তোফাজ্জল ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিন, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি।
প্রতি বছর ১২ মে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ স্বাস্থ্য দিবস’ পালিত হয়। এ বছরের মূল প্রতিপাদ্য— “খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির জন্য উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা “। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য অক্সিজেনের ৯৮ শতাংশ এবং খাদ্যের ৮০ শতাংশ যোগান দেয় উদ্ভিদ। অথচ প্রতি বছর রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এই বিপুল ক্ষতি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এক বিশাল হুমকি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির মুখে থাকা দেশের জন্য উদ্ভিদ স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। এ নিবন্ধে আমি উদ্ভিদের সম্ভাব্য জীবনিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো এবং কিছু ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের উদাহরণ বিশ্লেষণ করব। একইসাথে, বাংলাদেশ ও বিশ্ব প্রেক্ষাপটে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির মান বজায় রাখতে জীবনিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমার মতামত তুলে ধরব।
ইতিহাসে আন্তঃমহাদেশীয় ভয়াবহ রোগের বিস্তার
উদ্ভিদ স্বাস্থ্যের প্রতি সামান্য অবহেলা বা গাফিলতি মানবসভ্যতায় কতটা ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক বিপর্যয়ের জন্ম দিতে পারে, ইতিহাসের পাতায় তার সবচেয়ে করুণ সাক্ষী আয়ারল্যান্ডের ‘আলুর মড়ক’ (Potato Late Blight)। ১৮৪৫ থেকে ১৮৫২ সাল—দীর্ঘ এই সাত বছর আয়ারল্যান্ডের বুকে নেমে এসেছিল এক অবর্ণনীয় অন্ধকার। মেক্সিকো থেকে আমদানি করা বীজ আলুর হাত ধরে দেশটিতে চুপিচুপি প্রবেশ করেছিল ‘ফাইটোপথোরা ইনফেসট্যান্স’ (Phytophthora infestans) নামক এক ঘাতক প্যাথোজেন বা অণুজীব।
সে সময় আইরিশদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন ও মূল খাদ্য ছিল আলু। কিন্তু এই অদৃশ্য ঘাতকের আগ্রাসনে চোখের পলকেই কৃষকের দিগন্তজোড়া সবুজ ফসলের মাঠ পরিণত হয়েছিল পচা, দুর্গন্ধযুক্ত এক বিরানভূমিতে। কৃষকের গোলা শূন্য হয়ে যায়, ঘরে ঘরে শুরু হয় ক্ষুধার তীব্র হাহাকার। ইতিহাসের এই মহাদুর্ভিক্ষের (Great Irish Potato Famine) নির্মম থাবায় অনাহার আর মহামারীতে ধুঁকে ধুঁকে প্রাণ হারায় প্রায় দশ লাখ মানুষ। এখানেই শেষ নয় । কেবল এক মুঠো খাবারের আশায়, একটুখানি বাঁচার তাগিদে আরও প্রায় ১৫ লাখ মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি আর প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে চিরতরে দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়।
দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় আগের সেই বুকচেরা আর্তনাদ আর দেশত্যাগের হাহাকার আজও যেন আমাদের এক কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে যায়। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—সীমান্তে যদি কঠোর সংগনিরোধ বা কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা না থাকে, তবে একটিমাত্র বিদেশি জীবাণুর অনুপ্রবেশ কীভাবে নিমিষেই একটি জাতির অস্তিত্ব, অর্থনীতি ও জনমিতিকে চিরকালের মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দিতে পারে।
বাংলাদেশে গমের ব্লাস্ট রোগ, ফল আর্মিওয়ার্ম ও জীবনিরাপত্তার চরম মূল্য
আধুনিক যুগেও আমরা কীভাবে এক নীরব মহামারীর শিকার হতে পারি, তার এক জ্বলন্ত ও বেদনাবিধুর উদাহরণ ২০১৬ সালের গমের ব্লাস্ট (Wheat Blast) ট্র্যাজেডি। ১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে প্রথম শনাক্ত হওয়া এই রোগটি যখন ২০১৬ সালে ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গমের চালানের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তখন আমাদের উদ্ভিদ সংগনিরোধ (Quarantine) বিভাগ ঘুণাক্ষরেও তা টের পায়নি। বন্দর কর্তৃপক্ষের সেই কাঠামোগত ব্যর্থতার চরম মূল্য চুকাতে হয়েছিল এদেশের খেটে খাওয়া নিরীহ কৃষকদের। চোখের সামনে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশের আটটি জেলার প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির সোনালি গমের খেত বিবর্ণ হয়ে যায়। ফলন বিপর্যয় ঘটে শতভাগ। কৃষকের স্বপ্ন আর ঘাম মিশে থাকা মাঠগুলো নিমেষেই পরিণত হয়েছিল এক বিরানভূমিতে, যা বিশ্ববাসীর সামনে আমাদের উদ্ভিদ বায়োসিকিউরিটি বা জীবনিরাপত্তা ব্যবস্থার এক করুণ ও ভঙ্গুর চিত্রই ফুটিয়ে তোলে।
বিশ্বের সর্বাধুনিক জিনোমিক্স প্রযুক্তি ব্যবহারে আমরা ঘাতক জীবাণু ‘ম্যাগনাপোর্থে ওরাইজা ট্রিটিকাম‘ এর কৌলিক চরিত্র এবং এটি কোথা থেকে এসেছিল অর্থাৎ জীবাণুর উৎপত্তিস্থল দ্রুত ও সুনিপুণভাবে নির্ণয় করি। এই ঘাতক ছত্রাকটি আজ কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক ভয়ংকর অশনিসংকেত। ভারত বা চীনের মতো বিশ্বের শীর্ষ গম উৎপাদনকারী দেশগুলোতে যদি এই মহামারী ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থায় এক অচিন্তনীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে। ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশে, যেখানে গম কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন, সেখানে এই ঘাতক ছত্রাকের বিস্তার মানেই এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে সরাসরি দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দেওয়া।
আমাদের এই দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থার কফিনে আরেকটি পেরেক ঠুকে দেয় ২০১৮ সালে অনুপ্রবেশ করা ‘ফল আর্মিওয়ার্ম’ নামক এক বিধ্বংসী পোকা। দেখতে দেখতে এই আগ্রাসী পোকাটি দেশের পোল্ট্রি ও মৎস্যশিল্পের প্রাণভোমরা ‘ভুট্টা’সহ প্রায় ৮০টিরও বেশি প্রজাতির ফসলের ওপর নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে শুরু করে। অত্যন্ত দ্রুত বংশবৃদ্ধিতে সক্ষম এই পোকার লার্ভা ফসলের মূল কাণ্ড ও ফলন সরাসরি সাবাড় করে দেয়। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, কৃষকের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এই রাক্ষুসে পোকাটি ইতিমধ্যে বাজারের প্রচলিত প্রায় সব রাসায়নিক কীটনাশকের বিরুদ্ধেই উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ ক্ষমতা (Resistance) গড়ে তুলেছে। ফলে সাধারণ বালাইনাশক ছিটিয়ে একে দমানো এখন প্রায় অসম্ভব এক লড়াই।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমাদের কৃষকরা যে দীর্ঘমেয়াদি ও অসম যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছেন, তার সূচনা হয়েছিল দেশের সীমান্ত বা বন্দরগুলোতেই। সঠিক সময়ে যদি নজরদারির মাধ্যমে এই বালাইয়ের প্রবেশ ঠেকানো যেত কিংবা শুরুতেই ‘জিনোমিক নজরদারি’র মাধ্যমে এদের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বিশ্লেষণ করা যেত, তবে হয়তো বাংলার কৃষকদের আজ এই চরম অসহায়ত্ব বরণ করতে হতো না। এই গভীর ক্ষত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কেবল ক্ষতিকর রাসায়নিকের ওপর নির্ভর করে বসে থাকার দিন শেষ। আমাদের কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে হলে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্তে নিশ্ছিদ্র বায়োসিকিউরিটি প্রোটোকল বাস্তবায়নের এখন আর কোনো বিকল্প নেই।
উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা: বৈশ্বিক সংকট ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
বিগত দশকে বিশ্বব্যাপী কৃষিপণ্যের বাণিজ্য ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে এফএও-এর মতে, রোগবালাই ও ক্ষতিকর জীবাণুর প্রকোপে প্রতিবছর প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে। ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই বিপুল পরিমাণ শস্য নষ্ট হওয়ায় শুধু বাংলাদেশেই বছরে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়, যা জাতীয় পুষ্টিহীনতা বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনের পথে বড় বাধা। ২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক খাদ্যের চাহিদা ৬০ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার বিপরীতে বাংলাদেশকে তার ২৩০-২৫০ মিলিয়ন মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে মরু পঙ্গপালের মতো ক্ষতিকর বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক বন্দরে উদ্ভিদের সুরক্ষায় ‘বর্ডার কন্ট্রোল’ বা শক্তিশালী জীবনিরাপত্তা ব্যবস্থা অপরিহার্য। তবে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের কোয়ারেন্টাইন বা উদ্ভিদ সংগনিরোধ ব্যবস্থা এখনও অত্যন্ত দুর্বল। আধুনিক মলিকুলার ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তির বদলে মান্ধাতার আমলের চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করায় অনেক সময় ক্ষতিকর অদৃশ্য প্যাথোজেন শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। মূলত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উন্নত নজরদারির এই অভাবেই বাংলাদেশে গমের ব্লাস্টের মতো বিধ্বংসী রোগের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।
ওয়ান হেলথ’ কাঠামোতে উদ্ভিদ স্বাস্থ্য ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা
মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য পরস্পর নির্ভরশীল হলেও ‘ওয়ান হেলথ’ কাঠামোর মূল ভিত্তি হলো উদ্ভিদ। কারণ মানুষ ও অন্যান্য জীবের খাদ্যের ৮০ এবং অক্সিজেনের ৯৮ শতাংশই আসে উদ্ভিদ থেকে। উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তার অভাবে যখন গম ব্লাস্ট বা আলুর মড়কের মতো মহামারী দেখা দেয়, তখন তা শুধু ফসলই ধ্বংস করে না; বরং মারাত্মক খাদ্য ও পুষ্টি সংকট তৈরির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যকেও হুমকির মুখে ফেলে। এছাড়া রোগ দমনে রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহার ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ বাড়িয়ে মানবস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। তাই উদ্ভিদ স্বাস্থ্যকে জাতীয় নিরাপত্তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া অপরিহার্য।
এই লক্ষ্য অর্জনে জনস্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও উদ্ভিদ সংগনিরোধ বিভাগের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এর অধীনে আন্তর্জাতিক প্রবেশপথগুলোতে জিনোমিক নজরদারি বৃদ্ধি, তাৎক্ষণিক রোগ শনাক্তকরণ কিটের (Point-of-care) ব্যবহার এবং জলবায়ু-সহিষ্ণু বীজের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। উদ্ভিদ স্বাস্থ্যকে ‘ওয়ান হেলথ’ মডেলে যুক্ত করলে পরিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষিত থাকে, যা পরোক্ষভাবে জুনোটিক (প্রাণীজাত) রোগের প্রাদুর্ভাব কমায়। বস্তুত, সুস্থ উদ্ভিদ ছাড়া প্রাণী ও মানুষের জন্য একটি নিরাপদ ও রোগমুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা: দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ
বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণের পথে ক্ষতিকর বালাই ও রোগজীবাণু বর্তমানে চরম জীবনিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে, ভুট্টার ‘ফল আর্মিওয়ার্ম’ এবং আফ্রিকা ও এশিয়ার কৃষিব্যবস্থায় ‘মরু পঙ্গপাল’ দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সবচেয়ে মারাত্মক কোয়ারেন্টাইন ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে গমের ‘হুইট ব্লাস্ট’ ছত্রাক, নারিকেলের রুগোজ স্পাইরালিং সাদামাছি পোকা এবং টমেটোর বিধ্বংসী লিফমাইনার পোকা ‘টুটা অ্যাবসোলুটা’ ।
ক্ষতিকর পোকামাকড়ের মধ্যে ফলের মাছি, গুদামজাত শস্যের খাপরা বিটল এবং নারিকেল ও খেজুর গাছের ‘রেড পাম উইভিল’ অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে গমের উগান্ডা ৯৯ (Ug99) রাস্ট রোগ, এবং কলার ফিউজারিয়াম উইল্ট (TR4) বিশ্বজুড়ে কৃষকদের গভীর উদ্বেগের কারণ। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আসিয়ান অঞ্চলে প্ল্যান্টহপার ও কাসাভা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যেমন বাড়ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কনটেইনারের মাধ্যমে ‘ব্রাউন মারমোরটেড স্টিঙ্ক বাগ’-এর মতো ‘হিচহাইকার’ (Hitchhiker) বালাইগুলো অতি দ্রুত ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করছে। এসব বালাই কেবল ফসলের ফলনই আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস করছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পথ তৈরি করে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সীমানার বাইরে ওত পেতে থাকা বেশ কিছু ধ্বংসাত্মক বালাই আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। বিশেষ করে সংরক্ষিত শস্যের শত্রু ‘খাপরা বিটল’, আলুর ‘সোনালী নেমাটোড’ এবং নারকেল শিল্পের জন্য ‘নারকেল হিসপাইন বিটল’ অন্যতম। এছাড়া গমের বিভিন্ন রোগবালাই এবং নারকেলের প্রায় ১০টি সংক্রামক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া আমাদের কৃষিতে মারাত্মক কোয়ারেন্টাইন ঝুঁকি তৈরি করছে। এই বালাইগুলো একবার প্রবেশ করলে তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব; তাই কার্যকর ‘পেস্ট রিস্ক অ্যানালাইসিস’ এবং কঠোর নজরদারিই এখন আমাদের প্রধান প্রতিরক্ষা কবচ।
উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন ২০১১-এর জরুরি হালনাগাদ ও প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন আপদ ঠেকানোর এখনই উপযুক্ত সময়। সরকারি, বেসরকারি বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিদেশ থেকে উদ্ভিদ বা এর অংশবিশেষ আমদানির ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধ্বংসাত্মক জীবাণু প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা অপরিহার্য।
উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়নে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তবে সুজলা-সুফলা বাংলদেশের বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং উন্নয়নে দেশে হালনাগাদ উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরী। উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি আন্তর্জাতিক প্রবেশপথে (স্থল, নৌ ও বিমানবন্দর) প্রচলিত ল্যাবরেটরির বদলে জিনোমিক নজরদারি ও তাৎক্ষণিক রোগ শনাক্তকরণে সক্ষম অত্যাধুনিক মলিকুলার ডায়াগনস্টিক ল্যাব বা পয়েন্ট-অফ-কেয়ার কিটের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পণ্য খালাসের পূর্বেই প্যাথোজেনের উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী প্রভাব মোকাবিলায় আধুনিক জীবপ্রযুক্তি যেমন জিনোম এডিটিং কাজে লাগিয়ে প্যাথোজেন-প্রতিরোধী নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবনে কৃষিগবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ‘সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা’ ও পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশকের প্রয়োগ এবং শস্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধির মাধ্যমে মহামারী রোধ ও টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, গম ব্লাস্ট বা ফল আর্মিওয়ার্মের মতো আপদের আন্তঃসীমান্ত বিস্তার রোধে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান ও একটি শক্তিশালী ‘আঞ্চলিক বায়োসিকিউরিটি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা অপরিহার্য। সর্বোপরি, প্রান্তিক কৃষক থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক পর্যন্ত সকল অংশীজনকে জীবনিরাপত্তার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি কৃষকদের হাতে সঠিক সময়ে মানসম্মত ও রোগমুক্ত বীজ পৌঁছে দেওয়া সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
উপসংহার
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে কৃষি কেবল একটি সাধারণ খাত নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও টিকে থাকার প্রধান রক্ষাকবচ । বর্তমানে দেশের জিডিপিতে ১১.৬ শতাংশ প্রত্যক্ষ অবদান রাখার পাশাপাশি এই খাতটি ৪৪ শতাংশেরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে ।
উদ্ভিদ স্বাস্থ্য রক্ষা করা মানে মূলত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখা । ১২ মে পালিত ‘আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ স্বাস্থ্য দিবস’ আমাদের এই সতর্কবার্তাই দেয় যে, আজ যদি আমরা উদ্ভিদের যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যতে আয়ারল্যান্ডের আলুর মড়ক কিংবা বাংলাদেশের গম ব্লাস্টের মতো আরও ভয়াবহ কোনো বিপর্যয় আমাদের দরজায় কড়া নাড়বে । দেশে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির মান নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, উদ্ভাবনী গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং কঠোর বায়োসিকিউরিটি বা জীবনিরাপত্তা প্রোটোকল বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই ।
আমাদের ফসলি জমি ও প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানকে বহিরাগত ও ধ্বংসাত্মক বালাইয়ের আক্রমণ থেকে মুক্ত রাখতে নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের এখনই সম্মিলিতভাবে কাজ শুরু করতে হবে । সর্বোপরি, একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য সুস্থ উদ্ভিদই আমাদের সবচেয়ে বড় ও একমাত্র অবলম্বন ।
ই-মেইল: [email protected]

Leave a comment