গবেষণায় হাতে খড়ি

বিজ্ঞানী’র বই: ফ্রিম্যান ডাইসনের ‘অরিজিন অফ লাইফ’ ও বিজ্ঞানী-দার্শনিকের প্রশ্ন

Share
Share

পৃথিবীতে জীবন কীভাবে শুরু হলো—এই প্রশ্নটি বিজ্ঞানের সবচেয়ে গভীর ও জটিল ধাঁধাগুলোর একটি। আধুনিক জীববিজ্ঞান ও রসায়ন জীবনের সূচনাকে ব্যাখ্যা করতে নানা মডেল প্রস্তাব করেছে—প্রাইমর্ডিয়াল স্যুপ থেকে শুরু করে আরএনএ ওয়ার্ল্ড হাইপোথিসিস পর্যন্ত। এই আলোচনায় এক ভিন্নধর্মী ও কল্পনাশীল দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করেন প্রখ্যাত পদার্থবিদ ও বিজ্ঞানী-দার্শনিক ফ্রিম্যান ডাইসন তাঁর বই ‘অরিজিন অফ লাইফ’ (The Origins of Life)-এ। এই গ্রন্থে ডাইসন জীবনের সূচনা নিয়ে কেবল পরীক্ষাগারভিত্তিক তত্ত্ব নয়, বরং সম্ভাব্য বহু পথ ও আন্তঃবিষয়ক চিন্তার একটি মানচিত্র আঁকেন।

ডাইসনের একটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব হলো—জীবনের সূচনায় মেটাবলিজম আগে, জেনেটিক্স পরে (metabolism-first) ধরনের ধারণা। প্রচলিত অনেক তত্ত্ব যেখানে জেনেটিক তথ্য (যেমন আরএনএ) আগে এসেছে বলে ধরে নেয়, সেখানে ডাইসন কল্পনা করেন—প্রাথমিক জীবনের আগে হয়তো স্ব-সংগঠিত রাসায়নিক নেটওয়ার্ক বা বিপাকীয় প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, যা পরে জিনগত তথ্য বহনকারী অণুর আবির্ভাবের পথ তৈরি করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি জীবনের সূচনা বোঝার ক্ষেত্রে একক কোনো পথের বদলে বহুমাত্রিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে।

বইটিতে ডাইসন জীবনের সূচনাকে একটি ধাপে ধাপে সংগঠিত হওয়া প্রক্রিয়া হিসেবে কল্পনা করেন, যেখানে প্রাথমিকভাবে অগোছালো রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো ধীরে ধীরে স্থিতিশীল নেটওয়ার্কে পরিণত হয়। তিনি এখানে কোষের ঝিল্লি, স্ব-প্রতিলিপি, শক্তি আহরণ—এই বৈশিষ্ট্যগুলো কীভাবে আলাদা আলাদা সময়ে উদ্ভূত হতে পারে, সে বিষয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট তুলে ধরেন। এই পদ্ধতি কঠোর প্রমাণভিত্তিক তত্ত্বের মতো নয়; বরং বৈজ্ঞানিক কল্পনার মাধ্যমে জটিল সমস্যাটিকে নতুনভাবে ভাবার এক প্রয়াস।

ডাইসনের লেখার শক্তি এখানেই যে, তিনি বিজ্ঞানের কঠোর তথ্যের সঙ্গে দার্শনিক কৌতূহল ও ভবিষ্যতধর্মী কল্পনা মিলিয়ে দেন। তিনি দেখান—জীবনের উৎপত্তি বোঝা মানে কেবল পৃথিবীর ইতিহাস বোঝা নয়; বরং মহাবিশ্বে জীবন কতটা সাধারণ বা বিরল হতে পারে—এই বৃহত্তর প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া। তাঁর আলোচনায় বহির্জাগতিক জীবনের সম্ভাবনা, মহাবিশ্বে রাসায়নিক জটিলতার বিস্তার এবং আত্মসংগঠনের নীতিগুলো উঠে আসে।

আজকের দৃষ্টিতে ‘অরিজিন অফ লাইফ’ কোনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বই নয়। বরং এটি জীবনের সূচনা নিয়ে খোলা প্রশ্নগুলোকে উন্মুক্ত রাখার আহ্বান। আধুনিক গবেষণা—যেমন প্রোটোসেল, স্ব-প্রতিলিপিকারী আরএনএ, বা হাইড্রোথার্মাল ভেন্টে রাসায়নিক বিবর্তন—ডাইসনের কল্পনাকে আংশিকভাবে সমর্থন বা পরিমার্জন করছে। তবু তাঁর বইটির মূল্য এখানেই যে, এটি বিজ্ঞানকে কেবল উত্তর দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়, বরং সাহসী প্রশ্ন তোলার এক বৌদ্ধিক অনুশীলন হিসেবে তুলে ধরে। জীবনের সূচনা নিয়ে নিশ্চিত উত্তর না থাকলেও, ডাইসনের এই ভিন্নস্বরে ভাবনার আহ্বান আমাদের অনুসন্ধিৎসাকে আরও গভীর করে তোলে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ