উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগবিজ্ঞান লেখকবিজ্ঞানীদের জীবনী

বিজ্ঞান কেন পড়ব? ড. আবুল হুস্সামের জীবন থেকে ১১টি শিক্ষা

Share
Share

বাংলাদেশে বিজ্ঞান পড়া অনেক সময় “ভালো ছাত্রদের জন্য ভালো সাবজেক্ট”—এই ধারণার ভেতরে আটকে থাকে। ভালো রেজাল্ট মানেই বিজ্ঞান, বিজ্ঞান মানেই ভালো ক্যারিয়ার—এই সরল সমীকরণে বিজ্ঞানচর্চার গভীর অর্থ হারিয়ে যায়। কিন্তু বিজ্ঞান কেন পড়ব—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু চাকরির বাজারে নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার মধ্যেও লুকিয়ে আছে। প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. আবুল হুস্সামের জীবন ও কাজ এই প্রশ্নের একটি মানবিক ও বাস্তব উত্তর দেয়।

ড. হুস্সামের শৈশব কেটেছে কুষ্টিয়ায়। বাবার প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে যন্ত্রপাতি, রঙিন দ্রবণ আর ছোটখাটো পরীক্ষার দৃশ্য দেখে তাঁর মনে বিজ্ঞানের প্রতি কৌতূহল জন্ম নেয়। এখান থেকেই প্রথম শিক্ষা পাওয়া যায়—বিজ্ঞান শুরু হয় কৌতূহল থেকে, পাঠ্যবই থেকে নয়। যে শিশু প্রশ্ন করতে শেখে, সে-ই ভবিষ্যতে বিজ্ঞানচর্চার পথে হাঁটতে পারে।

দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, বিজ্ঞান শুধু তত্ত্ব নয়—এটি হাতে-কলমে কিছু তৈরি করার সাহস। ড. হুস্সাম বারবার বলেছেন, বই পড়ে জানা আর নিজের হাতে বানিয়ে দেখা এক জিনিস নয়। তাঁর গবেষণাজীবনে যন্ত্র তৈরি ও উন্নয়নের আগ্রহই তাঁকে অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট্রির মতো প্রয়োগমূলক শাখায় নিয়ে গেছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, বিজ্ঞান পড়ার মানে শুধু পরীক্ষায় ভালো করা নয়, বাস্তবে কাজ করার দক্ষতা অর্জন।

তৃতীয় শিক্ষা আসে তাঁর প্রবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে থেকে কাজ করলেও তিনি বাংলাদেশের আর্সেনিক সংকটকে নিজের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন। এখান থেকে শেখা যায়, বিজ্ঞান পড়ার উদ্দেশ্য কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গড়া নয়; দেশের সমস্যার প্রতিও দায়বদ্ধ থাকা জরুরি। ভৌগোলিক দূরত্ব কখনো দায়িত্বের দূরত্ব হতে পারে না।

চতুর্থ শিক্ষা হলো, গবেষণার বিষয় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া। আর্সেনিক দূষণ নিয়ে তাঁর কাজ দেখিয়ে দেয়, গবেষণা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। এটি তরুণদের মনে করিয়ে দেয়—ট্রেন্ড অনুসরণ নয়, প্রয়োজন অনুসরণই বিজ্ঞানকে সমাজের উপকারে আনে।

পঞ্চম শিক্ষা আসে লো-কস্ট টেকনোলজির দর্শন থেকে। সোনো ফিল্টার প্রমাণ করেছে, কম খরচের সহজ প্রযুক্তিই উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে কার্যকর। বিজ্ঞান পড়ার অর্থ এই নয় যে সবসময় জটিল বা ব্যয়বহুল সমাধান খুঁজতে হবে; বরং সীমিত সম্পদের মধ্যেও কার্যকর সমাধান তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

ষষ্ঠ শিক্ষা হলো গবেষণাগার ও মাঠের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা। ড. হুস্সামের কাজ গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকেনি; মাঠপর্যায়ে মানুষের হাতে পৌঁছেছে। এটি শেখায়, বিজ্ঞান পড়লে শুধু ল্যাবরেটরিতে আটকে থাকলে চলবে না, বাস্তব জীবনের সমস্যার সঙ্গে সংযোগ রাখতে হবে।

সপ্তম শিক্ষা আসে বিজ্ঞানীর সামাজিক ভূমিকা নিয়ে। বিজ্ঞানী শুধু জ্ঞান সৃষ্টি করেন না; সেই জ্ঞান সমাজের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেটাও তাঁর দায়িত্বের অংশ। বিজ্ঞান পড়ার মানে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়; বরং সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকা।

অষ্টম শিক্ষা হলো প্যাশন বনাম পেশার পার্থক্য। বিজ্ঞানকে কেবল পেশা হিসেবে নিলে ক্লান্তি আসে; প্যাশন হিসেবে নিলে উদ্ভাবনের আনন্দ পাওয়া যায়। ড. হুস্সামের জীবনে এই প্যাশনের ছাপ স্পষ্ট।

নবম শিক্ষা আসে ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা থেকে। গবেষণায় সব প্রচেষ্টা সফল হয় না। কিন্তু প্রতিটি ব্যর্থতা নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়—এটাই বিজ্ঞানের স্বাভাবিক পথ।

দশম শিক্ষা হলো সফলতার নতুন সংজ্ঞা। ড. হুস্সামের চোখে পুরস্কার নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনাই আসল সফলতা। বিজ্ঞান পড়ার উদ্দেশ্য তাই কেবল নিজের সাফল্য নয়, সমাজের উপকার করা।

একাদশ ও শেষ শিক্ষা হলো ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্ববোধ। আজকের তরুণরা যে বিজ্ঞান পড়ছে, তা আগামী দিনের বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে। বিজ্ঞান পড়ার অর্থ তাই শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্ন পূরণ নয়; এটি একটি সামাজিক অঙ্গীকার।

এই ১১টি শিক্ষা মিলিয়ে একটি কথাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বিজ্ঞান পড়া মানে শুধু ভালো ছাত্র হওয়া নয়, ভালো মানুষ হয়ে ওঠার পথও তৈরি করা। ড. আবুল হুস্সামের জীবন দেখিয়ে দেয়, বিজ্ঞানচর্চা যদি মানবিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা সমাজ বদলের শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

ড. আবুল হুস্সাম এর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org