বন মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে উঁচু গাছের সারি, পাখির কিচিরমিচির আর গভীর সবুজের সমারোহ। কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে বনের ভেতরে আরও এক জগত কাজ করে—ছোট ছোট জলপ্রবাহ, অস্থায়ী খাল বা বর্ষাকালে তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র নালার মতো জলধারা। ড. কাজী হোসেনের গবেষণা অভিজ্ঞতা দেখায়, এই ছোট জলপ্রবাহগুলো বন ইকোসিস্টেমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অথচ নীতিনির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনায় এগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
অনেক বনভূমিতে বর্ষার সময় ছোট ছোট নালা বা চ্যানেলে পানি প্রবাহিত হয়, যা শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায়। এগুলোকে অনেক সময় অস্থায়ী জলপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয় এবং স্থায়ী নদী বা খালের মতো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কিন্তু বাস্তবে এই জলধারাগুলো বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। মাছের বংশবিস্তার, উভচর প্রাণীর জীবনচক্র এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে এই জলপ্রবাহ কাজ করে। ফলে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো ইকোসিস্টেমে প্রভাব পড়ে।
ড. কাজী হোসেন বলেন, বন ব্যবস্থাপনায় বড় বড় নদী বা জলাশয়ের দিকে নজর দেওয়া হলেও এই ক্ষুদ্র জলপ্রবাহগুলো প্রায়ই নজর এড়িয়ে যায়। কিন্তু সড়ক নির্মাণ, কাঠ আহরণ বা অবকাঠামো উন্নয়নের সময় যদি এই ছোট জলধারাগুলো কেটে ফেলা হয় বা ভরাট করা হয়, তবে মাছের আবাসস্থল ও জলপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো বনভূমির জলচক্রে পড়ে।
আধুনিক প্রযুক্তি এই ছোট জলপ্রবাহ শনাক্ত করতে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। রিমোট সেন্সিং ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে উপগ্রহচিত্র থেকে ক্ষুদ্র জলধারা শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। প্রশিক্ষণ দেওয়া কম্পিউটার মডেল অস্থায়ী জলপ্রবাহের চিহ্ন আলাদা করে ধরতে পারে। এতে বন ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনায় আগে থেকে সংবেদনশীল এলাকাগুলো চিহ্নিত করা যায় এবং সেখানে কাজ সীমিত রাখা সম্ভব হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি বনাঞ্চল বা সুন্দরবনের ভেতরের অসংখ্য খাল ও নালার ওপর স্থানীয় জীববৈচিত্র্য নির্ভরশীল। এসব ছোট জলপ্রবাহ রক্ষা না করলে কেবল মাছ বা উভচর প্রাণীই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; স্থানীয় মানুষের জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়ে। ড. কাজী হোসেনের মতে, বন সংরক্ষণ মানে শুধু গাছ বাঁচানো নয়; এর সঙ্গে যুক্ত সব জলপ্রবাহ ও প্রাণীজগতকেও রক্ষা করা।
এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবেশ সংরক্ষণে বড় কাঠামোর পাশাপাশি ছোট উপাদানগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ছোট জলপ্রবাহের সুরক্ষা মানে পুরো বন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষা। এই উপলব্ধি নীতিনির্ধারণে যুক্ত করতে পারলে বন ব্যবস্থাপনা আরও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই হতে পারে।
এই আলোচনার বিস্তারিত জানতে পাঠকরা biggani.org–এ প্রকাশিত ড. কাজী হোসেনের পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখতে পারেন।:

Leave a comment