গবেষণায় হাতে খড়ি

বিজ্ঞানী’র বই: ‘সুশ্রুত সংহিতা’ প্রাচীন শল্যচিকিৎসার বিস্ময় ও ধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের শেকড়

Share
Share

আজকের দিনে আমরা যখন ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি, রোবোটিক অস্ত্রোপচার কিংবা প্লাস্টিক সার্জারির মতো আধুনিক চিকিৎসা-পদ্ধতির কথা বলি, তখন খুব কম মানুষই জানি—এই উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিকড় প্রোথিত রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো এক গ্রন্থে। সেই গ্রন্থটির নাম ‘সুশ্রুত সংহিতা’। আয়ুর্বেদের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে পরিচিত এই বইটি শুধু ভেষজ চিকিৎসার সংকলন নয়; বরং মানবদেহ, রোগ নির্ণয় এবং শল্যচিকিৎসা নিয়ে এক বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক দলিল।

ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৬০০ থেকে ৫০০ বছরের মধ্যে মহর্ষি সুশ্রুত এই গ্রন্থটি সংকলন করেন। ইতিহাসবিদদের অনেকেই তাঁকে বিশ্বের প্রথম দিকের সংগঠিত শল্যচিকিৎসক হিসেবে বিবেচনা করেন। সে কারণেই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁকে প্রায়ই “শল্যচিকিৎসার জনক” বলা হয়। সুশ্রুত সংহিতার গুরুত্ব বোঝা যায় এই কারণে যে, এখানে রোগীকে শুধু ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করার কথা নয়, বরং প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার কীভাবে করা হবে—তার পদ্ধতিগত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

গ্রন্থটিতে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, হাড়, রক্তনালি ও স্নায়ুতন্ত্রের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এমনকি শারীরবিদ্যা বোঝার জন্য মৃতদেহ পর্যবেক্ষণ বা বিচ্ছিন্ন করে অধ্যয়নের কথাও উল্লেখ আছে—যা সেই সময়ের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে ছিল বেশ সাহসী ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। আধুনিক অ্যানাটমির প্রাথমিক ধারণাগুলোর সঙ্গে সুশ্রুত সংহিতার অনেক বর্ণনার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর শল্যচিকিৎসা অধ্যায়। নাক কেটে গেলে পুনর্গঠনের পদ্ধতি (রাইনোপ্লাস্টি), মূত্রথলির পাথর অপসারণ, ক্ষত সেলাই, হাড় ভাঙা জোড়া লাগানো কিংবা টিউমার কেটে ফেলার মতো জটিল অস্ত্রোপচারের নির্দেশনা এখানে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আজকের প্লাস্টিক সার্জারির ইতিহাসে সুশ্রুতের নাক পুনর্গঠনের পদ্ধতিকে এক ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। এতে বোঝা যায়, প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাবিদরা কেবল আধ্যাত্মিক বা প্রাকৃতিক চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং তাঁরা পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষার ভিত্তিতে কার্যকর চিকিৎসা-পদ্ধতি গড়ে তুলেছিলেন।

তবে সুশ্রুত সংহিতা শুধু অস্ত্রোপচারকেন্দ্রিক নয়। এতে স্বাস্থ্য রক্ষা, রোগ প্রতিরোধ, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের দিকনির্দেশনাও গুরুত্ব পেয়েছে। একজন মানুষের দৈনন্দিন আচরণ, ঋতুভেদে খাদ্যাভ্যাস ও পরিচ্ছন্নতার ওপর যে স্বাস্থ্যের গভীর প্রভাব পড়ে—এই ধারণা আজকের প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

আজকের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সরাসরি সুশ্রুত সংহিতার পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস বুঝতে গেলে এই গ্রন্থটির অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞানের অগ্রগতি কোনো একক সময় বা সভ্যতার সৃষ্টি নয়; বরং মানবসভ্যতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানচর্চার ফল। ‘সুশ্রুত সংহিতা’ সেই ধারাবাহিক জ্ঞানভাণ্ডারের এক উজ্জ্বল অধ্যায়, যা আজও আমাদেরকে অতীতের বৈজ্ঞানিক বোধ ও চিন্তার গভীরতা উপলব্ধি করতে সহায়তা করে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ