গবেষণায় হাতে খড়ি

বিজ্ঞানী’র বই: ইবনে সিনার ‘কানুন ফি তিব’ ও আধুনিক মেডিসিনের ভিত্তি

Share
Share

আজকের দিনে চিকিৎসাবিজ্ঞান মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে আধুনিক হাসপাতাল, উন্নত ডায়াগনস্টিক যন্ত্র, ল্যাব রিপোর্ট ও প্রোটোকলভিত্তিক চিকিৎসা-পদ্ধতির কথা। কিন্তু এই আধুনিক মেডিসিনের ভিত গড়ে উঠেছে শত শত বছরের জ্ঞানচর্চা ও অভিজ্ঞতার ওপর। সেই ধারাবাহিক ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হলো মুসলিম দার্শনিক ও চিকিৎসাবিদ ইবনে সিনা (Avicenna) রচিত চিকিৎসাগ্রন্থ ‘কানুন ফি তিব’ (The Canon of Medicine)। মধ্যযুগের চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই বইটি ছিল এক ধরনের মানদণ্ড, যা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের চিকিৎসাশিক্ষায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাঠ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

একাদশ শতাব্দীতে রচিত ‘কানুন ফি তিব’ মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি সুবিন্যস্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। ইবনে সিনা এখানে প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসাবিদ হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের তত্ত্ব, পারস্য ও আরব অঞ্চলের চিকিৎসা-জ্ঞান এবং নিজের পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতাকে একত্র করে একটি সমন্বিত কাঠামো দাঁড় করান। রোগের কারণ নির্ণয়, উপসর্গ বিশ্লেষণ, চিকিৎসা-পদ্ধতি নির্বাচন—সবকিছুকে তিনি একটি যুক্তিনির্ভর ও শ্রেণিবদ্ধ পদ্ধতিতে সাজিয়ে উপস্থাপন করেন। আধুনিক মেডিসিনে যে “ডায়াগনোসিস–থেরাপি” ধারা দেখা যায়, তার প্রাথমিক রূপরেখা এই গ্রন্থেই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত।

‘কানুন ফি তিব’-এর অন্যতম বড় অবদান হলো রোগ শ্রেণিবিন্যাস ও ওষুধবিজ্ঞানের পদ্ধতিগত উপস্থাপনা। ইবনে সিনা শত শত রোগের বর্ণনা দেন এবং বিভিন্ন ভেষজ, খনিজ ও প্রাণিজ উপাদানভিত্তিক ওষুধের কার্যকারিতা আলোচনা করেন। তিনি কোন রোগে কোন ধরনের ওষুধ ব্যবহার উপযোগী—সে বিষয়ে যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনকি ওষুধ পরীক্ষার ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি এক ধরনের প্রাথমিক “ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল”-এর ধারণাও সামনে আনেন, যা সেই সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত অগ্রসর চিন্তা।

এই গ্রন্থে শুধু শারীরিক রোগ নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো অবস্থাকে ইবনে সিনা শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। আজকের সমন্বিত স্বাস্থ্যধারণা—যেখানে দেহ ও মনকে আলাদা করে দেখা হয় না—তার একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত আমরা ‘কানুন ফি তিব’-এ খুঁজে পাই।

মধ্যযুগে ইউরোপের মেডিক্যাল স্কুলগুলোতে এই বইটি ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়ে দীর্ঘদিন প্রধান পাঠ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বলোনিয়া, প্যারিস কিংবা অক্সফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চিকিৎসাশিক্ষার্থীরা ইবনে সিনার এই গ্রন্থ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে জ্ঞান কোনো একক সভ্যতার সম্পদ নয়; বরং বিভিন্ন সংস্কৃতির পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়েই মানবসভ্যতার বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ঘটেছে।

আজকের আধুনিক মেডিসিনে ‘কানুন ফি তিব’-এর বহু তত্ত্ব ও চিকিৎসা-পদ্ধতি আর ব্যবহার করা হয় না। তবু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই গ্রন্থের অবদান অম্লান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিজ্ঞান কেবল প্রযুক্তির অগ্রগতির ফল নয়; বরং পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে জ্ঞানকে সংগঠিত করার দীর্ঘ মানবিক প্রচেষ্টার ফল। ইবনে সিনার ‘কানুন ফি তিব’ সেই মানবিক বৌদ্ধিক অভিযাত্রার এক উজ্জ্বল দলিল।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ