বিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন আবিষ্কার প্রায় সব সময়ই একটি সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়েছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ও গবেষণার সংস্কৃতিতে প্রশ্ন করার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের কথায়, “আমরা অনেক প্রশ্ন করি না বলেই অনেক কিছু আবিষ্কার হয় না।” এই একটি বাক্যের মধ্যেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণা সংস্কৃতির একটি বড় দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভরতা প্রবল। পরীক্ষায় ভালো ফল করা মানেই সাফল্য—এই ধারণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে বইয়ে লেখা তথ্যকে প্রশ্ন না করে গ্রহণ করাই অভ্যাসে পরিণত হয়। কিন্তু বিজ্ঞানচর্চা ঠিক এর উল্টো পথে হাঁটে। বিজ্ঞান মানে প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে যাচাই করা, প্রয়োজনে সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং নতুন প্রমাণের আলোকে ধারণা বদলানো। ড. আশরাফউদ্দিনের অভিজ্ঞতায়, গবেষণাগারে যারা সবচেয়ে ভালো করেন, তারা প্রায়ই “কেন” ও “কিভাবে” প্রশ্ন করতে দ্বিধা করেন না।
প্রশ্ন না করার সংস্কৃতি শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। পরিবেশ দূষণ, খাদ্য নিরাপত্তা বা জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা অনেক সময় আমরা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিই। কেন নদীর পানি ক্রমে দূষিত হচ্ছে, কেন শহরের বাতাস শ্বাস নেওয়ার অযোগ্য হয়ে উঠছে—এসব প্রশ্ন তুলতে না পারলে সমস্যার গভীরে যাওয়া সম্ভব হয় না। গবেষণার সূচনা হয় ঠিক এই ধরনের সামাজিক প্রশ্ন থেকে।
ড. আশরাফউদ্দিনের গবেষণাজীবনে প্রশ্ন করার সাহস কীভাবে নতুন জ্ঞান তৈরি করতে পারে, তার স্পষ্ট উদাহরণ আছে। ট্রিপটোফ্যান সিনথেস এনজাইম নিয়ে কাজ করার সময় সবাই ধরে নিয়েছিল, এই এনজাইম একটি নির্দিষ্ট কাজই করতে পারে। কিন্তু তিনি প্রশ্ন করেছিলেন—“কেন পারবে না অন্যভাবে কাজ করতে?” এই প্রশ্ন থেকেই পরীক্ষার নকশা বদলানো হয় এবং নতুন ফলাফল পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রশ্ন করাই নতুন আবিষ্কারের দরজা খুলে দেয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন করার অভ্যাস না থাকলে গবেষণার প্রতি আগ্রহও জন্মায় না। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করা জরুরি—শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে মুক্ত আলোচনা, ক্লাসরুমে বিতর্ক, প্রকল্পভিত্তিক শেখা—এসব পদ্ধতি প্রশ্নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে। ড. আশরাফউদ্দিনের মতে, ভুল প্রশ্ন বলে কিছু নেই; ভুল উত্তর থাকতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন না করলে শেখার সুযোগও থাকে না।
সবশেষে বলা যায়, এই একটি বাক্য—“আমরা অনেক প্রশ্ন করি না বলেই অনেক কিছু আবিষ্কার হয় না”—শুধু বিজ্ঞানের জন্য নয়, সমাজের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রশ্ন করতে শেখা মানে কেবল নতুন তথ্য পাওয়া নয়; প্রশ্ন করতে শেখা মানে সমস্যার মূল পর্যন্ত পৌঁছানোর সাহস অর্জন করা। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের এই উপলব্ধি আমাদের শেখায়—যদি আমরা আরও বেশি প্রশ্ন করতে পারি, তাহলে হয়তো আরও অনেক নতুন পথ খুলে যাবে আমাদের সামনে।
ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment