কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতথ্যপ্রযুক্তিসাধারণ বিজ্ঞান

এআই কি গ্রাহকসেবা উন্নত করছে, নাকি আস্থার অদৃশ্য সংকট তৈরি করছে?

Share
Share

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাএআইএখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়; এটি বর্তমান কর্পোরেট বাস্তবতা। ব্যাংক, টেলিকম, হোটেল, হাসপাতাল, ই-কমার্স, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাপ্রায় সব সেবা খাতেই এআই ঢুকে পড়েছে। কোথাও এআই গ্রাহকের প্রশ্নের দ্রুত উত্তর দিচ্ছে, কোথাও ঋণ অনুমোদনে সহায়তা করছে, কোথাও চাকরির আবেদন বাছাই করছে, কোথাও চিকিৎসকের সিদ্ধান্তকে সহায়তা করছে। কর্পোরেট ভাষায় এর উদ্দেশ্য হলো কাজের গতি বাড়ানো, খরচ কমানো, সেবা ব্যক্তিকরণ করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও তথ্যভিত্তিক করা। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলোএআই কি সত্যিই গ্রাহক, কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য মূল্য তৈরি করছে, নাকি অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্যভাবে মূল্য ধ্বংস করছে?

সম্প্রতি প্রকাশিতম্যানেজমেন্ট ডিসিশনজার্নালের “সেবা শিল্পে এআই: ভ্যালু কো-ক্রিয়েশন ও কো-ডেস্ট্রাকশনের মধ্যে ভারসাম্য” শীর্ষক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, এআইভিত্তিক সেবায় মূল্য সবসময় একরকম হয় না। কখনো এআই গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানের জন্য যৌথভাবে মূল্য সৃষ্টি করে, কখনো মূল্য ধ্বংস করে, কখনো শুধু নিয়মমাফিক কাজ চালায়, আবার কখনো কোনো বাস্তব মূল্যই তৈরি করে না। প্রবন্ধটি চারটি অবস্থা চিহ্নিত করেছে, ভ্যালু কো-ক্রিয়েশন, ভ্যালু কো-ডেস্ট্রাকশন, ভ্যালু নো-ক্রিয়েশনএবংভ্যালু কমপ্লায়েন্স।এগুলো নির্ভর করে মানুষ ও এআইএর মধ্যে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কীভাবে ভাগ হচ্ছে এবং কাজের পদ্ধতি, বোঝাপড়া ও সম্পৃক্ততা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে তার ওপর।

এআই শুধু প্রযুক্তি নয়, এটি সিদ্ধান্তের অংশীদার। কর্পোরেট সেক্টরের একটি বড় ভুল হলো এআইকে শুধু একটি সফটওয়্যার বা টুল হিসেবে দেখা। বাস্তবে এআই যখন গ্রাহকের অভিযোগের উত্তর দেয়, চাকরির আবেদন বাছাই করে, ব্যাংকিং পরামর্শ দেয় বা চিকিৎসাসংক্রান্ত সুপারিশ করে, তখন এটি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ এআই শুধু কাজ করে না; এটি মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত, আস্থা ও অভিজ্ঞতাকেও প্রভাবিত করে।

এখানেই সমস্যা শুরু হয়। যখন এআইএর সিদ্ধান্ত মানুষ বুঝতে পারে না, প্রশ্ন করতে পারে না, বা যাচাই করতে পারে না, তখন কাজের গতি বাড়লেও আস্থা কমে যায়। একটি চ্যাটবট দ্রুত উত্তর দিতে পারে, কিন্তু যদি সে গ্রাহকের প্রকৃত সমস্যা বুঝতে না পারে, তাহলে দ্রুততা গ্রাহকের বিরক্তি বাড়ায়। একটি রিক্রুটমেন্ট এআই হাজার হাজার জীবনবৃত্তান্ত দ্রুত স্ক্রিন করতে পারে, কিন্তু যদি তার ট্রেনিং ডেটায় পক্ষপাত থাকে, তাহলে যোগ্য প্রার্থী বাদ পড়তে পারে। তখন এআই মূল্য তৈরি করে না; বরং ন্যায়বিচার, আস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করে।

প্রথম সমস্যাঅটোমেশন বনাম মানবিক বিচারবোধ। এআই ব্যবহারের প্রথম দ্বন্দ্ব হলোঅটোমেশনঅগমেন্টেশন। প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এআই ব্যবহার করে খরচ কমাতে, সময় বাঁচাতে এবং একই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে। এটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু সব কাজ অটোমেশনের জন্য উপযুক্ত নয়। কিছু কাজের জন্য মানবিক বিচার, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা দরকার।

ধরা যাক, একটি ব্যাংকের চ্যাটবট গ্রাহকের ব্যালেন্স জানাচ্ছে বা লেনদেনের ইতিহাস দেখাচ্ছে। এখানে অটোমেশন কার্যকর। কিন্তু একই এআই যদি ঋণসংক্রান্ত পরামর্শ দেয় বা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে, তখন শুধু অ্যালগরিদম যথেষ্ট নয়। সেখানে গ্রাহকের আর্থিক অবস্থা, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা, পারিবারিক দায়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাএসব বিষয় বোঝা জরুরি।কর্পোরেট শিক্ষা হলোসব সেবা এআই দিয়ে রিপ্লেস করা যাবে না। কিছু সেবা এআই দিয়ে সাপোর্ট করতে হবে। এআই যেন মানুষকে বাদ না দেয়; বরং মানুষকে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

দ্বিতীয় সমস্যাস্বচ্ছতা না থাকলে এআই আস্থার সংকট তৈরি করে। এআইএর দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলোট্রান্সপারেন্সিঅপাসিটি। অনেক এআই সিস্টেম খুব জটিল। এটি কীভাবে সিদ্ধান্ত দিল, কেন একটি প্রার্থীকে বাদ দিল, কেন একটি গ্রাহকের আবেদন বাতিল হলোএসব অনেক সময় পরিষ্কার নয়। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান হয়তো বলবে, “সিস্টেম রিকমেন্ডেশন দিয়েছে।” কিন্তু গ্রাহক বা কর্মী প্রশ্ন করবে“কেন?”

বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরের জন্য এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ব্যাংক, টেলিকম, বীমা, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাসব জায়গায় এআই বা অ্যালগরিদমিক ফিল্টারিং বাড়ছে। কিন্তু যদি কোনো গ্রাহক জানতে না পারে কেন তার ঋণ আবেদন বাতিল হলো, বা কোনো চাকরিপ্রার্থী বুঝতে না পারে কেন সে শর্টলিস্ট হলো না, তাহলে এআই প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত করলেও সমাজে অন্যায্যতার ধারণা তৈরি করবে।

তৃতীয় সমস্যাপারসোনালাইজেশন করতে গিয়ে গ্রাহককে অস্বস্তিতে ফেলা। এআইএর আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি হলোপারসোনালাইজেশন। গ্রাহক কী পছন্দ করে, কখন কেনাকাটা করে, কী ধরনের সেবা চায়এসব ডেটা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান কাস্টমাইজড সেবা দিতে পারে। কিন্তু পারসোনালাইজেশনের সীমা আছে। অতিরিক্ত পারসোনালাইজেশন গ্রাহকের কাছে নজরদারি বা ম্যানিপুলেশন মনে হতে পারে।

একটি উদাহরণ ধরা যাক। একজন গ্রাহক কোনো ব্যাংকের অ্যাপে বারবার সেভিংস পণ্য দেখছেন। এআই তাকে সেভিংস প্ল্যান সাজেস্ট করলে সেটি সহায়ক। কিন্তু একই গ্রাহক যদি প্রতিদিন পুশ নোটিফিকেশন, ঋণ অফার, বিনিয়োগ অ্যালার্ট পেতে থাকে, তখন সে ভাবতে পারে“আমার ওপর নজর রাখা হচ্ছে?” তখন পারসোনালাইজেশন গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর না করে বিরক্তি তৈরি করে।কর্পোরেট শিক্ষা হলোপারসোনালাইজেশন মানে শুধু ডেটা ব্যবহার নয়; পারসোনালাইজেশন মানে প্রাসঙ্গিক, সম্মানজনক ও সীমাবদ্ধ গ্রাহক বোঝাপড়া।

চতুর্থ সমস্যাএআই কতটা স্বাধীন হবে, আর মানুষ কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখবে?এআই ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গভর্ন্যান্স প্রশ্ন হলোঅটোনমিকন্ট্রোল।এআইকে কতটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে? কোন পর্যায়ে মানব অনুমোদন লাগবে? ভুল সিদ্ধান্ত হলে দায় কারএআই ভেন্ডর, প্রতিষ্ঠান, নাকি ফ্রন্টলাইন কর্মী?কল সেন্টার, ব্যাংকিং, হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, বীমা দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, চাকরির আবেদন বাছাইএসব ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের আগে স্পষ্ট করতে হবে। কোন সিদ্ধান্ত এআই নেবে, কোন সিদ্ধান্ত মানুষ নেবে, কোথায় আপিল করার সুযোগ থাকবে, এবং ভুল হলে দায় কার হবে।

সমাধানকর্পোরেট এআই ব্যবস্থাপনার পাঁচটি বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, এআই ব্যবহারের আগে সার্ভিস রিস্ক ম্যাপিং করতে হবে। কোন সেবা রুটিন, কোন সেবা সংবেদনশীল, কোন সেবা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণএগুলো আলাদা করতে হবে। ব্যালেন্স জানানো চ্যাটবট দিয়ে করা যায়; কিন্তু ঋণ বাতিল, চিকিৎসা পরামর্শ, কর্মী ছাঁটাই বা চাকরির আবেদন বাছাইয়ের মতো ক্ষেত্রে মানব তদারকি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

দ্বিতীয়ত, এক্সপ্লেইনেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে। গ্রাহক, কর্মী বা ম্যানেজার যেন বুঝতে পারে এআই কেন একটি সুপারিশ দিয়েছে। “সিস্টেম বাতিল করেছে”এটি কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নয়। ব্যাখ্যাযোগ্য এআই না থাকলে আস্থা তৈরি হবে না।

তৃতীয়ত, হিউম্যান ওভাররাইড এবং আপিল মেকানিজম রাখতে হবে। এআই ভুল করতে পারে। ডেটা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। বাস্তব পরিস্থিতি মিস হতে পারে। তাই গ্রাহক বা কর্মী যেন মানব পর্যালোচনা চাইতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক, বীমা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি সেবায় এটি অত্যন্ত জরুরি।

চতুর্থত, এআই প্যারাডক্স অডিট চালু করতে হবে। শুধু আইটি অডিট যথেষ্ট নয়। নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবেঅটোমেশন কি মানবিক বিচারবোধ কমিয়ে দিচ্ছে? পারসোনালাইজেশন কি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভাঙছে? স্বচ্ছতা কি যথেষ্ট? এআই অটোনমি কি জবাবদিহি দুর্বল করছে?

পঞ্চমত, কর্মীদের এআই লিটারেসি বাড়াতে হবে। কর্মী যদি এআই বুঝতে না পারে, তাহলে তারা হয় অন্ধভাবে এআই অনুসরণ করবে, নয়তো এআই এড়িয়ে চলবে। দুই অবস্থাই ঝুঁকিপূর্ণ। কর্মীদের শেখাতে হবে কীভাবে এআই আউটপুট যাচাই করতে হয়, কখন প্রশ্ন করতে হয়, কখন ওভাররাইড করতে হয় এবং কীভাবে গ্রাহককে ব্যাখ্যা দিতে হয়।

শেষ কথাএআই দিয়ে সেবা উন্নত হবে, যদি মানুষকে বাদ না দেওয়া হয়। কর্পোরেট সেক্টরে এআইএর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত নয়। এআই যদি গ্রাহকসেবাকে দ্রুত, সহজ, ন্যায়সঙ্গত ও ব্যক্তিকৃত করেতাহলে এটি ভ্যালু কো-ক্রিয়েশন। কিন্তু এআই যদি গ্রাহককে অদৃশ্য অ্যালগরিদমের সামনে অসহায় করে, কর্মীর বিচারবোধ কমিয়ে দেয়, পক্ষপাত বাড়ায় বা জবাবদিহি অস্পষ্ট করেতাহলে এটি ভ্যালু কো-ডেস্ট্রাকশন।

তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়“আমরা এআই ব্যবহার করছি কি না?”প্রশ্নটি হওয়া উচিত“আমাদের এআই কি মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের জন্য সত্যিকারের মূল্য তৈরি করছে, নাকি শুধু কাজের গতি বাড়ানোর আড়ালে আস্থা ও ন্যায়বোধ ক্ষয় করছে?”

এআইকে কর্পোরেট সাফল্যের হাতিয়ার বানাতে হলে প্রযুক্তির পাশাপাশি দরকার নৈতিকতা, গভর্ন্যান্স, স্বচ্ছতা এবং মানবিক বিচারবোধ। কারণ সেবা খাতে শেষ পর্যন্ত গ্রাহক রোবটের সঙ্গে নয়, একটি প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। আর সেই মূল্যবোধ যদি এআই ব্যবস্থার ভেতরে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে উন্নত প্রযুক্তিও দুর্বল সেবা অভিজ্ঞতা তৈরি করবে।

ড. মোর্ত্তুজা আহমেদ

সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
Email: [email protected]

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org