কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতথ্যপ্রযুক্তি

তত্ত্ব জানলেই হবে না; বাস্তব ডেটায় প্রয়োগ করেই দক্ষতা গড়ে ওঠে। —ড. আলিমুর রেজা

Share
Share

এআই, মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স—এসব শব্দ এখন শিক্ষার্থীদের কাছে খুব পরিচিত। অনেকে ইউটিউবে ভিডিও দেখে, অনলাইন কোর্স করে, এমনকি কয়েকটি টুলের নামও মুখস্থ করে ফেলেন। কিন্তু ড. আলিমুর রেজার কথায় এক জায়গায় এসে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়: শুধু তত্ত্ব জানা যথেষ্ট নয়; শেখার আসল প্রমাণ হলো প্রয়োগ। অর্থাৎ আপনি কীভাবে শিখলেন তা নয়, আপনি কী বানাতে পারলেন বা কীভাবে বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে পারলেন—সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

ড. আলিমুর রেজা একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে যে অভিজ্ঞতা পান, তা থেকেই এই উপদেশ এসেছে। তিনি মেশিন লার্নিং পড়ান দুই ভাগে—একটি ভাগে ক্লাসিক্যাল মেশিন লার্নিং (পরিসংখ্যানভিত্তিক শেখার পদ্ধতি), আরেক ভাগে ডিপ লার্নিং (নিউরাল নেটওয়ার্কভিত্তিক শেখা)। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই তিনি একই কথা বলেন: তত্ত্ব বুঝতে হবে, আবার সেই তত্ত্বকে বাস্তব ডেটাসেটে প্রয়োগ করে দেখতেও হবে। কারণ বইয়ের অঙ্ক অনেক সময় পরিষ্কার লাগে, কিন্তু বাস্তব ডেটা প্রায়ই এলোমেলো, অসম্পূর্ণ, শব্দযুক্ত, এবং নানা ধরনের পক্ষপাত নিয়ে আসে। তখনই বোঝা যায় শেখা কোথায় শক্ত, কোথায় দুর্বল।

এখানে একটি সহজ উদাহরণ কাজ করে। আপনি যদি কেবল সাইকেল চালানোর নিয়ম মুখস্থ করেন—প্যাডেল ঘোরাতে হয়, ভারসাম্য রাখতে হয়—তাতে আপনি সাইকেল চালাতে পারবেন না। সাইকেল চালাতে হয় সাইকেলেই উঠে। প্রথমে পড়ে যাবেন, হাত-পা কাঁপবে, তারপর ধীরে ধীরে শরীর ভারসাম্য শিখে নেবে। মেশিন লার্নিংও অনেকটা এমন। আপনি অ্যালগরিদমের সূত্র জানলেন, কিন্তু বাস্তব ডেটায় সেটি বসিয়ে দেখলে বোঝা যায়—ডেটা পরিষ্কার করা লাগে, সঠিক ফিচার (ডেটার প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য) বাছাই করতে হয়, ভুলের ধরন বুঝতে হয়, এবং মডেলকে বারবার পরীক্ষা করে উন্নত করতে হয়। এই প্রক্রিয়াই একজন শিক্ষার্থীকে কাগজের জ্ঞান থেকে প্রকৃত দক্ষতায় নিয়ে যায়।

ড. আলিমুর রেজা এই প্রয়োগের দিকটি সহজ করতে কয়েকটি বাস্তব পথও দেখান। মেশিন লার্নিংয়ের ক্লাসিক্যাল অংশে কাজ করতে হলে scikit-learn নামে একটি জনপ্রিয় পাইথন লাইব্রেরি খুব সহায়ক। আর ডিপ লার্নিংয়ের ক্ষেত্রে PyTorch বা TensorFlow ব্যবহার করে নিউরাল নেটওয়ার্ক মডেল তৈরি ও পরীক্ষা করা যায়। তিনি বিশেষভাবে বলেন, বর্তমানে পাইথন হলো এই ক্ষেত্রের প্রধান ভাষা, তাই পাইথনে দখল আনা খুব দরকার। তবে তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন—প্রযুক্তি দ্রুত বদলায়। আজ পাইথন, কাল অন্য কিছু আসতে পারে। তাই ভাষা বা টুলের পাশাপাশি শেখার মূল দক্ষতাটি হলো সমস্যা সমাধানের অভ্যাস।

রোবটিক্সে এসে বাস্তবতা আরও কঠিন, কারণ এখানে শুধু কোডই নয়, হার্ডওয়্যারও দরকার। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে রোবট কেনা ব্যয়বহুল। কিন্তু ড. আলিমুর রেজা দেখান, এখানেও বিকল্প আছে। Gazebo-এর মতো সিমুলেটর (কম্পিউটারের ভেতরে ভার্চুয়াল পরিবেশে রোবট চালানোর সফটওয়্যার) ব্যবহার করে আপনি বাস্তব রোবট ছাড়াও শেখা শুরু করতে পারেন। Habitat-এর মতো এমবডেড এজেন্ট সিমুলেশনে রোবটের আচরণ পরীক্ষা করা যায়। আর যদি সুযোগ থাকে, শিক্ষামুখী রোবট যেমন TurtleBot দিয়ে হাতে-কলমে কাজ করা সম্ভব। তার নিজের ল্যাবে তিনি LoCoBot-এর মতো একাডেমিক রোবটও ব্যবহার করেন। অর্থাৎ রিসোর্স সীমিত হলেও শেখার রাস্তা বন্ধ নয়; বরং সঠিক পথ বেছে নিলেই ধাপে ধাপে এগোনো যায়।

এই উপদেশ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য খুব প্রাসঙ্গিক। কারণ আমাদের অনেকেই বড় বাজেট ছাড়াই শেখার চেষ্টা করি। ড. আলিমুর রেজার কথায়, প্রবলেম সলভিং অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ছোট প্রজেক্ট করুন, বাস্তব ডেটাসেট নিয়ে কাজ করুন, ফলাফল ভুল হলে ভয় না পেয়ে বিশ্লেষণ করুন। আজ একটি সহজ ক্লাসিফিকেশন মডেল বানালেন, কাল একটি ইমেজ টাস্ক চেষ্টা করলেন—এভাবেই দক্ষতা ধীরে ধীরে জমে। বড় ক্যারিয়ার তৈরি হয় ছোট ছোট অনুশীলনের ভেতর দিয়ে।

ড. আলিমুর রেজা আমাদের মনে করিয়ে দেন, শেখা মানে শুধু জানা নয়; শেখা মানে করে দেখা। আর এই করে দেখার পথই একজন শিক্ষার্থীকে গবেষণা, উচ্চশিক্ষা, এবং বাস্তব প্রযুক্তি উন্নয়নের দিকে নিয়ে যায়।

পূর্ণ সাক্ষাৎকারে ড. আলিমুর রেজা তার শিক্ষা–যাত্রা, গবেষণার খুঁটিনাটি, রোবটের ভবিষ্যৎ, এবং এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রশ্নগুলো আরও বিস্তারিতভাবে বলেছেন। নিম্নে ড. আলিমুর রেজার পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এবং ইউটিউবে দেখুন।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles