বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও গঠন নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানে তীব্র তাত্ত্বিক বিতর্ক চলছিল। একদিকে ছিল প্রসারণশীল মহাবিশ্ব ও বিগ ব্যাং তত্ত্বের উত্থান, অন্যদিকে কিছু বিজ্ঞানী মহাবিশ্বকে চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় রূপে কল্পনা করতে চেয়েছিলেন। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এক প্রভাবশালী কণ্ঠ ছিলেন ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেড হয়ল (Fred Hoyle)। তাঁর জনপ্রিয় বিজ্ঞানগ্রন্থ ‘দ্য নেচার অফ দ্য ইউনিভার্স’ (The Nature of the Universe) সাধারণ পাঠকের কাছে মহাবিশ্বের মৌলিক প্রশ্নগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।
হয়লের বইটি মূলত মহাবিশ্বের উৎপত্তি, গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তন নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সারসংক্ষেপ। তিনি এখানে মহাবিশ্বকে কেবল দূরবর্তী নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি গতিশীল ও নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর লেখায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ—যেমন গ্যালাক্সির প্রসারণ, নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যু—সহজ উদাহরণ ও রূপকের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে, যাতে অ-বিশেষজ্ঞ পাঠকও আধুনিক কসমোলজির ধারণাগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।
এই বইটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—হয়ল এখানে বিগ ব্যাং তত্ত্বের প্রতি সংশয় প্রকাশ করেন। তিনিই বিখ্যাতভাবে রেডিও বক্তৃতায় বিদ্রূপাত্মক অর্থে “Big Bang” শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, যা পরে তত্ত্বটির নাম হিসেবেই জনপ্রিয় হয়ে যায়। ‘দ্য নেচার অফ দ্য ইউনিভার্স’-এ তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা প্রস্তাবিত স্টেডি-স্টেট মডেল বা স্থিরাবস্থা মহাবিশ্ব তত্ত্বের পক্ষে যুক্তি দেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্ব প্রসারিত হলেও গড় ঘনত্ব অপরিবর্তিত থাকে, কারণ নতুন পদার্থ ক্রমাগত সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও পরবর্তী পর্যবেক্ষণ—বিশেষ করে মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিকিরণ (CMB) আবিষ্কার—বিগ ব্যাং তত্ত্বকে শক্তভাবে সমর্থন করে এবং স্টেডি-স্টেট মডেলকে প্রায় বাতিল করে দেয়, তবু হয়লের এই ভিন্নমত কসমোলজিতে স্বাস্থ্যকর বৈজ্ঞানিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
হয়লের আরেকটি বড় অবদান ছিল নক্ষত্রের ভেতরে মৌলিক উপাদান সৃষ্টি (stellar nucleosynthesis) নিয়ে তাঁর কাজ। যদিও এই নির্দিষ্ট বিষয়টি বইটির কেন্দ্রে সবসময় থাকে না, তবু ‘দ্য নেচার অফ দ্য ইউনিভার্স’-এর আলোচনায় নক্ষত্রের জীবনচক্র ও ভারী মৌলের উৎপত্তির প্রসঙ্গ উঠে আসে। এর মধ্য দিয়ে পাঠক বুঝতে পারেন—আমাদের শরীরের কার্বন, অক্সিজেন বা লোহার মতো মৌলগুলো আসলে কোনো এক প্রাচীন নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এই উপলব্ধি মানুষকে মহাবিশ্বের সঙ্গে একটি গভীর অস্তিত্বগত সম্পর্কের মধ্যে যুক্ত করে।
আজকের দৃষ্টিতে হয়লের অনেক তাত্ত্বিক অবস্থান—বিশেষ করে স্টেডি-স্টেট মডেল—বৈজ্ঞানিকভাবে টিকে নেই। তবু ‘দ্য নেচার অফ দ্য ইউনিভার্স’ বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এটি দেখায়, বিজ্ঞান এগিয়ে যায় মতবিরোধ, প্রশ্ন ও বিকল্প ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে। হয়ল আমাদের শেখান যে প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহসই বিজ্ঞানকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। মহাবিশ্বকে বোঝার পথে এই বইটি তাই কেবল তথ্যের ভাণ্ডার নয়; বরং বৈজ্ঞানিক কৌতূহল ও মুক্ত চিন্তার এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।

Leave a comment