প্রায় বছরখানেক আগে অসুস্থতার জন্য একবার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করছিলাম। এক পর্যায়ে একটি ওষুধ নিয়ে তিনি নিজেও কিছুটা অনিশ্চিত ছিলেন। দ্রুত গুগলে গিয়ে বিভিন্ন সূত্র ঘেঁটে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন, তাঁর জানা তথ্যের সঙ্গে অনলাইনের তথ্য মেলে কি না। কিন্তু অনেকক্ষণ খুঁজেও সেই ওষুধের নির্ভরযোগ্য তথ্য তিনি পাচ্ছিলেন না। এমন অভিজ্ঞতা শুধু আমার চিকিৎসকের একার নয়—প্রায়ই ডাক্তারদের এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। কারণ, গুগল বা ইন্টারনেটের তথ্য সবসময় গবেষণাভিত্তিক বা চিকিৎসকের জন্য যথেষ্ট বস্তুনিষ্ঠ হয় না।
কল্পনা করুন, আপনার চিকিৎসক প্রতিটি প্রেসক্রিপশনের আগে সারা বিশ্বের সর্বশেষ গবেষণার ফলাফল এক নিমেষে দেখে নিচ্ছেন। নতুন ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিভিন্ন ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার তথ্য সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছেন। এটি একসময় ছিল প্রায় অসম্ভব কল্পনা—আজ সেই কল্পনাকে বাস্তব করেছে ‘ওপেনএভিডেন্স’, যাকে অনেকে ডাকছেন ‘ডাক্তারদের জন্য চ্যাটজিপিটি’ নামে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ৪০ শতাংশেরও বেশি চিকিৎসক ওপেনএভিডেন্স ব্যবহার করছেন। ২০২৫ সালেই একশো মিলিয়নেরও বেশি আমেরিকান এমন চিকিৎসকের হাতে চিকিৎসা পাবেন, যিনি এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের সহায়তা নিয়েছেন। বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা-সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়ছে—যেখানে মানুষের পক্ষে সবকিছু একসঙ্গে পড়া, যাচাই করা বা মনে রাখা কার্যত অসম্ভব। ওপেনএভিডেন্স এই বিশাল তথ্যসমুদ্র থেকে নির্ভুল ও সাম্প্রতিক তথ্য বাছাই করে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের সামনে তুলে ধরে। কোম্পানির বিশেষ এআই এজেন্ট ‘ডিপকনসাল্ট’ শত শত পিয়ার-রিভিউ করা মেডিকেল গবেষণা কয়েক মিনিটের মধ্যে পড়ে বিশ্লেষণ করতে পারে। শুধু তাই নয়, রোগীর রিয়েল-টাইম মেডিকেল রেকর্ডের সঙ্গে গবেষণার তথ্য মেলাতে মেলাতে ডিপকনসাল্ট এমন পরামর্শ দেয় যা চিকিৎসককে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করে। সঠিক গাইডলাইন খুঁজে বের করা, ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া চিহ্নিত করা কিংবা সম্ভাব্য রোগ নির্ণয়ে দিকনির্দেশ দেওয়া—সবই করে এই একক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এই সাফল্যের গতি বিনিয়োগকারীদের চোখ এড়িয়ে যায়নি। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ওপেনএভিডেন্স ২১০ মিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে, যার ফলে কোম্পানির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। ইতিমধ্যে ছয় বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে। স্বাস্থ্যসেবার মতো সংবেদনশীল ও জটিল খাতে এমন দ্রুত বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে সঠিকভাবে ব্যবহৃত এআই মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং চিকিৎসা-প্রক্রিয়াকে আধুনিক করতে কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ওপেনএভিডেন্সের প্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল ন্যাডলার এই উদ্যোগ শুরু করেন এক গভীর ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে। এক চিকিৎসাগত ভুলের কারণে তিনি তাঁর দাদাকে হারান। সেই আঘাত থেকেই তাঁর সংকল্প—ডাক্তারদের জায়গা নেওয়া নয়, বরং তাঁদের হাতে আরও শক্তিশালী, প্রমাণনির্ভর সরঞ্জাম তুলে দেওয়া। এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে অর্থবহ করে তোলে না, বরং পুরো স্বাস্থ্যসেবা খাতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বিকল্প নয়, বরং মানুষের সিদ্ধান্তকে আরও সঠিক, দ্রুত ও কার্যকর করে তোলার এক অনন্য সহযোগী।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নে এ ধরনের উদ্যোগ বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা সীমিত এবং প্রতিদিন নতুন নতুন গবেষণা প্রকাশিত হচ্ছে, তখন নির্ভরযোগ্য এআই সিস্টেম চিকিৎসকদের জন্য হতে পারে এক অমূল্য সহায়ক। তবে এর সঙ্গে দরকার সঠিক নীতি, ডেটা গোপনীয়তার নিশ্চয়তা এবং চিকিৎসক ও রোগীর পারস্পরিক আস্থা বজায় রাখা। ন্যাডলারের উদাহরণ আমাদের দেখায়, প্রযুক্তির উন্নয়ন তখনই সমাজের জন্য কল্যাণকর হয়, যখন সেটি মানুষের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়—কখনোই তা ছিনিয়ে নেয় না।

Leave a comment