জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে নতুন স্বপ্ন: পরিবেশবান্ধব শক্তির সন্ধানে এক বাংলাদেশি গবেষক
নিউজ ডেস্ক, বিজ্ঞানী অর্গ
যোগাযোগ: [email protected]
“আমার গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো পরিবেশকে ক্ষতি না করে, জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়াই কম খরচে শক্তি উৎপাদন করা।”
দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষণাগারে বসে ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানা যখন এই কথাটি বলেন, তখন সেটি শুধু একজন গবেষকের ব্যক্তিগত গবেষণা-লক্ষ্য নয়; বরং বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটির দিকে ইঙ্গিত করে—জ্বালানি সংকট ও পরিবেশ দূষণ।
আজকের পৃথিবী বিদ্যুৎ ছাড়া অচল। ঘরের বাতি, মোবাইল ফোন, হাসপাতালের যন্ত্র, কারখানার উৎপাদন, শহরের পরিবহন—সবকিছুর পেছনে রয়েছে শক্তি বা এনার্জি। কিন্তু এই শক্তির বড় অংশ এখনো আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে—কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। এগুলো দীর্ঘদিন ধরে মানবসভ্যতার উন্নয়নের চালিকাশক্তি হলেও এর মূল্য দিতে হচ্ছে প্রকৃতিকে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ালে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ নানা ক্ষতিকর গ্যাস তৈরি হয়, যা বায়ুদূষণ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ।
এই বাস্তবতায় বিজ্ঞানীরা খুঁজছেন এমন জ্বালানি ব্যবস্থা, যা পরিবেশের ক্ষতি করবে না, আবার মানুষের শক্তির চাহিদাও পূরণ করবে। ড. মাসুদ রানার গবেষণার কেন্দ্রেও রয়েছে সেই প্রশ্ন—আমরা কি কম খরচে পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদন করতে পারি?
তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র হাইড্রোজেন এনার্জি। হাইড্রোজেনকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় জ্বালানি হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এটি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর প্রধান উপজাত হিসেবে তৈরি হয় পানি। অর্থাৎ কয়লা বা তেলের মতো ক্ষতিকর ধোঁয়া বা কার্বন নির্গমন এখানে নেই। সহজ ভাষায় বলা যায়, হাইড্রোজেন শক্তি এমন এক পথ দেখায় যেখানে শক্তি উৎপাদন করা যাবে, কিন্তু প্রকৃতিকে আগের মতো ক্ষতবিক্ষত করতে হবে না।
ড. রানার গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খরচ কমানো। বর্তমানে হাইড্রোজেনভিত্তিক প্রযুক্তি, যেমন ফুয়েল সেল বা ওয়াটার ইলেকট্রোলাইজারে প্লাটিনাম ও ইরিডিয়ামের মতো মূল্যবান ধাতু ব্যবহৃত হয়। এগুলো খুব কার্যকর হলেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সীমিত। ফলে এই প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের পর্যায়ে আনতে বড় বাধা তৈরি হয়।
এই বাধা দূর করার জন্য তিনি কাজ করছেন নন-নোবেল মেটাল ক্যাটালিস্ট নিয়ে। ক্যাটালিস্ট হলো এমন পদার্থ, যা রাসায়নিক বিক্রিয়াকে সহজ করে, কিন্তু নিজে শেষ হয়ে যায় না। রান্নায় যেমন চুলার আগুন খাবার তৈরির প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়, তেমনি ক্যাটালিস্ট রাসায়নিক বিক্রিয়াকে কার্যকর করে। যদি প্লাটিনামের বদলে নিকেল, আয়রন, কোবাল্ট বা মলিবডেনামের মতো তুলনামূলক সস্তা ও সহজলভ্য ধাতু দিয়ে একই কাজ করা যায়, তাহলে হাইড্রোজেন প্রযুক্তির খরচ অনেক কমে আসতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই গবেষণার গুরুত্ব আরও বেশি। আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় অংশ আমদানি-নির্ভর। তেলের দাম বাড়লে বা বৈশ্বিক সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। অথচ আমাদের রয়েছে পানি, সূর্যালোক এবং নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা। যদি ভবিষ্যতে পানি থেকে হাইড্রোজেন তৈরি করে তা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়, তাহলে জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত খুলতে পারে।
তবে এই পথ সহজ নয়। গবেষণাগারের প্রযুক্তিকে বাস্তব জীবনে ব্যবহারযোগ্য করতে সময়, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং প্রকৌশলগত উন্নয়ন প্রয়োজন। কিন্তু সব বড় পরিবর্তনের শুরুই হয় গবেষণাগারের ছোট ছোট প্রশ্ন থেকে। ড. মাসুদ রানার কাজ সেই ধরনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা—কীভাবে আমরা পরিবেশের ক্ষতি না করে শক্তি উৎপাদন করব?
জীবাশ্ম জ্বালানি মানবসভ্যতাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের এখন নতুন পথ খুঁজতে হবে। সেই পথ হতে পারে হাইড্রোজেন, হতে পারে আরও উন্নত নবায়নযোগ্য শক্তি প্রযুক্তি। আর এই পরিবর্তনের যাত্রায় বাংলাদেশের গবেষকরাও যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন, ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার কাজ তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment