শূন্য ও ঋণাত্মক সংখ্যার পথিকৃৎ: ব্রহ্মগুপ্তের ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ ও গণিতের নতুন দিগন্ত
আজকের আধুনিক গণিতে শূন্য (০) ও ঋণাত্মক সংখ্যাকে আমরা স্বাভাবিকভাবেই ব্যবহার করি—ব্যাংকের হিসাব থেকে শুরু করে পদার্থবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদমে এগুলোর ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু ইতিহাসের এক সময়ে শূন্য ও ঋণাত্মক সংখ্যার ধারণা ছিল অস্পষ্ট ও বিতর্কিত। এই ধারণাগুলোকে প্রথমবারের মতো সুস্পষ্ট নিয়ম ও গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করেছিলেন সপ্তম শতকের ভারতীয় গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ ব্রহ্মগুপ্ত। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ (Brahmasphutasiddhanta) গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দলিল।
খ্রিস্টাব্দ ৬২৮ সালের দিকে রচিত ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ মূলত জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি গ্রন্থ হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গণিতের কিছু মৌলিক ধারণা, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিশ্বজুড়ে গণিতচর্চার ভিত্তি গড়ে দেয়। ব্রহ্মগুপ্ত এখানে প্রথমবারের মতো শূন্যকে একটি স্বতন্ত্র সংখ্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন এবং শূন্যের সঙ্গে যোগ, বিয়োগ ও গুণের নিয়ম নির্ধারণ করেন। একইভাবে ঋণাত্মক ও ধনাত্মক সংখ্যার যোগ-বিয়োগের নিয়মও তিনি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন। যদিও ভাগের ক্ষেত্রে শূন্য নিয়ে তাঁর কিছু ব্যাখ্যা আধুনিক দৃষ্টিতে সঠিক নয়, তবু শূন্যকে গাণিতিক কাঠামোর ভেতরে আনাই ছিল এক বিপ্লবী পদক্ষেপ।
এই গ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বীজগণিত ও সমীকরণ তত্ত্বে অবদান। ব্রহ্মগুপ্ত দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধানের একটি সাধারণ সূত্র উপস্থাপন করেন, যা আজকের আধুনিক বীজগণিতের প্রাথমিক রূপের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি ক্ষেত্রফল নির্ণয়, জ্যামিতিক সমস্যার সমাধান এবং ভগ্নাংশের হিসাবের ক্ষেত্রেও কার্যকর নিয়ম প্রণয়ন করেন। ফলে ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ কেবল জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই নয়; বরং গণিতের একটি সমৃদ্ধ পাঠ্যগ্রন্থ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও ব্রহ্মগুপ্তের অবদান উল্লেখযোগ্য। গ্রহের গতি, গ্রহণের হিসাব এবং সময় নির্ণয়ের পদ্ধতি নিয়ে তিনি যে গাণিতিক মডেল দাঁড় করান, তা তৎকালীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের মানকে বহুগুণ উন্নত করে। পরবর্তীকালে আরবি ভাষায় অনূদিত হয়ে তাঁর কাজ মধ্যপ্রাচ্যের জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। আল-খারেজমি ও অন্যান্য ইসলামি জ্ঞানতাপসরা ব্রহ্মগুপ্তের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। এইভাবে ভারতীয় গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান ইসলামি বিশ্বের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছে রেনেসাঁ-পরবর্তী আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশে ভূমিকা রাখে।
আজকের দৃষ্টিতে ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’-এর সব তত্ত্বই নিখুঁত নয়। তবু ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই গ্রন্থের তাৎপর্য অনস্বীকার্য। শূন্য ও ঋণাত্মক সংখ্যাকে বৈধ গাণিতিক সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সাহসী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মগুপ্ত গণিতকে একটি নতুন দিগন্তে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই গ্রন্থ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণিত কেবল সংখ্যা নিয়ে খেলা নয়; বরং মানুষের চিন্তাশক্তি কীভাবে ধীরে ধীরে আরও বিমূর্ত ও শক্তিশালী ধারণার দিকে এগিয়ে গেছে, তার এক জীবন্ত দলিল।

Leave a comment