উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগগল্পে গল্পে বিজ্ঞান

“গবেষণার দিক নির্ধারণ হয় প্রয়োজন ও ফান্ডিংয়ের বাস্তবতায়” — ড. মোহাম্মদ আতাউল করিম

Share
Share

বিজ্ঞানী ও একাডেমিক নেতাদের জীবন অনেক সময় ভেবে দেখা হয় কেবল জ্ঞান ও আবিষ্কারের আলোয় আলোকিত। কিন্তু বাস্তব গবেষণা-যাত্রা অনেক বেশি জটিল, বহুক্ষেত্রের চাহিদা, তহবিলের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বাস্তবতার কথাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আতাউল করিম—“গবেষণার দিক নির্ধারণ হয় প্রয়োজন ও ফান্ডিংয়ের বাস্তবতায়।” এই কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে সেই বাস্তব জীবনের গভীর উপলব্ধি, যেখানে আবিষ্কার ও অর্থায়ন, কৌশল ও প্রয়োগ—এগুলোকে একসঙ্গে সামলাতে হয়।

ড. করিমের নিজস্ব গবেষণা-জীবন শুরু হয়েছিল পদার্থবিজ্ঞান থেকে, পরে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চলে আসে। একাডেমিক কাজের শুরু থেকেই তাঁর লক্ষ্য ছিল নতুন জ্ঞান তৈরি করা। কিন্তু বটে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে শুরু করেন যে গবেষণাপত্র লেখার স্বপ্ন শুধু আকাঙ্ক্ষা থাকলেই বাস্তবে পরিণত হয় না। তহবিলের প্রয়োজন পড়ে, অবকাঠামো গড়ে তুলতে হয় এবং একাধিক ক্ষেত্রের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়। এই বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে তিনি বলেন, গবেষণার মূল বিষয় নির্বাচন যখনই করবেন—এর পিছনে দৃষ্টি রাখতে হবে প্রয়োজন ও ফান্ডিংয়ের বাস্তবতায়।

কোনো নতুন প্রযুক্তির ধারণা হোক বা বিজ্ঞানসম্মত কোনো সমস্যা সমাধান—এই দুটোই জরুরি। কিন্তু শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক উত্তেজনা দিয়ে কাজ শুরু করলে তা দীর্ঘমেয়াদি টেকসই হয় না। গবেষণার জন্য অর্থায়ন বা গ্রান্ট পাওয়া এখন একটি পরিকল্পিত প্রকৌশলে পরিণত হয়েছে। গবেষক বা গবেষণা ল্যাবের প্রধানকে চাই অর্থায়নকারী সংস্থার চাহিদা বুঝতে, এবং সেই অনুযায়ী গবেষণার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাজাতে হয়। ড. করিমের কথায়, “আমার মোটিভেশন সবসময় কাস্টমার-ড্রিভেন—এক্ষেত্রে কাস্টমার মানে গবেষণা অর্থায়নকারী সংস্থা বা প্রয়োজন বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান।”

তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্টার ওয়ার্স’ প্রতিরক্ষা কর্মসূচির জন্য দ্রুত হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন দেখা। সে সময়ে অপটিক্যাল কম্পিউটিং—আলোকে গণনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা—কুলকালীন প্রযুক্তি হিসেবে চাহিদা পেয়েছিল। এই ফান্ডিং সুযোগ গবেষণার বিষয়বস্তুকে একটি নির্দিষ্ট দিক নির্দেশ করে দেয়। ড. করিম বলেন, “আমি গবেষণার বিষয় নিজে নির্বাচন করিনি—বরং প্রয়োজনে ও তহবিলের সুযোগ দেখে আমি সেই দিকে গিয়েছি।”

এমন বাস্তব দিকনির্দেশ গবেষককে কেবল বিজ্ঞানী হিসেবেই তৈরি করে না, বরং তাকে একজন কৌশলগত পরিকল্পনাকারী হিসেবেও গড়ে তোলে। গবেষণার প্রকল্প গঠন, দল তৈরি, ফান্ডিং আবেদন, বাজেট পরিকল্পনা—এসবই এক প্রকার ব্যবসায়িক দক্ষতা। একটি কার্যকর গবেষণা প্রকল্প প্রণয়ন করতে গেলে গবেষকদের এই দিকগুলো বোঝা জরুরি। ড. করিম নিজেও তাঁর নেতৃত্বাধীন গবেষণা টিমগুলোতে এই যুক্তিগত পরিকল্পনা ও টিম ওয়ার্ককে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

বাংলাদেশি গবেষকদের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা অপরিসীমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে গবেষণায় তহবিলের সুযোগ সীমিত, ফলে গবেষণার বিষয় নির্বাচন বেশিরভাগ সময় উদ্যোগ বা প্রকল্প ভিত্তিক হয়। যে সমস্যাগুলো সমাজ বা শিল্পে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে—এসবের দিকে নজর দিলে গবেষণা কেবল জ্ঞান-নির্ভর নয়, বাস্তব সমাধানও দিতে পারে।

ড. করিমের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, গবেষণা শুরু হওয়া উচিত কেবল বৈজ্ঞানিক উত্তেজনা থেকেই নয়; বাস্তব প্রয়োজনে, অর্থায়নের বাস্তবতায় এবং প্রযুক্তির প্রয়োগযোগ্যতায়। এই তিনটি মিলেই একটি প্রকল্প শুধু জ্ঞান তৈরির মাধ্যম হয় না, বরং সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়নে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।

ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles