ড. আলিমুর রেজার এই কথাটি শুনতে প্রথমে একটু কঠিন লাগতে পারে, কারণ আমরা অভ্যাস করে ফেলেছি প্রযুক্তিকে সর্বসমাধান ভাবতে। যেখানেই সমস্যা, সেখানেই এআই বসালেই নাকি সমাধান। কিন্তু একজন কম্পিউটার ভিশন গবেষক যখন বলেন, সমস্যাটা প্রযুক্তির চেয়ে জনসংখ্যা ও চাপের বাস্তবতায় বেশি, তখন তিনি আমাদের চিন্তাকে নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করেন।
ঢাকার যানজটকে আমরা সাধারণত সিগন্যাল, রাস্তাঘাট, ড্রাইভিং আচরণ, কিংবা ট্রাফিক পুলিশিং—এই সব কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করি। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ডেমোগ্রাফি বলতে ড. আলিমুর রেজা যে কথাটি বোঝাতে চান, তা হলো শহরের ধারণক্ষমতা ও মানুষের চাপের হিসাব। কোনো শহরের রাস্তা, গণপরিবহন, পার্কিং, অফিস-স্কুলের অবস্থান, এবং মানুষের চলাচলের ছক—সব মিলিয়ে একটি সীমা থাকে। সেই সীমার বাইরে মানুষ, গাড়ি, এবং চলাচল বেড়ে গেলে, আপনি যতই “বুদ্ধিমান” সিস্টেম বসান, চাপটা শেষ পর্যন্ত কোথাও না কোথাও জমে উঠবেই। ঠিক যেমন ছোট একটি পানির পাইপ দিয়ে যদি একসাথে অতিরিক্ত পানি ঢালেন, পাইপ যত উন্নতই হোক, জ্যাম হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
তবে এর মানে এই নয় যে এআই এখানে একেবারেই কাজ করবে না। ড. আলিমুর রেজার বক্তব্য আসলে ভারসাম্যের দিকে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, আগে সমস্যার ধরন বোঝা দরকার, তারপর ঠিক করতে হবে প্রযুক্তি কোথায় সহায়ক হবে। যদি শহরের চাপটা যুক্তিসঙ্গত সীমার মধ্যে থাকে, এবং আইন-কানুন কার্যকরভাবে মানানো যায়, তাহলে এআই অনেক বাস্তব সুবিধা দিতে পারে। বিশেষ করে কম্পিউটার ভিশনের অবজেক্ট ট্র্যাকিং (ক্যামেরায় চলমান বস্তু শনাক্ত ও অনুসরণ) দিয়ে গাড়ির গতি, লেন ভাঙা, ভুল পথে চলা, অবৈধ পার্কিং—এসব শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু এই শনাক্তকরণ তখনই কাজে দেবে, যখন তা জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত হবে।
তিনি একটি খুব বাস্তব উদাহরণ দেন টোল ব্যবস্থার। যুক্তরাষ্ট্রে কিছু টানেল বা সড়কে ক্যামেরা গাড়ি ট্র্যাক করে এবং টোল স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব করে বিল পাঠিয়ে দেয়। এতে দুটো কাজ একসাথে হয়: প্রযুক্তি গাড়িকে চিনে ফেলে, আর নীতি-ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে বিল পরিশোধ হবে। অর্থাৎ প্রযুক্তি শুধু দেখা বা ধরা নয়, তার সঙ্গে যুক্ত থাকে নিয়ম, প্রয়োগ, এবং শাস্তি বা ইনসেনটিভ। ঢাকার ট্রাফিকেও একই কথা প্রযোজ্য। শুধু ক্যামেরা বসালে হবে না; আইন মানার সংস্কৃতি, জরিমানার স্বচ্ছতা, এবং সঠিক প্রশাসনিক কাঠামো না থাকলে ক্যামেরা কেবল ভিডিও জমা করবে, আচরণ বদলাবে না।
এখানে ড. আলিমুর রেজা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন—দেশীয় উদ্ভাবনের সম্ভাবনা। তিনি ইঙ্গিত দেন যে বাংলাদেশে টোল সংগ্রহ বা ট্র্যাকিং-ধর্মী সমাধান নিয়ে কাজ হচ্ছে, এবং অনেক সময় বিদেশি সমাধান আনা হয়। কিন্তু একই কাজ দেশীয় প্রকৌশলীরাও তুলনামূলক কম খরচে করতে পারে। এই বক্তব্য বাংলাদেশের তরুণদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, টোল অটোমেশন, যানবাহন গণনা, দুর্ঘটনা হটস্পট শনাক্তকরণ—এসব এমন সমস্যা যেখানে বাংলাদেশের বাস্তবতা বুঝে, কম বাজেটে, প্রাসঙ্গিক সমাধান তৈরি করা সম্ভব। এটা শুধু প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়; এটা শহরের জীবনমান ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
তবে ড. আলিমুর রেজা শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেন মূল কথায়: ডেমোগ্রাফি। যদি শহরের চাপ অবাস্তবভাবে বেড়ে যায়, যদি সব প্রতিষ্ঠান, অফিস, শিক্ষা, চিকিৎসা—সবকিছু এক কেন্দ্রে জড়ো হয়, তাহলে প্রযুক্তি কেবল ক্ষত কমাতে পারে, পুরো রোগ সারাতে পারে না। এজন্য সমাধান আসলে বহুস্তর: নগর পরিকল্পনা, বিকেন্দ্রীকরণ, গণপরিবহন উন্নয়ন, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, এবং তার সঙ্গে সহায়ক প্রযুক্তি। এআই সেখানে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, কিন্তু একা নায়ক নয়। প্রযুক্তিকে জাদুবিদ্যা ভেবে নয়, বাস্তব ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
এই কথাটি শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি বড় শিক্ষা। এআই শিখতে গেলে শুধু মডেল বা কোড নয়, বাস্তব সমস্যা বোঝার ক্ষমতা গড়ে তুলতে হয়। কারণ সত্যিকারের সমাধান আসে তখনই, যখন প্রযুক্তি সমাজের কাঠামোর সঙ্গে খাপ খায়। ড. আলিমুর রেজা আমাদের মনে করিয়ে দেন—ভালো বিজ্ঞান মানে কেবল নতুন কিছু বানানো নয়; ভালো বিজ্ঞান মানে ঠিক প্রশ্ন করা এবং বাস্তব সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করা।
পূর্ণ সাক্ষাৎকারে ড. আলিমুর রেজা তার শিক্ষা–যাত্রা, গবেষণার খুঁটিনাটি, রোবটের ভবিষ্যৎ, এবং এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রশ্নগুলো আরও বিস্তারিতভাবে বলেছেন। নিম্নে ড. আলিমুর রেজার পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এবং ইউটিউবে দেখুন।

Leave a comment