গবেষণায় হাতে খড়ি

বিজ্ঞানী’র বই: জিম ওয়াটসনের ‘দ্য ডাবল হেলিকস’ এবং ‘ডিএনএ’

Share
Share

আজ আমরা জানি—আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের ভেতরে লুকিয়ে আছে জীবনের নীলনকশা, যার নাম ডিএনএ (DNA)। চোখের রং থেকে শুরু করে কিছু রোগের ঝুঁকি—সবকিছুর তথ্য এই অণুতে সংরক্ষিত। কিন্তু ডিএনএ-র গঠন কীভাবে আবিষ্কৃত হলো, সেই বৈজ্ঞানিক প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা ও মানবিক দ্বন্দ্বের গল্প সাধারণ পাঠকের সামনে প্রথমবারের মতো উন্মোচন করে দেয় জীববিজ্ঞানী জেমস (জিম) ডি. ওয়াটসন-এর স্মৃতিকথামূলক বই ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’ (The Double Helix)। পাশাপাশি, ডিএনএ নিয়ে সাধারণ পাঠকের জন্য লেখা তাঁর জনপ্রিয় বিজ্ঞানধর্মী বইগুলো (প্রচলিতভাবে ‘DNA’ নামে পরিচিত রচনাসমূহ) আধুনিক আণবিক জীববিজ্ঞানের ভিত্তি বুঝতে সাহায্য করে।

‘দ্য ডাবল হেলিক্স’ (১৯৬৮) কোনো প্রচলিত বৈজ্ঞানিক পাঠ্য নয়; এটি এক ধরনের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা, যেখানে ওয়াটসন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারের পেছনের কাহিনি তুলে ধরেন। কেমব্রিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে ফ্রান্সিস ক্রিকের সঙ্গে কাজ করার দিনগুলো, প্রতিদ্বন্দ্বী গবেষক দলের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই, ভুল পথে এগোনো, আবার নতুন সূত্রে পৌঁছানোর নাটকীয় মুহূর্ত—সবকিছুই এই বইয়ে প্রাণবন্ত ভাষায় উঠে এসেছে। এর ফলে বিজ্ঞানকে আর দূরের কোনো নিরাবেগ কর্মকাণ্ড হিসেবে নয়, বরং আবেগ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মানবিক সীমাবদ্ধতায় ভরা এক বাস্তব প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়।

এই বইটি যেমন জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তেমনি বিতর্কও তৈরি করেছে। বিশেষ করে রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের অবদান উপস্থাপনের ধরন নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ফ্র্যাঙ্কলিনের এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন চিত্র (বিশেষ করে বিখ্যাত “ফটো ৫১”) ডিএনএ-র ডাবল হেলিক্স গঠন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’ এই জটিল নৈতিক প্রশ্নগুলো সামনে আনে—বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পেছনে কৃতিত্ব, প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার সম্পর্ক কীভাবে কাজ করে।

ওয়াটসনের ডিএনএ বিষয়ক জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক লেখালেখি—যা সাধারণভাবে ‘DNA’ নামে পরিচিত বই বা গ্রন্থসমূহের মাধ্যমে পরিচিত—ডিএনএ-র গঠন ও কার্যকারণ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে। এখানে তিনি দেখান কীভাবে ডিএনএ-র ডাবল হেলিক্স কাঠামোর মাধ্যমে জিনগত তথ্য সংরক্ষিত ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। এই ব্যাখ্যাগুলো সাধারণ পাঠকের কাছে আণবিক জীববিজ্ঞানের জটিল ধারণাকে বোধগম্য করে তোলে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, ডিএনএ আবিষ্কার শুধু একটি বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়; বরং চিকিৎসাবিজ্ঞান, জিনতত্ত্ব, ফরেনসিক বিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তিতে এক নতুন যুগের সূচনা।

আজকের দিনে জিনোম সিকোয়েন্সিং, ব্যক্তিগত চিকিৎসা (personalized medicine), ক্যান্সার গবেষণা বা জিনসম্পাদনা প্রযুক্তি (যেমন CRISPR)—সবকিছুর শিকড় গিয়ে পৌঁছায় ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে। ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’ আমাদের সেই আবিষ্কারের মানবিক দিকটি বুঝতে সাহায্য করে, আর ওয়াটসনের ডিএনএ বিষয়ক লেখালেখি আমাদের বৈজ্ঞানিক দিকটি বোঝার দরজা খুলে দেয়। এই দুই ধারার লেখার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান একদিকে যেমন মানুষের আবেগ-আকাঙ্ক্ষার গল্প, তেমনি অন্যদিকে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়া এক শক্তিশালী জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবেও ধরা দেয়।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org