একদিন হঠাৎ জ্বর এলো। শরীর ভারী, মাথা ঝিমঝিম করছে। সন্ধ্যায় আপনার সামনে রাখা হলো প্রিয় কোনো খাবার। হয়তো গরম বিরিয়ানি, কিংবা সদ্য ভাজা ইলিশ। কিন্তু প্রথম লোকমাটা মুখে দেওয়ার পরই অদ্ভুত কিছু টের পেলেন। খাবারটা ঠিক আগের মতো লাগছে না। লবণ আছে, ঝালও আছে, কিন্তু যেন কোথাও একটা শূন্যতা। স্বাদটা নিস্তেজ, ফিকে, অচেনা। তখন প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই আসে জিহ্বা কি হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দিল, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো স্নায়ুবৈজ্ঞানিক গল্প আছে?
আমরা সাধারণত ভাবি, স্বাদ বোঝার কাজটা কেবল জিহ্বার। জিহ্বার ছোট ছোট taste bud খাবারের রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত করে, তারপর আমরা বুঝতে পারি কী মিষ্টি, কী টক, কী তিতা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। জিহ্বা এখানে কেবল প্রথম প্রহরী। আসল বিচারক বসে আছে মস্তিষ্কে। স্বাদের অভিজ্ঞতা তৈরি হয় তখনই, যখন জিহ্বা, নাক, স্নায়ু এবং মস্তিষ্ক একসঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ সিগন্যাল তৈরি করে।
জিহ্বার বিভিন্ন অংশে থাকা taste receptor cell খাবারের রাসায়নিক অণুগুলো শনাক্ত করে। এরপর facial nerve(VII), glossopharyngeal nerve(IX) এবং vagus nerve(X) এই তথ্যগুলোকে বহন করে brainstem-এর nucleus tractus solitarius-এ পৌঁছে দেয়। সেখান থেকে সিগন্যাল যায় thalamus হয়ে gustatory cortex-এ, যেখানে মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেয় এটি মিষ্টি, নাকি নোনতা, আনন্দদায়ক নাকি বিরক্তিকর। অর্থাৎ, আপনি যখন খাবারের স্বাদ অনুভব করেন, তখন সেটা আসলে আপনার জিহ্বার নয়, আপনার মস্তিষ্কের নির্মাণ।
অসুস্থতার সময় এই জটিল স্নায়বিক পথটিতেই ঘটে সূক্ষ্ম ব্যাঘাত। যখন শরীরে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হয়, তখন আমাদের ইমিউন সিস্টেম cytokine নামের কিছু রাসায়নিক বার্তাবাহক নিঃসরণ করে। এদের কাজ হলো শরীরকে সতর্ক করা, প্রতিরক্ষা সক্রিয় করা। কিন্তু এই প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিকগুলো শুধু সংক্রমণের জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলেও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে hypothalamus এবং limbic system-এ পৌঁছে তারা ক্ষুধা, গন্ধ ও স্বাদ অনুভূতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

ছবিঃ Cross section of taste bud.
এই কারণেই জ্বরের সময় প্রিয় খাবারও বিস্বাদ লাগে। এটি কেবল জিহ্বার সমস্যা নয়; এটি আসলে brain-mediated sensory modulation। মস্তিষ্ক তখন শরীরকে বিশ্রাম দিতে চায়, digestion-এর মতো শক্তি-নির্ভর কাজকে সাময়িকভাবে কমিয়ে দিতে চায়। ফলে খাবারের প্রতি আকর্ষণ কমে যায়, স্বাদের তীব্রতা নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
আরও মজার ব্যাপার হলো, আমরা যাকে “স্বাদ” বলি, তার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই আসলে গন্ধের অবদান। যখন আপনার সর্দি হয়, নাক বন্ধ হয়ে যায়, তখন খাবারের volatile chemical molecule গুলো olfactory receptor পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ফলে জিহ্বা যদিও basic taste যেমন: মিষ্টি, টক, নোনতা, তিতা অনুভব করছে, তবুও flavour-এর সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছে না। এ কারণেই সর্দি হলে আপেল আর আলুর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে কষ্ট হতে পারে, যদিও texture আলাদা।
এই ঘটনাকে neuroscience-এ multisensory integration বলা হয়। আমাদের orbitofrontal cortex জিহ্বা, নাক, এমনকি খাবারের তাপমাত্রা ও texture-এর তথ্য একত্র করে একটি সম্পূর্ণ flavour experience তৈরি করে। অসুস্থতার সময় এই integration বিঘ্নিত হয়, ফলে খাবার পরিচিত হয়েও অপরিচিত লাগে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে। অনেকেই হঠাৎ স্বাদ ও গন্ধ হারিয়ে ফেলেছিলেন। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল ভাইরাস সরাসরি taste bud নষ্ট করে। পরে গবেষণায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল supporting cell এবং olfactory epithelium-এ প্রদাহের কারণে, যা স্নায়বিক সংকেত পরিবহনে বাধা সৃষ্টি করত। অর্থাৎ, সমস্যা জিহ্বায় যতটা না, তার চেয়ে বেশি ছিল সিগন্যাল প্রসেসিং ব্যবস্থায়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো neuroinflammation। অসুস্থতার সময় প্রদাহজনিত রাসায়নিকগুলো neural transmission-এর efficiency কমিয়ে দেয়। ফলে receptor ঠিক থাকলেও signal distortion ঘটে। অনেকটা এমন, যেন রেডিও স্টেশন ঠিকমতো সম্প্রচার করছে, কিন্তু মাঝখানের তরঙ্গপথে শোঁশোঁ শব্দ তৈরি হচ্ছে। ফলাফলমস্তিষ্ক বিকৃত তথ্য পায়, আর স্বাদ বদলে যায়।
এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গভীর সত্য শেখায় আমরা যা অনুভব করি, তা সরাসরি বাইরের জগতের প্রতিফলন নয়; বরং মস্তিষ্কের তৈরি করা এক ব্যাখ্যা। খাবারের স্বাদও তার ব্যতিক্রম নয়। জিহ্বা কেবল তথ্য সংগ্রহ করে, কিন্তু সেই তথ্যের অর্থ দেয় মস্তিষ্ক। আর যখন শরীর অসুস্থ হয়, তখন সেই অর্থ বদলে যায়।
তাই অসুস্থতার সময় যখন প্রিয় খাবারটাও হঠাৎ করে নিস্তেজ লাগে, তখন সেটাকে কেবল জিহ্বার ব্যর্থতা ভেবে ভুল করবেন না। হয়তো তখন আপনার মস্তিষ্ক নীরবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভেতর ডুবে আছে,নিজেকে পুনর্গঠন করার কাজে, শরীরকে ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনার এক অদৃশ্য প্রচেষ্টায়। সেই প্রক্রিয়ার ভেতরেই সাময়িকভাবে স্বাদের উজ্জ্বলতা কিছুটা ম্লান হয়ে আসে, যেন জীবনের রঙগুলো একটু চাপা পড়ে যায়।
কিন্তু এই ম্লানতা স্থায়ী নয়। শরীর যখন ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে এগোয়, মস্তিষ্কও তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে। তখন আবার একই খাবার, একই গন্ধ, একই স্বাদ নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে যেন আগে কখনো এত গভীরভাবে তা অনুভব করা হয়নি। মনে হয়, স্বাদ আসলে শুধু জিহ্বায় নয়, তা লুকিয়ে থাকে আমাদের সুস্থতার অনুভূতিতে, আমাদের ভেতরের স্থিতিতে।
হয়তো এ কারণেই অসুস্থতা আমাদের কেবল দুর্বল করে না, আমাদের অনুভবের গভীরতাও নতুন করে শেখায়। আমরা বুঝতে শিখি, স্বাদ মানে শুধু লবণ, চিনি বা মশলার সমীকরণ নয়; এটি আমাদের মস্তিষ্ক, শরীর আর মুহূর্তের এক যৌথ সৃষ্টি। আর যখন সবকিছু আবার ঠিকঠাক জায়গায় ফিরে আসে, তখন একটি সাধারণ খাবারও অদ্ভুত এক পরিপূর্ণতা নিয়ে ফিরে আসে যেন আমরা কেবল খাবারই খাচ্ছি না, আমরা আবার জীবনটাকেই অনুভব করছি।
মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Leave a comment