সম্পাদকীয়

পাবলিকেশনের প্রতিযোগিতার ভিড়ে কি হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত বিজ্ঞান?  

Share
Share

মঞ্জুরুল ইসলাম

একসময় বিজ্ঞানচর্চার মূল দর্শন ছিল সত্য অনুসন্ধান, জ্ঞানের পরিসর বিস্তৃত করা এবং মানবজাতির বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজা। একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ মানে ছিল দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, ব্যর্থতা, পুনরাবৃত্ত পরীক্ষা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং গভীর বৈজ্ঞানিক চিন্তার সমন্বিত ফলাফল। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে, যেখানে গবেষণার প্রকৃত বৈজ্ঞানিক অবদানের চেয়ে পাবলিকেশন সংখ্যা অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ধীরে ধীরে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে “কতগুলো আর্টিকেল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে” সেটিই গবেষকের দক্ষতা, যোগ্যতা এবং সফলতার প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে গবেষণার মৌলিক উদ্দেশ্য—নতুন জ্ঞান সৃষ্টি—অনেক ক্ষেত্রেই পাবলিকেশন কম্পিটিশনের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যান্কিং, গবেষণা অনুদান, প্রমোশন, স্কলারশিপ, ফ্যাকাল্টি নিয়োগ, এমনকি একজন গবেষকের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও অনেকাংশে প্রকাশনা সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। Impact factor, Citation count, h-index, Quartile ranking (Q1/Q2)—এসব সংখ্যাগত সূচক গবেষণার গুণগত মূল্যায়নের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। এর ফল হিসেবে “publish or perish” সংস্কৃতি এখন প্রায় বৈশ্বিক বাস্তবতা। বিশেষ করে PhD গবেষণায় এই প্রবণতা অত্যন্ত স্পষ্ট। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে গবেষণার মৌলিকত্ব, দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বা বাস্তব সমস্যার সমাধানের সক্ষমতার চেয়ে পাবলিকেশন সংখ্যা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, অনেক ক্ষেত্রে একজন PhD গবেষক কতগুলো আর্টিকেল প্রকাশ করেছেন, সেটিই তার গবেষণার মান নির্ধারণের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। পুরো অ্যাকাডেমিক যাত্রায় Quality publication এর থেকে Quantity of publication বেশি গুরুত্ব বহন করছে।  গবেষকরা অনেক সময় গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি একটি শক্তিশালী গবেষণার পরিবর্তে দ্রুত publication পাওয়ার জন্য গবেষণাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করছেন, যাকে “salami slicing” বলা হয়। এতে পাবলিকেশন সংখ্যা বাড়লেও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানভাণ্ডারে মানসম্মত অবদান যুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এই সংখ্যাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি গবেষণার গুণগত মানকে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বর্তমানে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলেও সেগুলোর একটি বড় অংশ খুব সীমিত বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বহন করে। অনেক পেপারেই দেখা যায় হাইপোথিসিস দুর্বল, এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইন অপর্যাপ্ত, স্যাম্পল সাইজ অযৌক্তিকভাবে ছোট, অথবা statistical analysis যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। এমনকি অনেক গবেষণার ফলাফল reproducible নয়, অর্থাৎ একই experiment পুনরায় করলে একই ফল পাওয়া যায় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে “reproducibility crisis” বিজ্ঞানজগতে একটি বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে biomedical science, psychology এবং environmental research-এর মতো ক্ষেত্রে। অর্থাৎ পেপারের সংখ্যা বাড়লেও গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা এবং বৈজ্ঞানিক দৃঢ়তা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। বরং literature-এর মধ্যে নিম্নমানের বা দুর্বল গবেষণার সংখ্যা বাড়ার ফলে প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলো অনেক সময় তথ্যের ভিড়ে চাপা পড়ে যাচ্ছে। এছাড়াও কিছু গবেষক দ্রুত প্রকাশনার জন্য তথ্য বিকৃতি, plagiarism, citation manipulation কিংবা data fabrication-এর মতো অনৈতিক পন্থা গ্রহণ করছেন। গবেষণাকে জ্ঞানের অনুসন্ধান নয়, বরং ক্যারিয়ার প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হিসেবে দেখার প্রবণতা ধীরে ধীরে বৈজ্ঞানিক সততাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। 

এই সংকটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা শিল্পের বাণিজ্যিকীকরণ। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক পাবলিকেশন ইন্ডাস্ট্রি একটি বহু-বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। গবেষকরা গবেষণা করেন, ডাটা সংগ্রহ করেন, manuscript লেখেন, peer review করেন, কিন্তু এই সমগ্র ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে পাবলিশিং কোম্পানিগুলো। অনেক ওপেন-অ্যাক্সেস জার্নালে পাবলিকেশন ফি হাজার হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে পেপার যত বেশি প্রকাশিত হবে, পাবলিশারদের আর্থিক লাভও তত বাড়বে। এই বাণিজ্যনির্ভর প্রকাশনা মডেল অনেক ক্ষেত্রে manuপাবলিকেশনের পরিমাণ বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করছে। বিশেষ করে predatory journal বা নিম্নমানের journal-গুলো এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব journal প্রকৃত peer review ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে দ্রুত পেপার পাবলিশ করে দেয়। এর ফলে দুর্বল, অপরীক্ষিত, এমনকি বিভ্রান্তিকর গবেষণাও “সায়েন্টিফিক পাবলিকেশন” হিসেবে লিটারেচারের অংশ হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও এই সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। Artificial Intelligence বা AI গবেষণার সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে অসাধারণ সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর অপব্যবহার এখন বড় উদ্বেগের কারণ। AI ব্যবহার করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই literature summary, manuscript draft, graph, statistical code এমনকি reference list পর্যন্ত তৈরি করা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী বা গবেষকরা গবেষণার বিষয়টি গভীরভাবে না বুঝেই AI-generated লেখা ব্যবহার করছেন। এর ফলে scientific writing-এর ভাষাগত কাঠামো হয়তো তৈরি হচ্ছে, কিন্তু গবেষণার analytical depth, critical reasoning এবং conceptual understanding তৈরি হচ্ছে না। ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে AI-generated fake image, fabricated graph, duplicated microscopy figure এবং অস্তিত্বহীন reference ব্যবহারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। ফলে publication সংখ্যা হয়তো দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু প্রকৃত scientific input সেই অনুপাতে বাড়ছে না।

এই প্রবণতার একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক হলো নতুন প্রজন্মের কিছু শিক্ষার্থীর গবেষণা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে research একটি শেখার প্রক্রিয়া নয়, বরং দ্রুত CV সমৃদ্ধ করার উপায় হয়ে উঠছে। literature review গভীরভাবে পড়া, methodology বোঝা, experimental uncertainty বিশ্লেষণ, statistical interpretation শেখা কিংবা scientific writing-এর দক্ষতা অর্জনের প্রতি আগ্রহ অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাচ্ছে। বরং “কীভাবে দ্রুত paper publish করা যায়”—সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব অবদান ছাড়াই paper-এ authorship পাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। কেউ data analysis করেননি, কেউ manuscript লেখেননি, কেউ experimental work-এ অংশ নেননি—তবুও paper-এ নাম যুক্ত করার প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও ডাটা  এটি শুধু গবেষণার নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করছে না, বরং ভবিষ্যতের গবেষকদের দক্ষতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কারণ গবেষণা শুধুমাত্র একটি publication নয়; এটি একটি intellectual training process, যেখানে ধৈর্য, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং বৈজ্ঞানিক সততা তৈরি হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিম্নমানের publication বৃদ্ধির ফলে পুরো scientific ecosystem ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যখন literature-এ বিপুল সংখ্যক দুর্বল বা বিভ্রান্তিকর paper যুক্ত হয়, তখন meta-analysis, systematic review এবং evidence-based decision-making-ও প্রভাবিত হয়। অর্থাৎ নিম্নমানের publication শুধু একটি দুর্বল paper তৈরি করছে না; এটি ভবিষ্যতের গবেষণার ভিত্তিকেও দূষিত করছে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিজ্ঞান সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। কারণ “গবেষণায় প্রমাণিত” কথাটি এখন এত বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে যে অনেক মানুষ প্রকৃত বিজ্ঞান ও pseudo-science-এর পার্থক্য বুঝতে পারছেন না। কোভিড-১৯ মহামারির সময় vaccine misinformation, ভুয়া চিকিৎসা পদ্ধতি এবং বিভ্রান্তিকর তথাকথিত “scientific claim”-এর বিস্তার এই সংকটের বাস্তব উদাহরণ।

তাই এখন গবেষণার মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। publication সংখ্যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই গবেষণার একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। একটি ছোট কিন্তু সৎ, reproducible এবং scientifically rigorous গবেষণা অনেক সময় শতাধিক নিম্নমানের paper-এর চেয়েও বেশি মূল্যবান হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়, funding agency এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে quantity-driven evaluation থেকে বেরিয়ে এসে research quality, reproducibility, transparency, ethical integrity এবং বাস্তব বৈজ্ঞানিক অবদানকে মূল্যায়নের কেন্দ্রে আনতে হবে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও বুঝতে হবে—paper publication গবেষণার শেষ লক্ষ্য নয়; বরং প্রকৃত লক্ষ্য হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা, সমস্যাকে গভীরভাবে বোঝা এবং বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা অর্জন করা।

বিজ্ঞান তার শক্তি অর্জন করেছে সততা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং জ্ঞানের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে। কিন্তু যদি গবেষণা ধীরে ধীরে শুধুই publication সংখ্যা, ranking এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে paper-এর সংখ্যা হয়তো বাড়বে, কিন্তু মানবজাতির প্রকৃত বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সেই অনুপাতে এগোবে না। শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানকে টিকিয়ে রাখবে publication-এর পরিমাণ নয়, বরং জ্ঞানের গুণগত গভীরতা এবং গবেষণার প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org