আজ আমরা জানি—পৃথিবীর সব জীব একদিনে সৃষ্টি হয়নি; কোটি কোটি বছরের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে জীবনের বৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে। কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই ধারণা ছিল সমাজের বড় অংশের কাছে অচিন্তনীয়। সেই প্রচলিত বিশ্বাসে মৌলিক পরিবর্তন এনে দেয় চার্লস ডারউইনের ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস’ (On the Origin of Species)। এই বইটি শুধু জীববিজ্ঞানের একটি পাঠ্য নয়; বরং মানবজাতির আত্মবোধ ও প্রকৃতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে।
ডারউইনের মূল তত্ত্বের কেন্দ্রে ছিল প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural Selection)। তিনি দেখান, জীবজগতে প্রতিটি প্রজন্মে সামান্য সামান্য ভিন্নতা জন্ম নেয়। পরিবেশের সঙ্গে যে ভিন্নতাগুলো বেশি মানিয়ে নিতে পারে, সেগুলো টিকে থাকে ও বেশি সংখ্যায় বংশবিস্তার করে। দীর্ঘ সময়ে এই প্রক্রিয়াই নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটায়। অর্থাৎ বিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং পরিবেশ ও প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। এই ব্যাখ্যা জীববৈচিত্র্যকে কোনো স্থির ও অপরিবর্তনীয় সত্তা হিসেবে না দেখে পরিবর্তনশীল ও গতিশীল প্রক্রিয়া হিসেবে বোঝার পথ খুলে দেয়।
‘অরিজিন অফ স্পিসিস’-এর শক্তি ছিল ডারউইনের প্রমাণভিত্তিক যুক্তি। তিনি গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর পর্যবেক্ষণ, জীবাশ্মের তথ্য, গৃহপালিত প্রাণীর কৃত্রিম প্রজননের উদাহরণ এবং ভূগোলগত বিস্তৃতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ একত্র করে তাঁর তত্ত্ব দাঁড় করান। এসব উদাহরণ দেখায়, প্রজাতির বৈশিষ্ট্য পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। এই পদ্ধতিগত প্রমাণ উপস্থাপনই ডারউইনের তত্ত্বকে কেবল দর্শন নয়, বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তবে বইটি প্রকাশের পর তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অনেক ধর্মীয় ও সামাজিক মহলে ডারউইনের তত্ত্ব মানুষের বিশেষ অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলে বলে মনে করা হয়। মানুষকে অন্যান্য জীবের ধারাবাহিক বিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা তখনকার সমাজের প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীববিজ্ঞানের নানা শাখা—জেনেটিক্স, আণবিক জীববিদ্যা, পরিবেশবিদ্যা—ডারউইনের তত্ত্বকে আরও শক্ত প্রমাণে সমর্থন করে। আজকের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান মূলত ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের আধুনিক রূপায়ণ।
‘অরিজিন অফ স্পিসিস’ শুধু জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে নয়, মানবচিন্তার ইতিহাসেও এক গভীর ছাপ ফেলেছে। এটি মানুষকে প্রকৃতির কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরিয়ে প্রকৃতিরই একটি অংশ হিসেবে ভাবতে শেখায়। পাশাপাশি, এই বই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির গুরুত্বও সামনে আনে—প্রমাণ, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানই টিকে থাকে, সামাজিক বা ধর্মীয় চাপের মুখে হলেও। আজকের দিনে পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব আমাদেরকে জীবজগতের পারস্পরিক সম্পর্ক ও অভিযোজনের গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
এই অর্থে ডারউইনের ‘অরিজিন অফ স্পিসিস’ কোনো একটি সময়ের বই নয়; বরং এটি জীবনের গতিশীল ইতিহাস বোঝার এক মৌলিক চাবিকাঠি—যা আজও আমাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।

Leave a comment