গবেষণায় হাতে খড়ি

বিজ্ঞানী’র বই: এলিজাবেথ কোলবার্টের ‘দ্য সিক্সথ এক্সটিংশন’ ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কবার্তা

Share
Share

পৃথিবীর ইতিহাসে জীববৈচিত্র্যের বড় পাঁচটি গণবিলুপ্তির কথা আমরা ভূতত্ত্ব ও জীবাশ্মবিদ্যার বইয়ে পড়ি—যেখানে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ, উল্কাপাত বা জলবায়ুর নাটকীয় পরিবর্তনে অসংখ্য প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু আধুনিক যুগে আমরা দাঁড়িয়ে আছি আরেকটি সম্ভাব্য গণবিলুপ্তির মুখে—যেটি ঘটছে ধীরে ধীরে, মানুষের হাত ধরে। এই বাস্তবতাকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন বিজ্ঞান সাংবাদিক এলিজাবেথ কোলবার্ট তাঁর পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত বই ‘দ্য সিক্সথ এক্সটিংশন: অ্যান আনন্যাচারাল হিস্ট্রি’ (The Sixth Extinction: An Unnatural History)-এ।

কোলবার্ট এই বইয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে দেখান—কীভাবে মানুষের কার্যকলাপ প্রজাতির টিকে থাকার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বন উজাড়, শিল্পায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের অম্লীকরণ, আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার—এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করে জীববৈচিত্র্যের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে তুলছে। উভচর প্রাণীর ছত্রাকজনিত রোগে দ্রুত বিলুপ্তি, প্রবাল প্রাচীরের ধ্বংস, বা দ্বীপবাসী পাখির নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার গল্পগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; এগুলো প্রত্যক্ষ ক্ষেত্রসমীক্ষার বাস্তব চিত্র, যা পাঠকের সামনে বিলুপ্তির মানবিক ও পরিবেশগত মূল্য উন্মোচন করে।

বইটির একটি শক্তিশালী দিক হলো—এটি অতীতের গণবিলুপ্তির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টানে। আগের পাঁচটি গণবিলুপ্তি ঘটেছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে। কিন্তু ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির ক্ষেত্রে মানুষ নিজেই হয়ে উঠেছে প্রধান ভূতাত্ত্বিক শক্তি—যাকে অনেক বিজ্ঞানী ‘অ্যানথ্রোপোসিন’ যুগের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেন। এই তুলনা আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরে—আমরা কেবল পর্যবেক্ষক নই; বরং এই বিপর্যয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।

কোলবার্টের লেখার ভঙ্গি কঠোর বৈজ্ঞানিক হলেও বর্ণনায় মানবিক আবেগ রয়েছে। তিনি বিজ্ঞানীদের মাঠকাজ, ল্যাবরেটরির গবেষণা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার গল্প একত্রে তুলে ধরেন। এর ফলে পাঠক বুঝতে পারেন—বিলুপ্তি কোনো দূরের ভবিষ্যতের বিমূর্ত আশঙ্কা নয়; বরং এটি আমাদের সময়ের বাস্তবতা। একই সঙ্গে বইটি নৈতিক প্রশ্ন তোলে—মানুষের উন্নয়ন ও ভোগের মূল্য কি অন্য প্রজাতির অস্তিত্ব দিয়ে চুকাতে হবে?

‘দ্য সিক্সথ এক্সটিংশন’ হতাশার বই নয়; বরং এটি এক ধরনের সতর্কবার্তা। কোলবার্ট দেখান, ইতিহাস জানলে ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ তৈরি হয়। সংরক্ষণ উদ্যোগ, পরিবেশবান্ধব নীতি, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষতির গতি কমানো সম্ভব। বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো প্রজাতি (মানুষ) সচেতনভাবে বুঝতে পারছে যে তার কর্মকাণ্ড সমগ্র জীবজগতকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই উপলব্ধিই হয়তো আমাদের সামনে শেষ সুযোগ—বিলুপ্তির এই ষষ্ঠ অধ্যায়কে পুরোপুরি অনিবার্য পরিণতিতে পৌঁছানোর আগেই পথ বদলানোর।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ