সাক্ষাৎকার

#২৪৮ অধ্যাপক ডক্টর মীর্জা হাছানুজ্জামান — মাটির টানে বিশ্বজয়ী এক কৃষিবিজ্ঞানীর গল্প

Share
Share

বাংলাদেশে বসে বিশ্বের এক শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় জায়গা করে নেওয়া — ব্যাপারটা অসম্ভব শোনালেও এটাই বাস্তব। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোনমি বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মীর্জা হাছানুজ্জামান সেই অসাধারণ বাস্তবতার নাম। ওয়েব অফ সায়েন্স ডেটাবেজে তাঁর গবেষণা উদ্ধৃত হয়েছে পঁচিশ হাজারেরও বেশি বার। প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা তিনশো ছাড়িয়ে গেছে। এইচ-ইনডেক্স পৌঁছেছে ৮৩-তে। ২০২১ ও ২০২২ সালে ক্লারিভেটের ‘হাইলি সাইটেড রিসার্চার’ তালিকায় স্থান পেয়েছেন — বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানীদের মধ্যে তিনিই প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র।

অথচ এই মানুষটির শুরু ছিল একটি সাধারণ গ্রামের সাধারণ স্কুল থেকে।

মাটি থেকে উড়ান

বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামে বড় হওয়া এক ছেলে। বাবার চাকরির কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্কুলে পড়তে হয়েছে — কখনো গ্রামে, কখনো শহরে। তবে শৈশবের বেশিরভাগ সময় কেটেছে গ্রামেই, গ্রামের স্কুলেই। কোনো নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধাও নয় — একেবারে সাদামাটা জীবন। তবু ছেলেটির মনে ছিল একটি ছোট্ট স্বপ্ন: বড় হয়ে শিক্ষক হবে।

গবেষণার কথা তখন মাথাতেও আসেনি। গাছপালার প্রতি একটা টান ছিল — উদ্ভিদ বিজ্ঞান, বনায়ন, সবুজের জগৎ যেন তাকে ডাকত সবসময়। সেই টানেই শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। এবং এখানেই জীবনের প্রথম বড় মোড়।

বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর মতো তিনিও জানতেন, অনেকে নিজের পছন্দের বিষয় পেয়ে পড়তে পারে না। কিন্তু তাঁর সৌভাগ্য ছিল যে কৃষি বিভাগে ভর্তি হয়েই সেই বিষয়টাকে ভালোবেসে ফেললেন। পড়তে পড়তে মনে হলো, “না, এটা আমার জন্যই।” পরীক্ষার ফল ভালো হতে শুরু করল। শিক্ষক হওয়ার পুরনো স্বপ্নটা নতুন রূপ পেল — কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবেন, গবেষণা করবেন। আস্তে আস্তে গভীর হলো সেই সংকল্প।

স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে জাপান সরকারের মনবুকাগাকুশো (MEXT) বৃত্তি নিয়ে পাড়ি দিলেন সূর্যোদয়ের দেশে। শুরু হলো পিএইচডির যাত্রা।

গাছ কীভাবে বাঁচে? এক অসাধারণ প্রশ্নের সন্ধানে

জাপানের ল্যাবরেটরিতে বসে মীর্জা হাছানুজ্জামান যে প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে শুরু করেছিলেন, সেটি একটু থামলে যে কেউই বুঝতে পারবেন কতটা গভীর এবং কতটা জরুরি।

গাছ নড়তে পারে না। গরম লাগলে মানুষ ছায়ায় সরে যায়, বন্যায় মানুষ উঁচু জায়গায় উঠে পড়ে, লবণাক্ত পানিতে কেউ গোসল করে না। কিন্তু গাছ? সে যেখানে আছে, সেখানেই থাকে। খরা আসুক, বন্যা আসুক, মাটি লবণে ভরে যাক — গাছ পালাতে পারে না। তাহলে কিছু গাছ টিকে থাকে কীভাবে? শত শত বছর ধরে লোনাপানির মাঝেও কিছু উদ্ভিদ বেঁচে থাকছে কোন শক্তিতে?

এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে মির্জা হাসানুজ্জামানের গবেষণার মূল রহস্য।

বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যাক। গাছ যখন বন্যা, খরা, উচ্চ তাপমাত্রা বা লবণাক্ততার মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়ে, তখন তার কোষের ভেতরে এক ধরনের বিষাক্ত উপাদান তৈরি হয়। এই উপাদানগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম ‘ফ্রি র‍্যাডিক্যাল’ বা ‘রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস’। এদের মধ্যে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের নাম হয়তো অনেকেই চেনেন। এই বিষাক্ত উপাদানগুলো গাছের ডিএনএ, কোষঝিল্লি (মেমব্রেন) এবং প্রোটিনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে গাছের বৃদ্ধি থামে, ফলন কমে যায়।

মানুষের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। রোগে পড়লে বা অতিরিক্ত চাপে পড়লে মানুষের শরীরেও এই ফ্রি র‍্যাডিক্যাল তৈরি হয়, দ্রুত বার্ধক্য আসে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে। কিন্তু মানুষকে বাইরে থেকে ওষুধ বা পুষ্টিসম্পদ দেওয়া যায়। গাছকে কে দেবে?

এখানেই মীর্জা হাছানুজ্জামানের গবেষণা। তিনি খুঁজে বের করেছেন গাছের নিজের ভেতরেই দুটি প্রাকৃতিক ‘রক্ষাকবচ’ আছে। একটির নাম ‘অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ডিফেন্স সিস্টেম’, অপরটি ‘গ্লাইঅক্সালেস সিস্টেম’। এই দুটি প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকলে সেই বিষাক্ত উপাদানগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়ে পানিতে পরিণত হয় অথবা এমন নিরীহ যৌগে পরিণত হয় যেগুলো গাছের কোনো ক্ষতি করে না। এভাবেই গাছ প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকে।

তবে সব গাছে এই সিস্টেম সমানভাবে কার্যকর নয়। তাই প্রশ্ন উঠল — বাইরে থেকে কোন উপাদান দিলে এই রক্ষাকবচটা আরও শক্তিশালী হয়? মীর্জা হাছানুজ্জামান দেখিয়েছেন যে সেলেনিয়াম (একটি খনিজ উপাদান) এবং নাইট্রিক অক্সাইড (একটি সংকেত-অণু) প্রয়োগ করলে গাছের এই দুটি রক্ষাব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ব্যাপারটার গুরুত্ব কতটা? ভাবুন — ভবিষ্যতে কৃষিবিজ্ঞানীরা এই তথ্য ব্যবহার করে এমন ফসলের জাত তৈরি করতে পারবেন যেগুলো বন্যায়, খরায়, লবণাক্ততায় টিকে থাকবে। বাংলাদেশের উপকূলীয় কৃষক, যার জমিতে ঘূর্ণিঝড়ের পরে লোনাপানি ঢুকে পড়েছে — সেই কৃষকের হাতে পৌঁছাবে এই গবেষণার ফল।

জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে কৃষিবিজ্ঞান

বাংলাদেশের কৃষিতে এখন সবচেয়ে বড় হুমকির নাম জলবায়ু পরিবর্তন। গত পঞ্চাশ-ষাট বছরে কৃষিবিজ্ঞানীরা ফসলের উৎপাদন দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন সেই অর্জনকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করছে। গত চল্লিশ বছরে বাংলাদেশে খরাপ্রবণ এলাকা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়েছে ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ। বন্যা ও অতিবৃষ্টির পাশাপাশি এখন নতুন সংকট হিসেবে যোগ হয়েছে অসহনীয় তাপদাহ — যা সরাসরি ফসল পুড়িয়ে দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটেই মির্জা হাসানুজ্জামানের গবেষণা নতুন মাত্রা পায়। তিনি যাকে বলেন ‘ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট এগ্রিকালচার’ — অর্থাৎ জলবায়ু-সহনশীল কৃষি। তাঁর কাজের লক্ষ্য হলো এটা বোঝা যে গাছ ঠিক কীভাবে এই বৈরী পরিবেশগুলোতে সাড়া দেয়, নিজের রক্ষাব্যবস্থা কীভাবে সক্রিয় করে — এবং সেই জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কৃষিবিজ্ঞানীদের হাতে তুলে দেওয়া যারা নতুন জাত তৈরি করবেন।

তিনি বলেন, কৃষিগবেষণা কখনো একজনের একার কাজ নয়। একজন উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ববিদ (Plant Physiologist) হিসেবে তিনি জানান গাছের ভেতরে কী ঘটছে, কোন বৈশিষ্ট্যগুলো সক্রিয় করলে গাছ ভালো থাকে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ভিদ প্রজননবিদরা (Plant Breeders) নতুন জাত তৈরি করেন। এভাবে সামষ্টিক প্রচেষ্টায় একটি ফসলের জাত পরিপক্ব হয়ে মাঠে আসে।

সীমিত সম্পদে অসীম সম্ভাবনা: দেশে বসেই বিশ্বমানের গবেষণা

২০০৩ সালে জাপান থেকে পিএইচডি শেষ করে এবং পরে জাপানে ও অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করে মির্জা হাসানুজ্জামান ফিরে এলেন নিজের দেশে। বিদেশে থেকে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না তাঁর। “আমার আনন্দের জায়গা আমার দেশ” — এই বিশ্বাস তাঁকে সব সময় ধরে রেখেছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে তিনি গড়ে তুললেন আন্তর্জাতিক মানের একটি গবেষণাগার। কিন্তু পথটা সহজ ছিল না। সীমিত বাজেট, অপর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি, কখনো কখনো পরিবেশগত নানান প্রতিকূলতা। উন্নত দেশের একজন গবেষক যা অনায়াসে করে ফেলতে পারেন, সেটা এখানে করতে দ্বিগুণ পরিশ্রম লাগে।

তবু তিনি দমেননি। কারণ তাঁর বিশ্বাস — বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মেধা। এই মেধাকে যদি পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজে লাগানো যায়, তাহলে সীমিত সম্পদও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

আজকের এই বৈশ্বিক যুগে দেশ-বিদেশের ব্যবধান অনেকটাই ঘুচে গেছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বসেই তিনি আমেরিকার বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করছেন, ইউরোপের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করছেন। এমন প্রজেক্টও আছে যেখানে বিশটি দেশের অধ্যাপকরা একসঙ্গে কাজ করছেন — কারণ একেকটি গবেষণার একেকটি অংশে একেকটি দেশের বিশেষজ্ঞতা প্রয়োজন।

“আমি আমেরিকায় বসে অনেক ভালো কাজ করতে পারতাম হয়তো। কিন্তু তাতে একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর কী লাভ হতো?” — এই প্রশ্নটি বারবার তাঁকে দেশে থাকার শক্তি দিয়েছে। শুক্রবারের ছুটিতেও তাঁর ল্যাবরেটরিতে কাজ চলে। ছাত্রছাত্রীরা মাঠে গবেষণা করেন। এই একাগ্রতাই তাঁর ল্যাবকে বিশ্বমানচিত্রে জায়গা করে দিয়েছে।

যেদিন বাংলাদেশ ড্রপডাউন মেনুতে এলো

২০২১ সালের একটি ই-মেইল। পাঠিয়েছে ক্লারিভেট — যা একসময় থমসন রয়টার্স নামে পরিচিত ছিল, বিজ্ঞানমহলে ‘ওয়েব অফ সায়েন্স’ নামে যাদের পরিচয়। মেইলে লেখা: “আপনি হাইলি সাইটেড রিসার্চার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।”

বিশ্বাস হচ্ছিল না মীর্জা হাছানুজ্জামানের।

হাইলি সাইটেড রিসার্চার কী? এটি পৃথিবীর যেকোনো একটি গবেষণা ক্ষেত্রে কাজ করা শীর্ষ এক শতাংশ বিজ্ঞানীদের তালিকা। সব বিষয় মিলিয়ে সারা বিশ্বে প্রায় ছয় হাজার বিজ্ঞানী এই তালিকায় থাকেন। কিন্তু কেবল সাম্প্রতিক কোনো গবেষণার জন্য নয় — গত দশ বছরের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি হয়। অর্থাৎ দশ বছর ধরে উচ্চমানের গবেষণা প্রকাশ করতে হবে এবং সেই গবেষণাগুলো বিশ্বের অন্যান্য বিজ্ঞানীরা তাঁদের নিজেদের কাজে উদ্ধৃত করবেন।

কিন্তু এই স্বীকৃতির চেয়েও যে মুহূর্তটি তাঁকে আলোড়িত করেছিল সেটি ভিন্ন। বছর কয়েক আগে, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের দিকে, তিনি মাঝেমধ্যে ক্লারিভেটের ওয়েবসাইটে গিয়ে ‘বাংলাদেশ’ লিখে সার্চ দিতেন — দেখতেন এই তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিজ্ঞানী আছেন কিনা। প্রতিবারই হতাশ হতেন। ড্রপডাউন মেনুতে বাংলাদেশের নামটাই আসত না — কারণ সেখানে বাংলাদেশের কেউ ছিলই না।

২০২১ সালের নভেম্বরে, ক্লারিভেটের তালিকা প্রকাশের দিন, মীর্জা হাছানুজ্জামান সেই মেনুতে ‘বাংলাদেশ’ লিখলেন। এবার দেশের নামটা এলো।

“সেই অনুভূতি আমি ভাষায় বলতে পারব না। অনেক পুরস্কার পেয়েছি, অনেক স্বীকৃতি পেয়েছি। কিন্তু এই মুহূর্তটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।”

২০২২ সালেও তিনি একই তালিকায় স্থান পেলেন। দু’বার হাইলি সাইটেড রিসার্চার স্বীকৃতির পাশাপাশি বিশ্ব বিজ্ঞান একাডেমীর ‘ইয়াং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড’ এবং বাংলাদেশ একাডেমি অফ সায়েন্সেসের স্বর্ণপদকও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।

জাপান থেকে শেখা তিনটি পাঠ

জাপানে পিএইচডি এবং পরে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার অভিজ্ঞতা মীর্জা হাছানুজ্জামানের বৈজ্ঞানিক জীবনকে গভীরভাবে রূপদান করেছে। তবে সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষাটা প্রযুক্তিগত নয়, মানবিক।

পরিশ্রম, সততা এবং সময়নিষ্ঠা — এই তিনটি গুণ তিনি জাপান থেকে সবচেয়ে গভীরভাবে আত্মস্থ করেছেন বলে মনে করেন। জাপানি গবেষকরা নির্দিষ্ট সময়ে ল্যাবে আসেন, কাজে কোনো ফাঁকি নেই, কথায় এবং কাজে পুরোপুরি সৎ। এই তিনটি মূল্যবোধ বাংলাদেশে বসেও তিনি বজায় রেখে চলেছেন এবং তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও সংক্রমিত করে চলেছেন।

তাঁর জাপানি ল্যাবে গবেষণার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত স্বাধীন। নিজের মতো করে চিন্তা করার, নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল প্রচুর। এই স্বাধীনতা তাঁর বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনাকে বিস্তৃত করেছে। পরে অস্ট্রেলিয়াতেও পোস্ট-ডক করেছেন, ভ্রমণ করেছেন নানান দেশে। তবে জাপানের সেই তিনটি মূল শিক্ষাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি কাজে এসেছে।

তরুণ গবেষকদের জন্য: হতাশা নয়, ধৈর্য

বিজ্ঞানী ডট অর্গের সাক্ষাৎকারে তরুণ গবেষকরা তাঁকে নানান প্রশ্ন করলেন। এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে উঠে এলো তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার নির্যাস।

গবেষণার বিষয় নির্বাচন নিয়ে তিনি বললেন, নিজের বিষয়ের মধ্যে থেকে যে টপিকটি ভালো লাগে সেটিই বেছে নেওয়া উচিত। কারণ ভালো না লাগলে দীর্ঘ পরিশ্রম করা যায় না, আর পরিশ্রম ছাড়া গবেষণায় কিছু হয় না। এ ক্ষেত্রে একজন ভালো গুরু বা মেন্টরের ভূমিকা অপরিসীম — যিনি শিক্ষার্থীর আগ্রহ বুঝে তাকে সঠিক পথ দেখাতে পারবেন।

প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ নিয়ে তিনি সরাসরি বললেন, Q1 জার্নালে প্রথমেই প্রকাশ করতে হবে — এই প্রত্যাশাটাই ভুল। তিনি নিজে প্রথম Q1 পেপার প্রকাশ করেছেন পিএইচডির একদম শেষ বর্ষে এসে। অথচ তাঁর কোনো কোনো ছাত্র মাস্টার্সেই Q1 পেপার প্রকাশ করে ফেলেছে। প্রত্যেকের পরিস্থিতি আলাদা। লক্ষ্য হওয়া উচিত — গবেষণার পুরো প্রক্রিয়াটা শেখা। একটা গবেষণা কীভাবে ডিজাইন করতে হয়, কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, পেপার কীভাবে লিখতে হয়, কোথায় জমা দিতে হয়, রিভিউয়ারদের মন্তব্যের জবাব কীভাবে দিতে হয় — এই পুরো প্রক্রিয়াটা আয়ত্ত করতেই দুই থেকে আড়াই বছর লেগে যায়।

ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তাঁর কথা স্পষ্ট — ব্যর্থতা বিজ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পেপার রিজেক্ট হওয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না পাওয়া — এগুলো স্বাভাবিক। তাঁর দলের অনেক পেপার একটি জার্নাল থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে শেষপর্যন্ত আরও ভালো জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার এগিয়ে যাওয়াটাই প্রকৃত বিজ্ঞানীর পথ।

নেটওয়ার্ক গড়া প্রসঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বললেন, আজকের বিজ্ঞানে নেটওয়ার্ক ছাড়া একা কিছু করা প্রায় অসম্ভব। একটি পরীক্ষার নমুনা অন্য দেশে পাঠিয়ে বিশ্লেষণ করানো, একটি তথ্য-উপাত্ত নিজে বিশ্লেষণ করতে না পারলে সহযোগীর সাহায্য নেওয়া — এভাবেই আধুনিক বিজ্ঞান এগোয়। তাঁর নিজের এমন প্রজেক্ট আছে যেখানে বিশটি দেশের বিজ্ঞানীরা একসঙ্গে কাজ করছেন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সতীর্থদের সঙ্গে, ল্যাবমেটদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি করা উচিত — এই সংযোগই পরবর্তীতে বড় হয়ে ওঠে।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন যখন লক্ষ্য নয়, পথ

জাপানে, অস্ট্রেলিয়ায় বা অন্য কোনো দেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অনেক তরুণ দেখেন। কিন্তু মীর্জা হাছানুজ্জামানের পরামর্শ — ‘বিদেশে যাব’ এটা লক্ষ্য হতে পারে না। লক্ষ্য হওয়া উচিত গবেষণা করা, শেখা। বিদেশ সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি পথমাত্র।

এবং সেই পথে যেতে হলে বৃত্তি নিয়েই যাওয়া সবচেয়ে ভালো। নিজের অর্থায়নে বিদেশে গেলে আর্থিক দুশ্চিন্তা গবেষণায় মনোযোগ দিতে দেয় না। তাই প্রথমে বাংলাদেশে থেকেই ভালো করে গবেষণা শিখতে হবে, কিছু প্রকাশনা করতে হবে, ইংরেজি দক্ষতার পরীক্ষায় ভালো নম্বর তুলতে হবে — তারপর বৃত্তি নিয়ে একটি ভালো ল্যাবরেটরিতে গিয়ে কাজ করা।

জাপানের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ পরামর্শ: পরিশ্রম, সময়নিষ্ঠা ও সততা না থাকলে সেখানে যাওয়া উচিত নয়। জাপানিরা অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও বিশেষায়িত (specialized) — একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর দক্ষতা অর্জনকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তাই জাপানে যেতে চাইলে নিজের ক্ষেত্রটি ঠিক করে, সেই ক্ষেত্রের জাপানি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ করে, নিজের আগ্রহ ও পরিশ্রমী মনোভাব তাঁদের কাছে তুলে ধরতে হবে।

এআই ও প্রযুক্তির হাত ধরে কৃষির নতুন যুগ

কৃষিবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ নিয়ে মির্জা হাসানুজ্জামান অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি বলেন, আমরা এখন চতুর্থ কৃষিবিপ্লবের দোরগোড়ায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এবং ডেটা বিজ্ঞান এখন কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় — আগে কৃষক নিজের অভিজ্ঞতা ও ধারণার উপর ভিত্তি করে জমিতে পানি দিতেন। এখন বিভিন্ন ধরনের সেন্সর ও ডিভাইস মাটির আর্দ্রতা, গাছের পানির চাহিদা পরিমাপ করে জানিয়ে দিতে পারে ঠিক কতটুকু পানি প্রয়োজন। এটাই প্রিসিশন এগ্রিকালচার বা নিখুঁত কৃষি — যেখানে অপচয় নেই, ঘাটতি নেই।

আরও এগিয়ে, এখন ফসলের ছবি তুলে AI বিশ্লেষণ করতে পারছে — কোন পোকা আক্রমণ করেছে, কী রোগ হয়েছে, কী সার বা কীটনাশক দিতে হবে। মাটি ও পানি বিশ্লেষণ করে জমির প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব হচ্ছে। আগামী দশ থেকে বিশ বছরে এই প্রযুক্তি আরও পরিপক্ব হলে বাংলাদেশের কৃষকের জীবনেও বড় পরিবর্তন আসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

নীতিনির্ধারকদের প্রতি একটি বার্তা

সরকার ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি তাঁর বার্তা স্পষ্ট: কৃষি উন্নয়নে বাংলাদেশ অনেক বিনিয়োগ করেছে, কৃষকদের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণায় (basic science research) বরাদ্দ এবং মনোযোগ এখনো অপ্রতুল।

জাপান বা অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিত্যনতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে, সেগুলো পেটেন্ট করছে, শিল্প খাতে সরবরাহ করছে। বাংলাদেশেও অনেক প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে, কিন্তু পেটেন্ট ও বাণিজ্যিকীকরণের যে ব্যবস্থা, সেই পরিবেশ এখনো সুদৃঢ় হয়নি। এই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি — মৌলিক গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।

একটি অনুপ্রেরণার নাম

অধ্যাপক ডক্টর মীর্জা হাছানুজ্জামানের গল্প কেবল একজন সফল বিজ্ঞানীর গল্প নয়। এটি একটি বিশ্বাসের গল্প — বিশ্বাস যে নিজের দেশে থেকেও বিশ্বমঞ্চে নিজের জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। বিশ্বাস যে গ্রামের সাধারণ স্কুল থেকে পড়াশোনা শুরু করেও এক শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় পৌঁছানো যায়। বিশ্বাস যে সীমিত সম্পদ কোনো বাধা নয় — পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও ধৈর্যই আসল পুঁজি।

তিনি বলেন, বিজ্ঞানচর্চার আনন্দ তাঁর প্রতিদিন বাড়ছে, কমছে না। ব্যর্থতা এসেছে, প্রতিকূলতা এসেছে — কিন্তু বিজ্ঞান ছেড়ে যাওয়ার কথা একবারও মনে হয়নি।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য তাঁর পথচলা একটি জীবন্ত প্রমাণ — স্বপ্ন যদি সত্যিকারের হয়, পরিশ্রম যদি অবিচল হয়, এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা যদি অটুট থাকে — তাহলে পৃথিবীর যেকোনো সম্মান এই মাটি থেকেও অর্জন করা সম্ভব।

গাছ যেমন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ে টিকে থাকে, তেমনি এই বিজ্ঞানীও লড়েছেন — এবং জিতেছেন। সেই জয় কেবল তাঁর একার নয়, পুরো বাংলাদেশের।

অধ্যাপক ডক্টর মীর্জা হাছানুজ্জামানের সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি ইউটিউবে নিম্নের লিংক এ দেখুন: 👇👇👇

বিজ্ঞানী ডট অর্গ (www.biggani.org) — বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক বাংলা ভাষার বিজ্ঞান যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম। ২০০৬ সাল থেকে পরিচালিত এই অলাভজনক উদ্যোগে এ পর্যন্ত ২৪৫টিরও বেশি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org