বিজ্ঞানীদের কাজ সাধারণত আমরা গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম বা গবেষণাপত্রের পাতার মধ্যেই কল্পনা করি। কিন্তু বাস্তবে বিজ্ঞানীর ভূমিকা কি এতটাই সীমিত হওয়া উচিত? ড. আবুল হুস্সামের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়। তাঁর কথায়, “একজন বিজ্ঞানীর কাজ শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।” এই বক্তব্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানীর সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি গভীর দর্শন।
ড. হুস্সাম তাঁর গবেষণার বিষয় হিসেবে আর্সেনিক দূষণের মতো একটি জনস্বাস্থ্য সংকটকে বেছে নিয়েছেন। এটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক সমস্যা নয়; এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত। নলকূপের পানিতে থাকা অদৃশ্য বিষ মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে জমে গিয়ে মারাত্মক রোগের জন্ম দেয়। এই প্রেক্ষাপটে একজন বিজ্ঞানীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত—শুধু সমস্যাটি শনাক্ত করা, নাকি তার সমাধানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া? ড. হুস্সামের কাজ দ্বিতীয় পথটিকেই বেছে নিয়েছে।
সোনো ফিল্টার উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, বিজ্ঞানী চাইলে সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারেন। এই ফিল্টার শুধু একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়; এটি নিরাপদ পানির অধিকার রক্ষার একটি মানবিক প্রয়াস। গবেষণাগারের জ্ঞান মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানোর এই উদ্যোগ দেখিয়ে দেয়, বিজ্ঞানীর সামাজিক ভূমিকা কতটা বিস্তৃত হতে পারে।
বিজ্ঞানীর সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে একটি নৈতিক প্রশ্নও উঠে আসে। বিজ্ঞানী কি কেবল জ্ঞান সৃষ্টির দায়িত্ব নেবেন, নাকি সেই জ্ঞান সমাজের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়ও তাঁর? উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে গবেষণালব্ধ সমাধান বাস্তবায়নের সঙ্গে মানুষের জীবন সরাসরি জড়িত। ফলে বিজ্ঞানীর নৈতিক দায়িত্ব কেবল ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সমাজের দিকে বিস্তৃত হয়।
এই বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের সামাজিক প্রভাবকে যদি মূল্যায়নের অংশ করা হয়, তবে বিজ্ঞানীরা স্বাভাবিকভাবেই সমাজকেন্দ্রিক গবেষণায় আগ্রহী হবেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন একটি কাঠামো দরকার, যেখানে গবেষণা ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে সংযোগ তৈরি হয়। ড. হুস্সামের কাজ দেখিয়ে দেয়, এই সংযোগ সম্ভব—যদি বিজ্ঞানী নিজেই উদ্যোগী হন।
তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। বিজ্ঞানচর্চা মানে শুধু নিজের ক্যারিয়ার গড়া নয়; বরং সমাজের সমস্যাগুলোকে বোঝা এবং সমাধানের পথে অবদান রাখা। এই মনোভাব গড়ে তুলতে পারলে বিজ্ঞান সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো চর্চা হয়ে থাকবে না; বরং সমাজের সঙ্গে যুক্ত একটি জীবন্ত শক্তি হয়ে উঠবে।
ড. হুস্সামের উক্তিটি তাই কেবল একটি ব্যক্তিগত মতামত নয়; এটি বিজ্ঞানীর সামাজিক ভূমিকা নিয়ে ভাবার একটি আহ্বান। গবেষণাগারের ভেতরে জন্ম নেওয়া জ্ঞান যখন মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনে, তখনই বিজ্ঞান তার প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়।
ড. আবুল হুস্সাম এর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment