৩ সনে, যখন বেন্ট স্টাম্প (Bent Stumpe) ইউরোপের গবেষণাকেন্দ্র সার্ন (CERN)-এ তার একটি যন্ত্রে এটি প্রয়োগ করেন। এরপরে আরও অনেক ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রে এর প্রয়োগ দেখা যায়। কম্পিউটারে টাচ স্ক্রিনের প্রথম প্রয়োগ করে হিউলেট প্যাকার্ড তাদের এইচপি-১৫০ (HP-150) নামের একটি কম্পিউটারে।

চিত্র: হিউলেট প্যাকার্ড কম্পিউটারে প্রথম টাচস্ক্রিনের ব্যবহার (সাদাকালো মনিটর)

চিত্র: সেগা এর গেম গিয়ার প্রথম গেমের জন্য টাচস্ক্রিন নিয়ে আসে
সৌখিন গেম খেলবার কনসোলগুলির জন্য টাচস্ক্রিন প্রথম নিয়ে আসে সেগা তাদের গেম গিয়ার, যেটিতে রঙিন স্ক্রিনে স্পর্শ করে খেলা সম্ভব হয়েছিল। ১৯৯০ সনে জাপানে প্রথম তাদের এই কনসোল বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১৫০ ডলারে। কিন্তু এর দাম একটু বেশি হবার কারণে বাজার দখল করতে পারেনি। সেই সময়ে টাচ স্ক্রিন প্রযুক্তি নতুন হবার কারণে খরচ একটু বেশিই পড়ছিল। গেমের বাজারে টাচ স্ক্রিন ভালো মতো আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে পরবর্তীতে ২০০৪ সনে নিনটেন্ডো তাদের ডিএস পণ্য দিয়ে। বর্তমানেও এর কিছু নতুন সংস্করণ বাজারে পাওয়া যায়।
এর পরে আরও অনেক পণ্যে টাচ স্ক্রিনের প্রয়োগ দেখা যায়— হাসপাতালের যন্ত্রপাতি, জাদুঘরের তথ্যকেন্দ্রে, ব্যাংকের এটিএম বুথে। তবে সবচেয়ে সফলভাবে এর প্রয়োগ হল আইফোনে।
এপল এর আইফোনের টাচ স্ক্রিন যেভাবে কাজ করে
কিভাবে টাচ স্ক্রিন কাজ করে?
টাচ স্ক্রিনের মনিটর অনেকটা সাধারণ এলসিডি মনিটরের মতোই। তবে এতে বিশেষ ধরনের পরিবাহী অংশ থাকে। যখন টাচ স্ক্রিনে আঙুল দিয়ে চাপ দেয়া হয়, তখন এর রোধের পরিবর্তন হয়। এই রোধের পরিবর্তন পরিমাপ করে টাচস্ক্রিন বুঝতে পারে আপনি স্ক্রিনের কোন অংশে চাপ দিয়েছেন। কিছু কিছু টাচ স্ক্রিন রোধের পরিবর্তে ক্যাপাসিটরের পরিবর্তন পরিমাপ করে। আইফোনে একটি স্তরের পরিবর্তে দুটি স্তর ব্যবহার করে একে মাল্টি টাচ সিস্টেম বলে। আইফোনে বিশেষ প্রসেসর রয়েছে, যা আরও সূক্ষ্মভাবে নির্ণয় করতে পারে কোন জায়গাটি ব্যবহারকারী স্পর্শ করতে চাচ্ছেন।
একটি লাইব্রেরিতে টাচ স্ক্রিনের ব্যবহার
হাসপাতালে টাচস্ক্রিনের ব্যবহার
বর্তমানে ব্যবহৃত কিছু টাচ স্ক্রিনের পণ্য — ঘড়িতে টাচ স্ক্রিনের ব্যবহার
জাপানের একটি রেস্টুরেন্টে টাচ স্ক্রিনের মাধ্যমে খাবার অর্ডার নেয়া হচ্ছে
টাচ স্ক্রিনের ব্যবহার
টাচস্ক্রিন ব্যবহার করার ফলে কিবোর্ড ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে বয়স্ক লোকজন কিবোর্ড ব্যবহার করতে চান না। তাদের জন্য ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যমান কোনো কিছু দিয়ে চাপ দিয়ে তথ্য দেখা সহজ। আর তাই দেখা গেছে আইফোন বয়স্ক লোকজনও স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারছেন। অনেক সময় দ্রুত কাজ করবার জন্য কিবোর্ডের থেকে টাচ স্ক্রিনে দ্রুততার সাথে কাজ করা যায়। তাই বর্তমানে রেস্টুরেন্টে টাচ স্ক্রিনের মাধ্যমে খাবার অর্ডার নেয়া হচ্ছে। খাবারটি দেখে তাতে চাপ দিয়ে অর্ডার দেয়াটি অনেক সহজ। আমি জাপানে কিছু রেস্টুরেন্টে এমন দেখেছি। বিদেশে ম্যাকডোনাল্ডে দেখে থাকবেন, তারা টাচ স্ক্রিনের মাধ্যমে খাবার অর্ডার গ্রহণ করে। কেননা এতে ভুল কম হয় এবং সাধারণ কিবোর্ডের থেকে এটি দিয়ে দ্রুত অর্ডার দেয়া সম্ভব হয়।
টাচ স্ক্রিনের মাধ্যমে শিশুরা পড়াশোনা করছে
বাংলাদেশ ও টাচ স্ক্রিন
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে যারা অশিক্ষিত, যাদের পক্ষে ইংরেজিতে টাইপ করা সম্ভব হবে না, তাদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেবার জন্য টাচ স্ক্রিন ব্যবহার করে সুফল পাওয়া যেতে পারে। কৃষি, স্বাস্থ্য ও সরকারি তথ্য অশিক্ষিত জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য টাচ স্ক্রিন ভূমিকা রাখতে পারে।

Leave a comment