আমরা সবাই জানি, কম্পিউটার শুধু দুটো সংখ্যা বোঝে—শূন্য (0) আর এক (1)। আমাদের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে নাসার সুপার কম্পিউটার পর্যন্ত সবকিছুই এই বাইনারি (Binary) সিস্টেমের ওপর ভিত্তি করে চলে। কিন্তু যদি বলি, কম্পিউটারের এই ভিত্তিটা আসলে একটা ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা? আর এর চেয়েও কার্যকর একটা পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে, যা আবার নতুন করে ফিরে আসছে আমাদের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে? গল্পটা তাহলে শুরু করা যাক। এক সোভিয়েত বিজ্ঞানীর স্বপ্ন: সেটুন (Setun) গল্পের শুরু ১৯৫০-এর দশকে, সোভিয়েত ইউনিয়নে। আমেরিকা তখন আইবিএম (IBM)-এর মতো কোম্পানির হাত ধরে বাইনারি কম্পিউটার তৈরিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, সোভিয়েতদের তৈরি কম্পিউটারগুলো ছিল বিশাল, অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রায় হাতে তৈরি। মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন ইঞ্জিনিয়ার নিকোলাই ব্রুসেনসভ (Nikolai Brusenov) এই সীমাবদ্ধতা দেখে হতাশ ছিলেন। তিনি এমন একটি কম্পিউটার তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা হবে সস্তা, সহজলভ্য এবং ছাত্রছাত্রীদের নাগালের মধ্যে। অনেক গবেষণার পর তিনি গণিতবিদ সের্গেই সোবোলেভ (Sergey Sobolev)-এর সাথে পরিচিত হন, যিনি তাকে টারনারি (Ternary) গণিতের জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। বাইনারিতে যেখানে শুধু দুটি অবস্থা (বন্ধ/চালু বা 0/1) থাকে, টারনারি সিস্টেমে থাকে তিনটি অবস্থা: -১ (নেতিবাচক), ০ (শূন্য বা বন্ধ), এবং +১ (ইতিবাচক)। ব্রুসেনসভ বুঝতে পারলেন, বাইনারি সিস্টেম জনপ্রিয় হয়েছিল কারণ তখনকার দিনের ভ্যাকুয়াম টিউব বা রিলের মতো যন্ত্রগুলোর কেবল দুটি অবস্থাই ছিল—অন এবং অফ। কিন্তু এটা কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম ছিল না। তিনি ভাবলেন, তিনটি অবস্থা ব্যবহার করলে তো আরও বেশি তথ্য একবারে পাঠানো সম্ভব! এই ধারণা থেকেই ১৯৫৮ সালে জন্ম নেয় পৃথিবীর প্রথম টারনারি কম্পিউটার—সেটুন (Setun)। ঐতিহাসিক সেটুন কম্পিউটার, যা বাইনারি জগতের বাইরে সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। কতটা কার্যকর ছিল সেটুন? সেটুন ছিল তার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। পরিসংখ্যানগুলো চমকে দেওয়ার মতো:
- একটি সাধারণ বাইনারি মেশিনের তুলনায় এতে প্রায় ৩০% কম যন্ত্রাংশ লাগত।
- এটি তখনকার বাইনারি কম্পিউটারের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ সস্তা ছিল।
- তিনটি অবস্থা থাকার কারণে এর তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা ছিল অনেক বেশি। ডেটা পরিবহনের জন্য কম তার লাগত, যা সার্কিটকে আরও ছোট ও কার্যকর করে তুলেছিল। কিন্তু এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেটুন হারিয়ে গেল। কারণটা প্রযুক্তিগত ছিল না, ছিল পারিপার্শ্বিক। পুরো বিশ্ব তখন বাইনারি ইকোসিস্টেম—মেমোরি, ট্রানজিস্টর, সফটওয়্যার—তৈরির পেছনে বিনিয়োগ করে ফেলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নেরও এই নতুন প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা অবকাঠামো ছিল না। ফলে, কম্পিউটিং জগতের এই বিস্মৃত নায়ক নীরবে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যায়। টারনারি কম্পিউটারের প্রত্যাবর্তন: কেন এখন এটি গুরুত্বপূর্ণ? ৭০ বছর পর, আমরা আবার সেই একই দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেশিন লার্নিং আর বিগ ডেটার যুগে বাইনারি সিস্টেম তার ক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে। বড় বড় ডেটা সেন্টারগুলো শহর সমান বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, যা আমাদের পরিবেশের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। ঠিক এই সময়েই প্রযুক্তি বিশ্ব আবার টারনারি কম্পিউটারের দিকে ঝুঁকছে। সম্প্রতি, প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে (Huawei) ৭-ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে তৈরি একটি টারনারি চিপের পেটেন্ট প্রকাশ করেছে, যা প্রযুক্তি জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই চিপ বাইনারি চিপের তুলনায়:
- ৪০% কম যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে।
- ৬০% কম শক্তি খরচ করে।
- ২০% দ্রুত কাজ করে। কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি? ব্যাপারটা সহজভাবে বোঝার জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। কম্পিউটারের মূল চালিকাশক্তি হলো ট্রানজিস্টর (Transistor), যা একটি সুইচ হিসেবে কাজ করে।
- বাইনারি ট্রানজিস্টর: এর একটি মাত্র “ধৈর্যের বাঁধ” (Threshold) থাকে। ভোল্টেজ এই বাঁধ অতিক্রম করলে এটি ‘অন’ (1) হয়, আর না করলে ‘অফ’ (0) থাকে।
- টারনারি ট্রানজিস্টর: এর দুটি “ধৈর্যের বাঁধ” থাকে। যখন ভোল্টেজ প্রথম বাঁধ অতিক্রম করে, তখন এটি একটি অবস্থা (+1) দেখায়। যখন দ্বিতীয় বাঁধও অতিক্রম করে, তখন এটি আরেকটি অবস্থা দেখায়। আর কোনো বাঁধ অতিক্রম না করলে এটি তৃতীয় অবস্থায় (0 বা -1) থাকে। এই ছোট্ট পার্থক্যের কারণেই একটি টারনারি বিট, যাকে বলা হয় “ট্রিট” (Trit), একটি বাইনারি “বিট” (Bit)-এর চেয়ে প্রায় ১.৫৮ গুণ বেশি তথ্য ধারণ করতে পারে (\log_2 3 \approx 1.585)। এর ফলে চিপের ডিজাইন আরও কার্যকর হয় এবং ডেটা প্রসেসিং অনেক দ্রুত হয়। ভবিষ্যতের পথ: গ্রাফিন ও কার্বন ন্যানোটিউব টারনারি কম্পিউটিংয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো “নয়েজ” (Noise) বা হস্তক্ষেপ। যেহেতু তিনটি সূক্ষ্ম অবস্থার মধ্যে পার্থক্য করতে হয়, তাই সামান্য বৈদ্যুতিক হস্তক্ষেপও গণনায় ভুল করতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা এরও সমাধান খুঁজে বের করার পথে। ভবিষ্যতের সেমিকন্ডাক্টর হিসেবে পরিচিত গ্রাফিন (Graphene) এবং কার্বন ন্যানোটিউব (Carbon Nanotube) এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। কার্বন ন্যানোটিউব হলো গ্রাফিনের পাতলা স্তরকে মুড়িয়ে তৈরি করা একটি নলের মতো গঠন, যা কয়েক ন্যানোমিটার চওড়া। এর বিশেষত্ব হলো, এর ব্যাস পরিবর্তন করে খুব সহজেই তিনটি আলাদা লজিক লেভেল তৈরি করা যায়, যা টারনারি লজিকের জন্য একদম আদর্শ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বন ন্যানোটিউব দিয়ে তৈরি টারনারি চিপ একই ধরনের এআই (AI) অপারেশনে বাইনারি চিপের তুলনায় ৪৫% কম জায়গা এবং ৩০% কম শক্তি ব্যবহার করে।
- শেষ কথা তাহলে কি টারনারি কম্পিউটিং বাইনারিকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে? সম্ভবত না। বাইনারি সিস্টেম আমাদের প্রযুক্তিগত সভ্যতার গভীরে প্রোথিত। তবে যেখানে সর্বোচ্চ দক্ষতা এবং কম শক্তি খরচ প্রয়োজন—যেমন এআই মডেল প্রশিক্ষণ, মহাকাশ গবেষণা বা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং—সেখানে টারনারি চিপ এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। সেটুনের গল্প আমাদের শেখায়, সবচেয়ে ভালো প্রযুক্তিটিও ভুল সময়ে এলে হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু একটি দারুণ ধারণা কখনো পুরোপুরি মরে যায় না। সঠিক সময়ে, সঠিক প্রয়োজনে তা আবার ফিরে আসে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে টারনারি কম্পিউটিং হয়তো সেই বিস্মৃত নায়ক, যার প্রত্যাবর্তনের জন্য আমরা অপেক্ষা করছিলাম। কে জানে, হয়তো বাংলাদেশের কোনো তরুণ গবেষকের হাত ধরেই আসবে এই প্রযুক্তির পরবর্তী যুগান্তকারী আবিষ্কার।
Leave a comment