জীববিজ্ঞান কি কেবল তথ্যের সমষ্টি—কোন প্রাণীর কতটি ক্রোমোজোম, কোন উদ্ভিদে কোন এনজাইম কাজ করে—নাকি এটি প্রকৃতিকে বোঝার এক ভিন্ন ধরনের বৌদ্ধিক প্রক্রিয়া? এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী আর্নস্ট মায়ার তাঁর বই ‘দিস ইজ বায়োলজি: দ্য সায়েন্স অফ দ্য লিভিং ওয়ার্ল্ড’ (This Is Biology: The Science of the Living World) লিখেছিলেন। বইটি মূলত জীববিজ্ঞানের দর্শন, পদ্ধতি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক গভীর অথচ সহজবোধ্য আলোচনা—যা জীববিজ্ঞানকে কেবল ল্যাবের তথ্য নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা হিসেবে বুঝতে সাহায্য করে।
মায়ার দেখান, জীববিজ্ঞান পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নের মতো “সর্বজনীন সূত্র” দিয়ে সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারে না। জীবজগতের বৈশিষ্ট্য হলো বৈচিত্র্য, পরিবর্তনশীলতা ও ইতিহাসনির্ভরতা। একটি পাথর সব জায়গায় একই নিয়মে পড়ে, কিন্তু জীবের ক্ষেত্রে প্রজাতিভেদে আচরণ, অভিযোজন ও বিবর্তনের পথ আলাদা হতে পারে। এই কারণেই জীববিজ্ঞানে ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা (historical explanation) গুরুত্বপূর্ণ—আজকের জীবের বৈশিষ্ট্য বুঝতে হলে তার বিবর্তনীয় অতীত জানতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি জীববিজ্ঞানের স্বাতন্ত্র্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো টেলিওলজি (উদ্দেশ্যবাদী ব্যাখ্যা) সম্পর্কে আলোচনা। আমরা প্রায়ই বলি—“পাখির ডানা উড়ার জন্য তৈরি” বা “চোখ দেখার জন্য তৈরি।” মায়ার দেখান, জীববিজ্ঞানে এ ধরনের উদ্দেশ্যবাদী ভাষা ব্যবহার করলেও বৈজ্ঞানিকভাবে এগুলোকে বিবর্তনীয় অভিযোজনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করতে হয়। অর্থাৎ কোনো অঙ্গ “উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি” নয়; বরং প্রাকৃতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে গঠনটি টিকে থাকে, সেটিই নির্দিষ্ট কাজের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা জীববিজ্ঞানের দর্শন বুঝতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘দিস ইজ বায়োলজি’-তে মায়ার বিবর্তন, প্রজাতি ধারণা ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণার সারাংশ তুলে ধরেন। প্রজাতি কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে, কেন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা জরুরি, এবং বিবর্তনীয় চিন্তা আধুনিক জীববিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু কেন—এসব প্রশ্নের উত্তর তিনি ইতিহাস, দর্শন ও বিজ্ঞানকে একসঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেন। এর ফলে বইটি কেবল জীববিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য নয়; বিজ্ঞানদর্শন ও নীতিনির্ধারণে আগ্রহী পাঠকের কাছেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
এই বইয়ের একটি বড় অবদান হলো—এটি জীববিজ্ঞানের সামাজিক ও নৈতিক প্রেক্ষাপটও স্পর্শ করে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, পরিবেশ সংরক্ষণ বা জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো সমসাময়িক ইস্যুতে বৈজ্ঞানিক চিন্তার ভূমিকা কী হওয়া উচিত—মায়ার এসব প্রশ্নে দায়িত্বশীল ও যুক্তিনির্ভর অবস্থানের আহ্বান জানান। বিজ্ঞানকে তিনি মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো শুষ্ক কার্যক্রম হিসেবে দেখেন না; বরং সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিজ্ঞানের সঠিক বোঝাপড়া যে অপরিহার্য, তা জোর দিয়ে তুলে ধরেন।
আজকের দিনে জীববিজ্ঞান জিনোমিক্স, সিনথেটিক বায়োলজি বা কৃত্রিম জীবনের মতো নতুন দিগন্তে এগোচ্ছে। তবু ‘দিস ইজ বায়োলজি’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নতুন প্রযুক্তির ভিড়েও জীববিজ্ঞানের মৌলিক চরিত্র বোঝা জরুরি। আর্নস্ট মায়ারের এই বই জীবনের বিজ্ঞানকে কেবল তথ্যের স্তূপ হিসেবে নয়, বরং এক গভীর দার্শনিক ও ঐতিহাসিক অভিযাত্রা হিসেবে দেখার চোখ তৈরি করে।

Leave a comment