গবেষণার প্রথম পদক্ষেপ

বিজ্ঞানী’র বই: লিনাস পলিংয়ের ‘দ্য নেচার অফ দ্য কেমিকাল বন্ড’ ও আধুনিক রসায়নের ভিত্তি

Share
Share

আজ আমরা যে রসায়নে কোভ্যালেন্ট বন্ড, আয়নিক বন্ড, অণুর গঠন বা হাইব্রিড অরবিটালের মতো ধারণাগুলো পড়ি, সেগুলো একসময় এতটা পরিষ্কার ও সুসংহত ছিল না। রাসায়নিক বন্ধন কীভাবে তৈরি হয়—এই মৌলিক প্রশ্নের আধুনিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করতে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য, তিনি হলেন নোবেলজয়ী রসায়নবিদ লিনাস পলিং। তাঁর ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘দ্য নেচার অফ দ্য কেমিকাল বন্ড’ (The Nature of the Chemical Bond) রসায়নের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।

পলিংয়ের সময় পর্যন্ত রসায়ন মূলত পর্যবেক্ষণভিত্তিক একটি বিজ্ঞান ছিল—কোন মৌল কোনটির সঙ্গে বিক্রিয়া করে, কোন যৌগ স্থিতিশীল—এসব তথ্য জানা থাকলেও এর গভীর কোয়ান্টাম-যান্ত্রিক ব্যাখ্যা সুস্পষ্ট ছিল না। পলিং প্রথমবারের মতো কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে রসায়নের সঙ্গে পদ্ধতিগতভাবে যুক্ত করেন। তিনি দেখান, ইলেকট্রনের তরঙ্গ-প্রকৃতি ও অরবিটালের বিন্যাস বুঝতে পারলেই রাসায়নিক বন্ধনের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা যায়। এই সমন্বয়ের ফলে রসায়ন কেবল পরীক্ষাগারের অভিজ্ঞতাভিত্তিক বিদ্যা না থেকে একটি শক্ত তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়।

এই বইয়ের অন্যতম বিখ্যাত অবদান হলো হাইব্রিডাইজেশন ধারণা। কার্বনের মতো মৌলে কীভাবে sp, sp², sp³ হাইব্রিড অরবিটাল তৈরি হয় এবং এর ফলে অণুর ত্রিমাত্রিক গঠন নির্ধারিত হয়—পলিং তা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেন। একই সঙ্গে তিনি রেজোন্যান্স ধারণার মাধ্যমে দেখান, কোনো কোনো অণুর গঠন একক কোনো কাঠামো দিয়ে বোঝানো যায় না; বরং একাধিক সম্ভাব্য কাঠামোর সম্মিলিত প্রভাবেই প্রকৃত গঠন নির্ধারিত হয়। আজকের রসায়ন পাঠ্যবইয়ে যে লুইস স্ট্রাকচার ও রেজোন্যান্স ফর্মের ধারণা পড়ানো হয়, তার তাত্ত্বিক ভিত্তি এই বই থেকেই শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

পলিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ইলেকট্রোনেগেটিভিটি স্কেল। কোন মৌল ইলেকট্রনকে কতটা শক্তভাবে নিজের দিকে টানে—এই ধারণাকে পরিমাপযোগ্য করে তোলার মাধ্যমে তিনি রাসায়নিক বন্ধনের আয়নিক ও কোভ্যালেন্ট চরিত্রের মধ্যকার ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করেন। ফলে দুটি মৌলের মধ্যে বন্ধন কতটা “আয়নিক” বা কতটা “কোভ্যালেন্ট”—তা গুণগত নয়, বরং তুলনামূলকভাবে পরিমাপযোগ্য ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি রসায়ন শিক্ষায় এক বড় অগ্রগতি।

‘দ্য নেচার অফ দ্য কেমিকাল বন্ড’ শুধু তাত্ত্বিক রসায়নে নয়, জীবরসায়ন ও গঠনমূলক জীববিজ্ঞানে (structural biology) গভীর প্রভাব ফেলেছে। প্রোটিনের আলফা-হেলিক্স ও বিটা-শিট গঠনের ধারণায় পলিংয়ের অবদান আধুনিক জীববিজ্ঞানের ভিত্তি রচনায় সাহায্য করেছে। এভাবে রাসায়নিক বন্ধনের তত্ত্ব জীবনের অণুগত কাঠামো বোঝার পথও খুলে দিয়েছে।

আজকের দিনে কম্পিউটেশনাল কেমিস্ট্রি, ড্রাগ ডিজাইন বা ন্যানোটেকনোলজির মতো ক্ষেত্রগুলোতে অণুর গঠন ও বন্ধনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ অপরিহার্য। এই সব আধুনিক প্রয়োগের তাত্ত্বিক শিকড় খুঁজলে লিনাস পলিংয়ের এই গ্রন্থের প্রভাব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ‘দ্য নেচার অফ দ্য কেমিকাল বন্ড’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম স্তরে থাকা ইলেকট্রনগুলোর আচরণ বুঝতে পারলেই পদার্থের বৈশিষ্ট্য ও জীবনের অণুগত রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি পাওয়া যায়।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org