বিজ্ঞানচর্চা বলতে আমরা সাধারণত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষানিরীক্ষা, গবেষণাপত্র প্রকাশ কিংবা নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কথাই বুঝি। কিন্তু অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী ও একাডেমিক নেতা ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের মতে, একজন বিজ্ঞানীর দায়িত্ব সেখানে শেষ হয় না। তাঁর ভাষায়, “একজন বিজ্ঞানীর কাজ শুধু ল্যাবে নয়, অবকাঠামো গড়াতেও।” এই উপলব্ধির মধ্য দিয়ে তিনি আধুনিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে আনেন—ভালো গবেষণা তখনই সম্ভব, যখন তার পেছনে শক্ত অবকাঠামো ও সহায়ক পরিবেশ থাকে।
ড. করিমের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শুধু গবেষণা করেননি; বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশ গড়ে তোলার কাজেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ডেটন, ওহাইওতে ইলেকট্রো-অপটিক্স প্রোগ্রাম প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে নিউ ইয়র্কে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ গড়ে তোলা এবং ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটিতে বৃহৎ গবেষণা অবকাঠামো তৈরি—এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে যে, একটি বা দুটি ভালো গবেষণাগার থাকলেই গবেষণার পরিবেশ তৈরি হয় না। প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল, অর্থায়নের ধারাবাহিকতা এবং আন্তঃবিষয়ক সহযোগিতার কাঠামো।
অবকাঠামো বলতে এখানে শুধু ভবন বা যন্ত্রপাতিকে বোঝানো হচ্ছে না। গবেষণার অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষিত গবেষক দল, প্রশাসনিক সহায়তা, গ্রান্ট ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা, শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক। ড. করিমের মতে, একজন গবেষক যখন এই বৃহত্তর কাঠামো তৈরিতে ভূমিকা রাখেন, তখন তাঁর গবেষণার প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়। একটি ভালো অবকাঠামো তৈরি হলে শুধু বর্তমান গবেষক নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষকরাও সেই সুবিধা পায়।
ড. করিমের অভিজ্ঞতায়, অবকাঠামো গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের মধ্যে গবেষণাভিত্তিক সংস্কৃতি তৈরি করা। অনেক সময় গবেষকরা নিজেদের কাজের বাইরে প্রশাসনিক বা কাঠামোগত বিষয়ে জড়াতে অনিচ্ছুক থাকেন। কিন্তু বাস্তবে গবেষণার টেকসই অগ্রগতির জন্য এই দুটি বিষয় আলাদা নয়। একটি শক্তিশালী গবেষণা পরিবেশ তৈরি হলে সেখানে নতুন ধারণা জন্মায়, তরুণ গবেষকরা নিরাপদভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারে এবং ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উপলব্ধির গুরুত্ব আরও বেশি। আমাদের দেশে গবেষণার অবকাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। আধুনিক ল্যাব, পর্যাপ্ত তহবিল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ সীমিত। ড. করিমের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায়, যদি আমরা গবেষণার অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিই—শুধু ভবন নির্মাণ নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াই—তবে দেশীয় গবেষণা ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব।
একজন বিজ্ঞানীর অবদান তাই কেবল গবেষণাগারের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি যদি গবেষণার জন্য সহায়ক অবকাঠামো তৈরি করতে পারেন, তবে তাঁর প্রভাব বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জ্ঞান সৃষ্টির পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment