শিরোনাম: কৃষ্ণগহ্বরের সীমা কোথায়? মহাবিশ্ব কি আমাদের কল্পনার চেয়েও অন্ধকার? মানুষের চোখে আকাশ যতই রহস্যময় হোক না কেন, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একের পর এক পর্দা সরিয়ে দিচ্ছেন। বিগত কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণ এখন প্রমাণ করেছে, প্রতিটি বৃহৎ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে লুকিয়ে আছে এক একটি সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বর। সেগুলো হলো এমন এক মহাজাগতিক দৈত্য, যাদের ভেতরে আলো পর্যন্ত আটকা পড়ে যায়। তবে প্রশ্ন হলো—এই কৃষ্ণগহ্বর আসলে কতটা বড় হতে পারে? মানুষের জিজ্ঞাসা এখানেই থেমে নেই। বরং এই কৌতূহল থেকেই নতুন নতুন গবেষণা জন্ম নিচ্ছে, যা আমাদের মহাবিশ্ব বোঝার ক্ষেত্রকে প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে। বর্তমানে আমরা যেসব কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে জানি, সেগুলোর ভর মাপা হয়েছে সূর্যের ভরের সাথে তুলনা করে। এ ক্ষেত্রে অসংখ্য অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, কারণ কৃষ্ণগহ্বরের ভর নির্ণয় কোনো সহজ গণনা নয়। পর্যবেক্ষণ, মহাকর্ষীয় প্রভাব, ও জটিল পদার্থবিদ্যা সব একসাথে বিশ্লেষণ করতে হয়। তবুও বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, সবচেয়ে বড় কৃষ্ণগহ্বর হয়তো কয়েক দশ বিলিয়ন সূর্যের ভরের সমান হতে পারে। কেউ কেউ আবার বলেছেন, তাত্ত্বিকভাবে এটি বেড়ে ২৭০ বিলিয়ন সূর্যের ভর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। যদিও বাস্তবে এত বিশাল আকারের কোনো কৃষ্ণগহ্বরের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আমরা যদি সবচেয়ে বড় সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বর খুঁজেও পাই, সেটির ভর সম্ভবত ৫০ বিলিয়ন সূর্যের ভরের বেশি হবে না। এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে, সীমাবদ্ধতাটা আসলে কোথায়? কেন কৃষ্ণগহ্বর অনন্তকাল ধরে সবকিছু গিলে খেতে পারে না? উত্তরটা জটিল, কিন্তু আকর্ষণীয়ও বটে। সাধারণভাবে আমরা ভাবি কৃষ্ণগহ্বর এক মহাজাগতিক ধ্বংসস্তূপ, যেখানে যা কিছু পড়ে সব চিরতরে হারিয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে পদার্থের অনেকটাই সরাসরি ভেতরে পড়ে যায় না। বরং তা কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে জমা হয়ে গড়ে তোলে একটি accretion disk বা আহরণীয় চাকতি। এই চাকতির ভেতরে পদার্থগুলো ঘর্ষণের ফলে এতটাই উত্তপ্ত হয় যে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী বিকিরণ তৈরি হয়। সেই বিকিরণ আবার নতুন করে কাছে আসতে চাওয়া পদার্থকে প্রতিহত করে। যেন মহাবিশ্ব নিজেই এক প্রহরী বসিয়ে রেখেছে, যাতে কৃষ্ণগহ্বর সীমাহীনভাবে বাড়তে না পারে। শুধু তাই নয়, এই আহরণীয় চাকতির ভেতরে বিদ্যমান শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র পদার্থকে কখনো ভেতরের দিকে টেনে নেওয়ার বদলে বাইরে ঠেলে দেয়। ফলে কৃষ্ণগহ্বরের “ক্ষুধা” যতই তীব্র হোক না কেন, মহাবিশ্বে তার জন্য অদৃশ্য এক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করছে। এই ভারসাম্যই হয়তো আমাদের গ্যালাক্সিগুলোকে স্থিতিশীল রেখেছে। যদি কৃষ্ণগহ্বরের বৃদ্ধি একেবারেই অবারিত হতো, তবে হয়তো মহাবিশ্ব আজ অন্য রকম হতো—সম্ভবত জীবন ধারণের মতো জটিল কাঠামোও গড়ে উঠতো না। তবে বিজ্ঞান থেমে থাকে না। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সবসময়ই প্রস্তুত থাকেন নিজেদের ধারণা পুনর্বিবেচনা করতে। নতুন কোনো পর্যবেক্ষণ, নতুন কোনো সংখ্যা এলে পুরোনো ধারণা ভেঙে আবার দাঁড় করাতে হয় নতুন মডেল। এটাই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য—অবিরাম সংশোধন ও পুনর্নির্মাণ। যেমন, আজ আমরা হয়তো বলছি ৫০ বিলিয়ন সূর্যের ভরের বেশি কৃষ্ণগহ্বর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু কাল যদি মহাবিশ্ব আমাদের সামনে নতুন কোনো দৈত্য উন্মোচন করে, তবে আমাদের জ্ঞানভাণ্ডার আরও প্রসারিত হবে। বিজ্ঞানী ফিল প্লেইট যেমন বলেছেন, “মহাবিশ্ব আমাদের চেয়ে অনেক বুদ্ধিমান। হয়তো কোনোদিন এমন এক কৃষ্ণগহ্বর পাওয়া যাবে যা আমাদের সব হিসাব পাল্টে দেবে। তখনই আমাদের প্রিয় কাজ শুরু হবে—পূর্বের ধারণাগুলোতে কোথায় ভুল ছিল, তা খুঁজে বের করা।” কৃষ্ণগহ্বরের এই আলোচনা আমাদের জন্য কেবল বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নয়, এক ধরনের দার্শনিক ভাবনারও খোরাক। মানুষ হিসেবে আমরা সীমাহীন জানতে চাই, বুঝতে চাই। কিন্তু প্রকৃতি যেন ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু রহস্য অক্ষত রাখে। আমরা ধাপে ধাপে যতটুকু পারি উন্মোচন করি, আর ততটুকুই শিখি। হয়তো কৃষ্ণগহ্বরের মতো অন্ধকার দৈত্যগুলো আমাদের শেখাচ্ছে, জ্ঞানেরও সীমা আছে, কিন্তু সেই সীমা অন্বেষণের আনন্দই আসল শক্তি। মহাবিশ্ব যতবার আমাদের অবাক করবে, আমরা ততবার নতুন করে শিখব। তাই কৃষ্ণগহ্বরের আকার যেখানে গিয়ে থেমেই হোক, মানুষের জিজ্ঞাসা থামবে না। সেই অদম্য কৌতূহলই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে আরও দূর, আরও গভীর অন্ধকারে, যেখানে আলো পর্যন্ত পৌঁছায় না—কিন্তু জ্ঞান অবশ্যই পৌঁছায়।
এই হলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে অন্ধকার রহস্যের একটি টুকরো। কৃষ্ণগহ্বর হয়তো আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর, কিন্তু এগুলোই প্রমাণ করে বিজ্ঞান কীভাবে প্রতিনিয়ত কল্পনার সীমানা ভেঙে আমাদের সামনে নতুন সত্য হাজির করে। সীমাহীন কৌতূহল ও প্রশ্ন করার সাহসই আমাদের মানবিকতার অন্যতম পরিচয়। আর তাই কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে আলোচনায় আমরা হয়তো আলোর সন্ধানই পাই—অন্ধকারকে বুঝে ওঠার প্রচেষ্টা থেকেই।

Leave a comment