কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতথ্যপ্রযুক্তি

“বাস্তব পৃথিবী কি আর যথেষ্ট নয়? মেটাভার্স কি আমাদের জীবনের নতুন ঠিকানা হতে যাচ্ছে?”

Share
Share

আজ আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেটি কি সত্যিই আমাদের শেষ গন্তব্য? নাকি আমরা ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছি, যেখানে বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমারেখা মুছে যাবে? “মেটাভার্স”নামের যে ধারণাটি নিয়ে এত আলোচনা, সেটি কি শুধুই প্রযুক্তির নতুন ধাপনাকি এটি মানব সভ্যতার একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা?

মেটাভার্সমূলত একটিত্রিমাত্রিক ভার্চুয়াল জগৎ, যেখানে মানুষ শুধু দেখবে নাবরং বাস করবে, কাজ করবে, শিখবে এবং সম্পর্ক গড়বে। এটি বর্তমান ইন্টারনেটের মতো নয়, যেখানে আমরা স্ক্রিনের বাইরে থাকি; বরং এখানে আমরা সেই জগতের ভেতরে প্রবেশ করি। কল্পনা করুনআপনি ঘরে বসে আছেন, কিন্তু আপনার একটি ভার্চুয়াল সংস্করণ (অ্যাভাটার) অন্য দেশে গিয়ে মিটিং করছে, ক্লাস করছে বা এমনকি নতুন কোনো দক্ষতা শিখছে। প্রশ্ন হলোএটি কি সুবিধা, নাকি আমাদের বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার শুরু?

এই ধারণা একেবারে নতুন নয়।১৯৯২ সালে নীল স্টিফেনসনের উপন্যাসস্নো ক্র্যাশএ প্রথম “মেটাভার্স” শব্দটি ব্যবহৃত হয়।। কিন্তু এর বাস্তব ভিত্তি তৈরি হয়েছে ১৯৭০এর দশকের গেমিং ইন্ডাস্ট্রিতে। শুরুতে যেখানে ছিল শুধুই টেক্সট-ভিত্তিক গেম, আজ সেখানে উন্নত ত্রিমাত্রিকগ্রাফিক্স, রিয়েলটাইম ইন্টারঅ্যাকশন এবং লক্ষকোটি মানুষের অংশগ্রহণ। ১৯৯৭ সালে গেমিং ইন্ডাস্ট্রির বাজার ছিল মাত্র ১৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২১৪ বিলিয়ন ডলারে। এই প্রবৃদ্ধি কি শুধু বিনোদনের জন্য? নাকি এটি একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের পূর্বাভাস?

মেটাভার্সএর প্রভাব ইতোমধ্যেই আমাদের পরিচিত অনেক শিল্পে পড়তে শুরু করেছে। চলচ্চিত্র নির্মাণে“ইন্ডাস্ট্রিয়াল লাইট অ্যান্ড ম্যাজিক”এর “মঞ্চনির্মাণ” প্রযুক্তি একটি বিপ্লব এনে দিয়েছে। আগে যেখানে একটি দৃশ্য নির্মাণ করতে মাসের পর মাস সময় লাগত, এখন আলোকিত পর্দার মাধ্যমে ভার্চুয়াল সেট তৈরি করে তাৎক্ষণিকভাবে শুটিং করা সম্ভব। এতে খরচ কমছে, সময় বাঁচছে এবং সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত খুলছে। তাহলে কি ভবিষ্যতে বাস্তব লোকেশন আর প্রয়োজনই হবে না?

শুধু বিনোদন নয়, মেটাভার্স অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। ফেসবুক তার নাম পরিবর্তন করে “মেটা” করেছে এবং শুধুমাত্র ২০২১ সালেই ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। মাইক্রোসফট ৬৯ বিলিয়ন ডলারে এক্টিভিশন বিলিজার্ড কিনেছে। ২০২২ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই মেটাভার্সসম্পর্কিত বিনিয়োগ ১২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছেএত বড় বড় প্রতিষ্ঠান কি শুধুই কল্পনার পেছনে বিনিয়োগ করছে, নাকি তারা এমন কিছু দেখছে যা আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি?

মেটাভার্সএর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলোএটি শুধু বড় কোম্পানির জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও সুযোগ তৈরি করছে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় রোবল্কস প্ল্যাটফর্ম। এখানে দুই তরুণ ডেভেলপার একটি গেম তৈরি করে বছরে প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার আয় করছে। তারা কোনো বড় কোম্পানির অংশ নয়, বরং একটি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছে। তাহলে কি ভবিষ্যতে চাকরির ধারণাই বদলে যাবে?

মেটাভার্সশুধুঅর্থনীতি বা বিনোদনেই সীমাবদ্ধ নয়এটি বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানেও ভূমিকা রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, লকহিড মার্টিন কোম্পানী আগুন নেভানোর কাজে এআই ও থ্রিডি ভিজুয়ালাইজেশন ব্যবহার করছে, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করছে। আবার “ডিজিটাল টুইন” প্রযুক্তি বাস্তব বিশ্বের একটি নিখুঁত ভার্চুয়াল কপি তৈরি করে, যার মাধ্যমে কারখানা, শহর বা এমনকি পুরো পৃথিবীর কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এনভিডিয়া এর “আর্থ-২” প্রকল্প পৃথিবীর আবহাওয়ার একটি ডিজিটাল মডেল তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তন পূর্বাভাস দিতে সহায়ক হতে পারে। তাহলে কি আমরা ভবিষ্যতে বাস্তব পৃথিবীর আগে ভার্চুয়াল পৃথিবী বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেব?

চিকিৎসা ক্ষেত্রেও মেটাভার্সবিপ্লব আনছে। জন হোপকিনসন ইউনিভার্সিটিতে অগমেন্টেড রিয়েলিটি ব্যবহার করে মেরুদণ্ডের সার্জারি করা হচ্ছে, যেখানে ৯৮% নির্ভুলতা অর্জিত হয়েছে। একজন সার্জন অপারেশনের সময় রোগীর শরীরের ভেতরের থ্রিডি ইমেজ দেখতে পাচ্ছেন, ঠিক যেন জিপিএসএর মতো নির্দেশনা পাচ্ছেন। এই প্রযুক্তি কি ভবিষ্যতে চিকিৎসাকে আরও নিরাপদ ও নির্ভুল করবে, নাকি এটি মানুষের দক্ষতার উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেবে?

তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বর্তমানে মেটাভার্সএর জন্য কোনো একক মান স্ট্যান্ডার্ড নেই, যেমন এইচটিএমএল ইন্টারনেটের জন্য রয়েছে। ফলে বিভিন্ন ভার্চুয়াল জগতের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা কঠিন। এছাড়া, এই বিশাল প্রযুক্তিকে চালাতে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন ইন্টেল এর মতে, প্রায় হাজার গুণ বেশি ক্ষমতা দরকার হবে। তাহলে প্রশ্ন হলোআমরা কি প্রযুক্তিগতভাবে এই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত?

সবশেষে, মেটাভার্স শুধু একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়এটি একটি সামাজিক পরিবর্তন। এটি আমাদের আচরণ, সম্পর্ক, কাজের ধরন এবং এমনকি বাস্তবতার ধারণাকেও বদলে দিতে পারে। হয়তো একদিন “বাস্তব” বলতে আমরা শুধু সেই জগতকেই বুঝব না, যেখানে আমরা শারীরিকভাবে উপস্থিত আছি।তাই প্রশ্নটি থেকেই যায় মেটাভার্স কি আমাদের জীবনের পরবর্তী ধাপ, নাকি এটি এমন এক জগৎ যেখানে আমরা ধীরে ধীরে নিজেদের হারিয়ে ফেলব?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে এই বিপুল সম্ভাবনার ব্যবসা ও প্রভাবকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের এখনই কী ভূমিকা নেওয়া উচিত?বিশেষ করে শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারকে ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, ভার্চুয়াল শেখার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ত্রিমাত্রিক অভিজ্ঞতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতের দক্ষতা অর্জন করতে পারে। অন্যদিকে, চিকিৎসা ক্ষেত্রে বর্ধিত বাস্তবতা ও ভার্চুয়াল প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য নীতিমালা, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা জরুরি, যাতে চিকিৎসার মান উন্নত হয় এবং ঝুঁকি কমে। পাশাপাশি ডেটা সুরক্ষা, নৈতিক ব্যবহার এবং প্রযুক্তির সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। কারণ এখনই যদি সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ না করা হয়, তাহলে এই নতুন বিশ্বে আমরা শুধু ভোক্তা হয়ে থাকবনেতৃত্ব দিতে পারব না।

ড. মোর্ত্তুজা আহমেদ
সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
Email: [email protected]

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org