উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগবিজ্ঞান লেখক

“খুব বড় ল্যাব না থাকলেও গবেষণা শুরু করা যায়—লাগে উদ্যোগ” — ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদ

Share
Share

বাংলাদেশের মতো দেশে বিজ্ঞানচর্চার কথা উঠলেই প্রথম যে অভিযোগটি শোনা যায়, তা হলো অবকাঠামোর অভাব—ভালো ল্যাব নেই, আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নেই। এই বাস্তবতাগুলো সত্যি, অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের মতে, গবেষণার শুরুটা সব সময় যন্ত্রপাতি দিয়ে হয় না; শুরুটা হয় মানসিকতা দিয়ে। তাঁর কথায়, “খুব বড় ল্যাব না থাকলেও গবেষণা শুরু করা যায়—লাগে উদ্যোগ।” এই বক্তব্য তরুণ গবেষকদের জন্য এক ধরনের মানসিক মুক্তির বার্তা।

গবেষণার ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজই শুরু হয়েছে সীমিত সম্পদের মধ্যে। উন্নত যন্ত্রপাতি অবশ্যই গবেষণাকে দ্রুত ও নির্ভুল করে তোলে, কিন্তু সব গবেষণার জন্য একই মাত্রার অবকাঠামো প্রয়োজন হয় না। পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা, ক্ষেত্রসমীক্ষা, ডেটা বিশ্লেষণ, তুলনামূলক অধ্যয়ন—এই ধরনের কাজ অনেক সময় সাধারণ ল্যাব বা এমনকি ল্যাব ছাড়াও করা সম্ভব। ড. আশরাফউদ্দিন মনে করেন, গবেষণার প্রথম ধাপ হলো সমস্যাকে চিহ্নিত করা এবং সেটি নিয়ে পদ্ধতিগতভাবে ভাবা।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো—শিক্ষার্থীদের গবেষণার সঙ্গে পরিচয় তুলনামূলকভাবে দেরিতে হয়। অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে প্রথম গবেষণার কথা শোনে। ফলে শুরুতেই তারা নিজেদের প্রস্তুত মনে করে না। ড. আশরাফউদ্দিনের অভিজ্ঞতায়, গবেষণার মানসিকতা ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা যায়—প্রশ্ন করা, পর্যবেক্ষণ করা, ছোট ছোট পরীক্ষার মাধ্যমে ধারণা যাচাই করা। স্কুল-কলেজ পর্যায়েও যদি এই অভ্যাস তৈরি করা যায়, তবে বড় ল্যাব না থাকলেও গবেষণার বীজ অঙ্কুরিত হতে পারে।

এখানে উদ্যোগের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সুযোগ নিজে থেকেই এসে ধরা দেয় না; গবেষকদেরই সুযোগ তৈরি করতে হয়। সীমিত সুবিধার মধ্যে কীভাবে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়—এই চিন্তাটাই গবেষণার একটি বড় দক্ষতা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো সমস্যার ওপর প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা, বিদ্যমান সাহিত্য পর্যালোচনা করা, স্থানীয় পর্যায়ে ছোট পরিসরে পাইলট স্টাডি করা—এসব কাজ খুব বড় ল্যাব ছাড়াও সম্ভব। এই প্রাথমিক কাজগুলো থেকেই ভবিষ্যতে বড় প্রকল্পের ভিত্তি তৈরি হয়।

ড. আশরাফউদ্দিনের বক্তব্যে আরেকটি সূক্ষ্ম দিক আছে—উদ্যোগ মানে কেবল ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির বিষয়ও। যদি বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উদ্যোগী গবেষকদের জন্য ন্যূনতম সহায়তা, পরামর্শ ও উৎসাহ থাকে, তাহলে সীমিত অবকাঠামোর মধ্যেও কার্যকর গবেষণা সম্ভব। ছোট অনুদান, যৌথ গবেষণা প্রকল্প, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সহযোগিতা—এসব উদ্যোগ গবেষণার পরিবেশকে গতিশীল করে তুলতে পারে।

সবশেষে, এই বক্তব্য তরুণদের একটি বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়। বড় ল্যাবের অভাবকে অজুহাত হিসেবে ধরে বসে থাকলে গবেষণার পথ কখনোই শুরু হবে না। বরং নিজের চারপাশের সমস্যাগুলোকে প্রশ্ন করা, সীমিত উপকরণে ছোট পদক্ষেপ নেওয়া—এই উদ্যোগই ধীরে ধীরে বড় গবেষণার দিকে নিয়ে যায়। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের অভিজ্ঞতা দেখায়, গবেষণার আসল শক্তি লুকিয়ে আছে মানুষের আগ্রহ ও উদ্যোগে; অবকাঠামো সেই শক্তিকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যম মাত্র।

ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org