আমাদের সমাজে ‘সফলতা’ বলতে সাধারণত বোঝানো হয় ভালো চাকরি, বিদেশে উচ্চশিক্ষা, বড় কোনো পুরস্কার বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বিশেষ করে বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায় কতগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলো, কতটি পুরস্কার পাওয়া গেল কিংবা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করা হচ্ছে। কিন্তু ড. আবুল হুস্সামের দৃষ্টিতে সফলতার সংজ্ঞা ভিন্ন। তাঁর কথায়, “পুরস্কার নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনাই আসল সফলতা।” এই একটি বাক্য আমাদের সাফল্য-ভাবনার গভীরে নাড়া দেয়।
ড. হুস্সামের কর্মজীবনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা, গবেষণাকেন্দ্র পরিচালনা—এসবই প্রচলিত অর্থে সাফল্যের উদাহরণ। তবু তাঁর কাজের মূল প্রেরণা ছিল মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনা। আর্সেনিক দূষণের মতো একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে তাঁর উদ্ভাবিত সোনো ফিল্টার গ্রামের মানুষের পানির কলসে নিরাপত্তা এনে দিয়েছে। এই পরিবর্তন কোনো পদক বা সার্টিফিকেটের চেয়েও তাঁর কাছে বেশি মূল্যবান।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমাজে প্রচলিত সাফল্যের ধারণার সঙ্গে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি করে। আমরা তরুণদের সামনে প্রায়ই এমন উদাহরণ তুলে ধরি, যেখানে বড় চাকরি বা বিদেশে প্রতিষ্ঠা পাওয়াই সাফল্যের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখানো হয়। ফলে অনেকেই সমাজের সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিগত অর্জনের দিকেই বেশি মনোযোগ দেন। ড. হুস্সামের অভিজ্ঞতা দেখায়, ব্যক্তিগত অর্জন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সমাজের উপকারে আসে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—আমরা কি আমাদের গবেষণা ও উদ্ভাবনের সামাজিক প্রভাবকে সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করি? বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অনেক সময় গবেষকের মূল্যায়ন হয় প্রকাশনার সংখ্যা বা অনুদানের পরিমাণ দিয়ে। কিন্তু সেই গবেষণার ফলে মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এলো—এই প্রশ্নটি খুব কমই গুরুত্ব পায়। ড. হুস্সামের কাজ দেখিয়ে দেয়, সামাজিক প্রভাবকে যদি সাফল্যের মানদণ্ডে আনা যায়, তবে গবেষণার দিকনির্দেশনাও বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সুরক্ষা—এসব মৌলিক সমস্যার সমাধান এখনো অনেক দূরে। যদি বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকেরা নিজেদের সাফল্যকে মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে মূল্যায়ন করেন, তবে উন্নয়ন প্রক্রিয়াও আরও মানবিক ও টেকসই হয়ে উঠতে পারে।
তরুণদের জন্য এই বার্তাটি স্পষ্ট—সাফল্য মানে শুধু নিজের ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়া নয়। নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে সমাজের কোনো একটি সমস্যার সমাধানে অবদান রাখতে পারলেই সাফল্যের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায়। ড. হুস্সামের জীবন এই শিক্ষাই দেয়—মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে বড় অর্জন।
ড. আবুল হুস্সাম এর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment